ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধ
হরমুজ নিয়ে কী হচ্ছে, চাপ কোথায়
মিলিতা বাড়ৈ মুন্নি
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
হরমুজ প্রণালি
হরমুজ প্রণালি দিয়ে নতুন নৌপথ নির্ধারণে একটি চূড়ান্ত চুক্তির কাছাকাছি পৌঁছেছে ইরান-ওমান। তবে মার্কিন অবরোধ প্রত্যাহারসহ কিছু শর্ত পূরণ না হওয়া পর্যন্ত পথটি উন্মুক্ত করবে না তেহরান। এরই ধারাবাহিকতায় হরমুজে বাণিজ্যিক জাহাজে হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। এমন অবস্থায়ও হরমুজ উন্মুক্ত হওয়ার ব্যাপারে আশাহত হননি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘সব ঠিক হয়ে যাবে। সব সময় ঠিক হয়েই যায়। এটা অনেকটা দাবা খেলার মতো।’
এর আগে গত শনিবার তেহরান স্পষ্ট করে জানায়, হরমুজ আবার খুলে দেয়ার বিষয়টি যুক্তরাষ্ট্রের কাছ থেকে ক্ষতিপূরণ আদায়সহ অন্যান্য শর্তের ওপর নির্ভর করছে। শর্তগুলো হলো- ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের নতুন করে হুমকি বন্ধ করা; ইরান এবং লেবানন, ফিলিস্তিন, ইয়েমেন ও ইরাকে থাকা দেশটির (ইরান) মিত্রদের বিরুদ্ধে আগ্রাসন বন্ধ করা; উপসাগরে যুক্তরাষ্ট্রের নৌ অবরোধ প্রত্যাহার করা; ইরানের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া এবং জব্দ করা ইরানি সম্পদ ছাড় করে দেয়া।
এর একদিন আগে শুক্রবার হরমুজ নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তা বলেছিলেন, ‘হরমুজ প্রণালির দুই পাশে ইরান ও ওমান অবস্থিত। ওয়াশিংটন আশা করছে ইরান ও ওমানের মধ্যে শিগগিরই একটি চুক্তি হবে। চুক্তিটি হলে তেলের স্বাভাবিক পরিবহন আবার শুরু হতে পারে।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই মার্কিন কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, ‘বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে বাধা দূর করতে একবার চুক্তির ঘোষণা এলেই ইরানের বন্দরগুলোর ওপর থেকে অবরোধ তুলে নেবে যুক্তরাষ্ট্র। তবে এই পদক্ষেপ নির্ভর করবে ইরান তাদের প্রতিশ্রæতি কতটা বাস্তবায়ন করে, তার ওপর।’
গত শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বিবৃতিতে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানিয়েছে, বর্তমান অবরোধ শুরু হওয়ার পর থেকে তারা মানবিক সহায়তা নিয়ে ৩০টির বেশি জাহাজকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছে। ৫৩টি জাহাজ ফিরিয়ে দেয়া হয়েছে। ২টি জাহাজ বিকল করে দেয়াসহ অন্য আরো ২টিতে তল্লাশি চালিয়েছে মার্কিন বাহিনী।
অন্যদিকে ইরানের বিপ্লবী গার্ড বাহিনী জানিয়েছে, অনুমতি না নেয়া জাহাজে হামলা চালাচ্ছে তারা। এখন প্রণালিটি আবার খুলে দেয়া নির্ভর করছে ওয়াশিংটন ইরানের শর্তগুলো মেনে নেয় কিনা, তার ওপর। ইরান-ওমান আলোচনার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর মুখপাত্র হোসেইন মোহেব্বি বলেছেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র যখনই ইরানের শর্তগুলো মেনে নেবে, হরমুজ প্রণালি নিশ্চিতভাবেই আবার খুলে দেয়া হবে।’ এ তথ্য নিশ্চিত করেছে ইরানের তাসনিম সংবাদ সংস্থা।
আর ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি বলেছেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে সমুদ্রপথ পরিবর্তনের বিষয়টি ‘প্রযুক্তিগত ও আইনগত’ বিষয়। এই প্রণালি দিয়ে জাহাজ চলাচলের আগের নিয়মটি তেহরানের কাছে আর গ্রহণযোগ্য নয়। একটি স্থায়ী
রুটের প্রযুক্তিগত ও আইনি সমস্যাগুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত ওমানের সঙ্গে একটি অস্থায়ী রুট নিয়ে আলোচনা করছে ইরান।’
যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বর্তমানে কোনো সরাসরি আলোচনা হচ্ছে না জানিয়ে আরাগচি বলেন, ‘দুই দেশের মধ্যে এখন শুধু মধ্যস্থতাকারীদের মাধ্যমে বার্তা আদান-প্রদান চলছে। মধ্যস্থতাকারীরা দুই দেশের মধ্যে আবারো আলোচনা শুরুর পথ খুঁজতে চেষ্টা করছেন। তবে ইরানের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সমঝোতা স্মারকের কথিত লঙ্ঘনের বিষয়টি সমাধান না হওয়া পর্যন্ত আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়ার সম্ভাবনা নেই।’ ইরানের বার্তা সংস্থা মেহেরকে এসব তথ্য জানান আরাগচি।
এদিকে হরমুজ নিয়ে ওমানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, ‘হরমুজ দিয়ে জাহাজ চলাচলের ব্যবস্থা নিয়ে ইরানের সঙ্গে তাদের আলোচনা ইতিবাচক ও গঠনমূলক হয়েছে।’ আলোচনাকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে, এমন কোনো পদক্ষেপ নেয়া থেকে বিরত থাকার ওপর জোর দিচ্ছে ওমান। আলোচনাটি এমনভাবে এগিয়ে নেয়া হচ্ছে, যেখানে সব পক্ষের স্বার্থের কথা বিবেচনা করা হয়েছে। হরমুজ পার হওয়ার সময় জাহাজগুলোয় বারবার হামলার নিন্দা জানিয়েছে দেশটি। তবে এর জন্য কাউকে সরাসরি দায়ী করেনি তারা।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে হরমুজ প্রণালি দিয়ে অবাধে জাহাজ চলাচল করত। তবে এখন এই প্রণালির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে এবং জাহাজ থেকে ফি আদায় করতে চায় ইরান। এ কারণে বর্তমানে ইরান জাহাজগুলোকে শুধু নিজেদের উপকূলঘেঁষা পথ ব্যবহার করতে দিচ্ছে। যা মানছে না যুক্তরাষ্ট্র। এই দ্ব›েদ্বর কারণেই আলোচনা বন্ধ রেখে ফের সংঘাতে জড়িয়েছে উভয়পক্ষ।
মূলত হরমুজ প্রণালিকে বিশ্বব্যাপী তেল বাণিজ্যের গুরুত্বপূর্ণ ধমনি হিসেবে মনে করা হয়। বিশ্বের এক পঞ্চমাংশ তেল হরমুজ প্রণালি দিয়ে রপ্তানি হয়। যা প্রতিদিন বিশ্ব তেল সরবরাহের প্রায় ২০ শতাংশ। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি ইরানে যৌথ হামলা চালায় যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল। মার্চ মাস থেকেই কার্যত বন্ধ হয়ে যায় হরমুজ প্রণালি।
ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা বলছেন, হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর বাব এল-মান্দেব প্রণালিকে এশিয়ার দেশগুলোতে জ্বালানি সরবরাহের ‘লাইফলাইন’ হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছিল। তবে মধ্যপ্রাচ্য সংঘাতকে কেন্দ্র করে ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহী গোষ্ঠী, ইরাকের মিলিশিয়া ও ইরান- এই তিন শত্রæর মুখোমুখি হয়েছে সৌদি আরব। হুতি বিদ্রোহী ও সৌদি আরবের মধ্যে যুদ্ধবিরতি ভেঙে আবার সংঘাত শুরু হওয়ায় শিগগিরই জলপথটি স্বাভাবিক হওয়ার লক্ষণ নেই। অন্যদিকে একমাত্র সচল থাকা সুয়েজ খালের পাশে হামলার ঘটনা উদ্বেগের। এমন পরিস্থিতিতে আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা বেড়েছে। একই সঙ্গে ইরান যুদ্ধের কারণে সরাসরি ভুগতে শুরু করেছে পুরো মধ্যপ্রাচ্য ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চল।
এমন আবহে গত রবিবার নিউজ ওয়েবসাইট অ্যাক্সিওসের সঙ্গে এক ফোনালাপে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, ‘আমরা তাদের (ইরান) সঙ্গে কেবল অর্ধেক দর-কষাকষি করছি। আমরা শুধু ইরানকে দেখছি, তাদের বিশাল মূল্যস্ফীতি রয়েছে এবং তাদের হাতে কোনো টাকা নেই।’
ট্রাম্প জোর দিয়ে বলেন, ‘হরমুজ প্রণালিতে ইরানের বন্দরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের অবরোধের কারণেই ইরান এখন খুবই খারাপ অবস্থায় পড়েছে।’
অপরদিকে ইরানের প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান বলেছেন, ‘দেশে (ইরান) এখন সংহতি, শক্তি ও ঐক্য বিরাজ করছে। আর যত দূর আমি জানি, এই যুদ্ধে ইরানকে বিজয়ী ও শক্তিশালী হিসেবেই বিবেচনা করা হচ্ছে।’
উল্লেখ্য, ইরান যুদ্ধে কে বিজয়ী সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার আগে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলে হরমুজ প্রণালি উন্মুক্ত করে দেয়া উচিত। কারণ হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেল ও গ্যাসের সরবরাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। যা পরোক্ষভাবে বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বড় ধরনের সংকট তৈরি করেছে। আর সরাসরি ভুগছে মধ্যপ্রাচ্য- এমনটিই বলছেন ভূরাজনীতি বিশ্লেষকরা।
