উড়ন্ত ফ্রান্সের ডানা ভাঙল স্পেন
মুহাম্মদ রুহুল আমিন
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ফুটবলে সব সময় গতি জেতে না, সব সময় তারকারাও ম্যাচের ভাগ্য নির্ধারণ করেন না। কখনো কখনো একটি সুসংগঠিত পরিকল্পনা, ধৈর্য, বলের নিয়ন্ত্রণ এবং দলগত সমন্বয় ব্যক্তিগত নৈপুণ্যের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে ডালাসে বিশ্বকাপের প্রথম সেমিফাইনাল ছিল ঠিক তেমনই এক লড়াই। একদিকে ছিল কিলিয়ান এমবাপ্পে, উসমান দেম্বেলে, মাইকেল ওলিসেদের গতিময় ফ্রান্স; অন্যদিকে লুইস দে লা ফুয়েন্তের কৌশলী, ছন্দময় ও শৃঙ্খলিত স্পেন। শেষ পর্যন্ত জয় হলো পরিকল্পনার। ফ্রান্সকে ২-০ গোলে হারিয়ে ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে উঠল ২০১০ সালের বিশ্বচ্যাম্পিয়নরা।
এই ম্যাচকে বলা হচ্ছিল ‘ফাইনালের আগে আরেক ফাইনাল’। কারণ টুর্নামেন্টজুড়ে সবচেয়ে পরিণত ফুটবল খেলেছিল এই দুই দল। কিন্তু মাঠের লড়াইয়ে সেই প্রত্যাশিত সমতা দেখা যায়নি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ম্যাচের ছন্দ নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে স্পেন। ফ্রান্সের দ্রুতগতির আক্রমণভাগকে তারা মাঝমাঠেই আটকে দিয়েছে। এমবাপ্পে, দেম্বেলে কিংবা ওলিসে-কেউই নিজেদের স্বাভাবিক খেলাটা খেলতে পারেননি।
ম্যাচের প্রথম বড় সুযোগটি অবশ্য পেয়েছিল ফ্রান্স। ১৬ মিনিটে দেম্বেলের দীর্ঘ পাসে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যান এমবাপ্পে। কিন্তু পেদ্রো পোরো, পাউ কুবারসি ও আইমেরিক লাপোর্তের সমন্বিত রক্ষণ সেই বিপদ সামলে দেয়। পরে সেটিই যেন ম্যাচের প্রতিচ্ছবি হয়ে ওঠে। ফ্রান্স যতবার গতি দিয়ে আক্রমণে উঠতে চেয়েছে, স্পেন ততবার সংখ্যার আধিক্য ও অবস্থানগত শৃঙ্খলায় তাদের থামিয়েছে।
২০ মিনিটে আসে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেয়া মুহূর্ত। লামিন ইয়ামালের দুর্দান্ত দৌড়ে বিভ্রান্ত হয়ে ডি-বক্সে তাকে ফাউল করেন লুকাস দিনিয়ে। রেফারি পেনাল্টির বাঁশি বাজাতে এক মুহূর্তও দেরি করেননি। ২২ মিনিটে স্পট কিক থেকে মিকেল ওয়ারসাবাল গোল করে স্পেনকে এগিয়ে দেন। বিশ্বকাপে এটি ছিল তার পঞ্চম গোল।
গোল হজমের পর ফ্রান্সের খেলা আরো অগোছালো হয়ে পড়ে। চার আক্রমণভাগের খেলোয়াড় নিয়ে নামা দিদিয়ের দেশমের দল মাঝমাঠেই হেরে যায়। রদ্রি, ফাবিয়ান রুইস, দানি ওলমো ও আলেক্স বায়েনার সমন্বিত প্রেসিং এবং বলের নিয়ন্ত্রণ ফরাসিদের ছন্দ নষ্ট করে দেয়। এমবাপ্পেকে কখনো একা জায়গা দেয়া হয়নি। বল পেলেই তার সামনে হাজির হয়েছে দুই বা তিনজন স্প্যানিশ খেলোয়াড়।
৩০ মিনিটে চোট পেয়ে উইলিয়াম সালিবা মাঠ ছাড়লে ফ্রান্সের রক্ষণে বড় ধাক্কা লাগে। এরমধ্যেই স্পেন একের পর এক ছোট ছোট পাসে ফরাসি রক্ষণকে ব্যস্ত রাখে। ৩৮ মিনিটে দারুণ দলগত আক্রমণ থেকে ব্যবধান বাড়ানোর সুযোগও তৈরি করেছিল তারা। উপামেকানোর হস্তক্ষেপে সে যাত্রায় রক্ষা পায় ফ্রান্স।
দ্বিতীয়ার্ধে দেশম বদলি এনে আক্রমণের ধার বাড়ানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু লুইস দে লা ফুয়েন্তে কোনো তাড়াহুড়া করেননি। তিনি জানতেন, ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে থাকলে সুযোগ আসবেই। ঠিক সেটাই হয়েছে ৫৮ মিনিটে। দানি ওলমোর বুদ্ধিদীপ্ত পাস ধরে ডান দিক থেকে উঠে এসে নিখুঁত ফিনিশিংয়ে গোল করেন পেদ্রো পোরো। ২-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ার পর স্পেন আর ম্যাচ হাতছাড়া করেনি। এরপরও তারা শুধু রক্ষণে সরে যায়নি। বরং বলের নিয়ন্ত্রণ ধরে রেখে ফ্রান্সকে দৌড় করিয়েছে। ৬১ মিনিটে ইয়ামালের আরেকটি গোল অফসাইডে বাতিল না হলে ব্যবধান আরো বাড়তে পারত।
সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব অবশ্য স্পেনের রক্ষণভাগের। পুরো ম্যাচে এমবাপ্পেকে প্রায় বোতলবন্দি করে রাখা হয়। তিনি কার্যকর কোনো সুযোগ তৈরি করতে পারেননি। দেম্বেলেও বিচ্ছিন্ন ছিলেন। ফ্রান্সের প্রথম সত্যিকারের পরীক্ষায় ফেলতে পারা শট আসে ম্যাচের একেবারে শেষ দিকে। উনাই সিমন সেখানেও ছিলেন নির্ভুল।
এই জয় কেবল একটি ম্যাচ জেতা নয়, একটি ফুটবল দর্শনেরও জয়। ব্যক্তিনির্ভর ফুটবলের বিপরীতে দলগত সমন্বয়, ধৈর্য ও অবস্থানগত শৃঙ্খলা যে কত বড় শক্তি হতে পারে, সেটাই আবার দেখাল স্পেন। বল দখল, মাঝমাঠের নিয়ন্ত্রণ, সঠিক সময়ে প্রেসিং এবং প্রয়োজনমতো গতি কমিয়ে-বারিয়ে পুরো ম্যাচ নিজেদের ছকে খেলিয়েছে তারা।
এই ম্যাচে লুইস দে লা ফুয়েন্তে যেন কৌশলের এক নিখুঁত পাঠই পড়ালেন। এমবাপ্পে-দেম্বেলেদের গতি থামাতে তিনি রক্ষণকে নিচে নামিয়ে রাখেননি; বরং মাঝমাঠেই তাদের খেলার ছন্দ ভেঙে দিয়েছেন। রদ্রিকে কেন্দ্র করে ফাবিয়ান রুইস, দানি ওলমো ও আলেক্স বায়েনার ঘন ঘন অবস্থান বদল ফ্রান্সকে কখনোই স্বস্তিতে খেলতে দেয়নি। বিপরীতে দিদিয়ের দেশমের পরিবর্তন কিংবা আক্রমণাত্মক বিন্যাসও ম্যাচের মোড় ঘোরাতে পারেনি। বরং সময় যত গড়িয়েছে, স্পেন ততই আত্মবিশ্বাসী হয়েছে। বল দখল, পাসের নিখুঁততা ও ম্যাচের গতি নিয়ন্ত্রণে রেখে তারা বুঝিয়ে দিয়েছে, আধুনিক ফুটবলে শুধু দ্রুতগতি নয়, সঠিক পরিকল্পনা, ধৈর্য ও দলগত বোঝাপড়াই সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
এই জয়ে টানা তৃতীয়বারের মতো বড় টুর্নামেন্টের নকআউটে ফ্রান্সকে বিদায় করল স্পেন। এর আগে ইউরোপীয় চ্যাম্পিয়নশিপ ও নেশন্স লিগের সেমিফাইনালেও একই পরিণতি হয়েছিল ফরাসিদের। একইসঙ্গে স্পেন গড়েছে টানা ৩৭ প্রতিযোগিতামূলক ম্যাচ অপরাজিত থাকার নতুন বিশ্বরেকর্ড। ৩০ জয় ও ৭ ড্রয়ে গড়া এই অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতা তাদের বর্তমান সামর্থ্যরে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
২০১৪ সালে গ্রুপ পর্ব থেকেই বিদায়, ২০১৮ ও ২০২২ সালে শেষ ষোলো- বিশ্বকাপে দীর্ঘ হতাশার অধ্যায় পেরিয়ে স্পেন আবার ফিরেছে সবচেয়ে বড় মঞ্চে। আর সেই প্রত্যাবর্তনের স্থপতি নিঃসন্দেহে লুইস দে লা ফুয়েন্তে। সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়েও তিনি নিজের দর্শন থেকে সরে যাননি। ধীরে ধীরে এমন একটি দল গড়ে তুলেছেন, যেখানে কোনো একক তারকার চেয়ে বড় দলগত রসায়ন, শৃঙ্খলা এবং কৌশলগত পরিপক্বতা।
এখন স্পেনের সামনে আর মাত্র একটি ধাপ। আগামী রবিবার নিউজার্সির ফাইনালে তাদের প্রতিপক্ষ কে হবে। দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হওয়ার স্বপ্ন থেকে তারা আর মাত্র ১টি জয় দূরে। ৩৭ ম্যাচের অপরাজিত যাত্রা, টানা ৩ টুর্নামেন্টে ফ্রান্সকে সেমিফাইনাল থেকে বিদায় এবং ১৬ বছর পর বিশ্বকাপের ফাইনালে ফেরা- সব মিলিয়ে স্পেন জানিয়ে দিল, আধুনিক ফুটবলের সবচেয়ে কার্যকর ভাষা শুধু গতি নয়; শৃঙ্খলা, ধৈর্য, কৌশল ও দলগত সমন্বয়ই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বড় শক্তি।
