ইরানের শক্তির মূল উৎস কোথায়, যুদ্ধে কেন হোঁচট খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র?
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ইরানের বন্দর ও উপকূলীয় এলাকায় পুনরায় নৌ অবরোধ কার্যকর করতে মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে ২০টির বেশি যুদ্ধজাহাজ এবং শতাধিক সামরিক উড়োজাহাজ মোতায়েন করেছে যুক্তরাষ্ট্র। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষণার পর গত মঙ্গলবার (ওয়াশিংটন সময়) বিকাল ৪টা থেকে এই অবরোধ কার্যকর হয়। এক বিবৃতিতে এ তথ্য নিশ্চিত করেছে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম)। যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় তারা সর্বদা সতর্ক ও প্রস্তুত রয়েছে।
অপরদিকে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের সুবিধা দেয় এমন অন্য সব জ্বালানি রপ্তানির করিডর বন্ধের হুমকি দিয়েছে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (আইআরজিসি)। এরই ধারাবাহিকতায় হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল কার্যত বন্ধ রয়েছে। আরো চাপ সৃষ্টি করতে এখন লোহিতসাগরের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দেব প্রণালিকেও বন্ধ করে দেয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে তেহরান।
মূলত হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণকে কেন্দ্র করে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা মধ্যপ্রাচ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনা তৈরি করেছে। বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার জেরে ইরানে একের পর এক বিমান হামলা চালিয়ে যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এর জবাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটি ও মিত্র দেশগুলোর ওপর পাল্টা ক্ষেপণাস্ত্র হামলা চালাচ্ছে ইরানও। এই পরিস্থিতির ফলে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল সরবরাহ ও আঞ্চলিক নিরাপত্তা নিয়ে গভীর সংকট তৈরি হয়েছে।
এমন পরিস্থিতিতে প্রশ্ন উঠছে, গত ১৭ জুন সমঝোতা চুক্তি সই হওয়ার পরও কেন যুদ্ধ বন্ধে চূড়ান্ত চুক্তিতে পৌঁছাতে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যেতে ব্যর্থ হচ্ছে ইরান-যুক্তরাষ্ট্র? এর পেছনে রয়েছে, ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে ঐতিহাসিক অবিশ্বাস, মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতি এবং পারমাণবিক কর্মসূচি সংক্রান্ত দীর্ঘদিনের মতবিরোধ। এছাড়া কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ এবং বিকল্প অপ্রতিসম সামরিক সক্ষমতা (ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও প্রক্সি নেটওয়ার্ক) রয়েছে ইরানের। এর মাধ্যমে খুব সহজেই পরাশক্তি যুক্তরাষ্ট্রকে চাপে রাখতে সক্ষম হয়েছে দেশটি। অন্যদিকে, সরাসরি বড় ধরনের সামরিক সংঘাতে গিয়েও কাক্সিক্ষত লক্ষ্য অর্জনে হিমশিম খাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র।
সমঝোতা চুক্তি অনুযায়ী, হরমুজে জাহাজ চলাচলের ওপর ‘ব্যবহার ফি’ বা টোল আরোপ থেকে মাত্র ৬০ দিন বিরত থাকার প্রতিশ্রæতি দিয়েছিল ইরান। এ চুক্তির আওতায় আঞ্চলিক নিরাপত্তা, সামুদ্রিক চলাচল এবং পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে আলোচনার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নিষেধাজ্ঞা শিথিল করার রূপরেখা অন্তর্ভুক্ত ছিল। তবে ইরান এখন নিশ্চিত করতে চায়, জাহাজ পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠানগুলো যেন অর্থ দিতে বাধ্য হয়। এর ব্যতিক্রম হলে তাদের পরিণতি ভোগ করতে হবে। ইরানের শাসকগোষ্ঠী জোর দিয়ে বলছে, প্রণালি দিয়ে চলাচলকারী যেকোনো জাহাজকে যেতে হবে ইরানের জলসীমার মধ্য দিয়ে। যেসব জাহাজ এই নির্দেশ মানতে অস্বীকৃতি জানাচ্ছে, সেগুলোতেই হামলা চালাচ্ছে আইআরজিসি।
অপরদিকে হরমুজ প্রণালির ওপর ইরানের নিয়ন্ত্রণ বা একচ্ছত্র আধিপত্য ভেঙে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের জন্য এই জলপথ পুরোপুরি উন্মুক্ত করে দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে ইরানের ওপর সামরিক শক্তি প্রয়োগ ও কঠোর অবরোধের কৌশল নিয়েছে ওয়াশিংটন।
এমন পরিস্থিতিতে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প মার্কিন কংগ্রেসকে আনুষ্ঠানিকভাবে জানিয়েছেন, ওয়াশিংটন আবারো ইরানের সঙ্গে যুদ্ধে জড়িয়েছে। হোয়াইট হাউস দাবি করেছে, এ পদক্ষেপের ফলে ট্রাম্প প্রশাসন ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান চালিয়ে যাওয়ার জন্য নতুন করে আরো ৬০ দিনের সময় পাবে। এ বিষয়ে গত শুক্রবার (১০ জুলাই) একটি চিঠিতে ট্রাম্প যুক্তি দেখিয়েছেন, ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরানের ওপর এ নতুন হামলা ‘দেশে এবং বিদেশে মার্কিন নাগরিক ও যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ রক্ষা করার জন্য’ তার দায়িত্বের অংশ।
মার্কিন ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প স্পষ্ট করে বলেছেন, ‘তেহরান যদি অবিলম্বে আলোচনার টেবিলে ফিরে না আসে, তবে আগামী সপ্তাহে ইরানের প্রধান প্রধান বিদ্যুৎকেন্দ্র ও সেতুগুলোকে লক্ষ্য করে বড় ধরনের হামলা চালানো হবে। তাই আগামী সপ্তাহে পরিস্থিতি তাদের (ইরান) জন্য সত্যিই খুব ভয়াবহ হতে যাচ্ছে। এই হামলাগুলো সীমিত, সুনির্দিষ্ট, পরিকল্পিত এবং এমনভাবে পরিচালনা করা হবে, যাতে বেসামরিক ব্যক্তি ও স্থাপনার ক্ষয়ক্ষতি ন্যূনতম থাকে।’
তবে ট্রাম্পের এই হুমকিকে পাত্তা দিচ্ছে না ইরান। গতকাল বুধবার ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনীর বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা এএফপি জানিয়েছে, যতদিন পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্র তাদের ‘আগ্রাসি কার্যক্রম’ অব্যাহত রাখবে, ততদিন বন্ধ থাকবে হরমুজ প্রণালি। ওই অঞ্চল দিয়ে তেল রপ্তানির অন্যান্য পথেও হামলা চালানোর হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরানের বিপ্লবী রক্ষীবাহিনী।
এমনই একটি জলপথ ‘বাব আল-মান্দেব প্রণালি’। সেটিও বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। গতকাল বুধবার এক বিবৃতিতে আইআরজিসি বলেছে, আঞ্চলিক জ্বালানি রপ্তানির পথ হয় সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে, নয়তো সবার জন্যই বন্ধ করে দেয়া হবে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, এ হুমকির মাধ্যমে ইয়েমেনের বিদ্রোহী গোষ্ঠী হুথিদের ব্যবহার করে লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের ইঙ্গিত দিয়েছে ইরান। এর ফলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে যুদ্ধের আরেকটি ফ্রন্ট তৈরি হতে পারে এবং বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহপথ ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে। গুরুত্বপূর্ণ এ প্রণালিটি লোহিত সাগরকে এডেন উপসাগরের সঙ্গে সংযুক্ত করেছে। এ পথ দিয়ে সৌদি আরবের তেল রপ্তানি এবং বৈশ্বিক নৌপরিবহনের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ পরিচালিত হয়।
ইরানের প্রেস টিভির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার হুথিদের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা সতর্ক করে বলেন, সৌদি আরব ইয়েমেনে হামলা অব্যাহত রাখলে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধ করে দেয়া হতে পারে। এতে তেলের দাম প্রতি ব্যারেল ২০০ ডলারে পৌঁছে যেতে পারে।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে শান্তি আলোচনার বিষয়ে ইরানের উপ-পররাষ্ট্রমন্ত্রী কাজেম গারিবাবাদি স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, যত হুমকিই আসুক না কেন, তেহরান কখনোই যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনার জন্য নিজে থেকে উদ্যোগ নেবে না। ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম আইআরআইবিকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এ তথ্য জানান তিনি।
গারিবাবাদি বলেন, যুদ্ধ চলাকালে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে কথা বলা এক ধরনের ‘প্রহসন’। যুক্তরাষ্ট্র আমাদের আন্তর্জাতিক আইন শেখাতে পারে না। ওয়াশিংটন নিজেই আন্তর্জাতিক নীতিমালা লঙ্ঘন করে অন্যদের উপদেশ দেয়ার চেষ্টা করছে।
হরমুজ প্রণালি নিয়ে চলমান উত্তেজনার প্রসঙ্গ টেনে ইরানের এই কূটনীতিক বলেন, ‘ওমানের সঙ্গে প্রণালিটির কিছু অংশের যৌথ মালিকানা থাকলেও বর্তমান পরিস্থিতি যুদ্ধকালীন। তাই জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থে পুরো হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখা ইরানের জন্য প্রয়োজনীয়।’ ভূ-রাজনীতি বিশ্লেষকদের ধারণা, গারিবাবাদির এই বক্তব্য ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্কের টানাপোড়েন আরো বেড়ে যাওয়ার ইঙ্গিত।
এমন আবহে মধ্যপ্রাচ্য বিশেষজ্ঞ ফাওয়াজ গেরগেস মনে করেন, তেহরান ওয়াশিংটনকে দেখাতে চাইছে, তারা প্রয়োজনে হরমুজ ও বাব আল-মান্দেব কৌশলগত দুই জলপথই একসঙ্গে অচল করে দিতে সক্ষম। এতে শুধু যুক্তরাষ্ট্রই নয়, পরোক্ষভাবে চাপে রয়েছে পুরো বিশ্ব। এ কারণেই ইরানকে বাগে আনা যাচ্ছে না।
