লোডশেডিংয়ে ব্যাহত হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা, দুর্ভোগে রোগীরা
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
দেশজুড়ে চলমান বিদ্যুৎ সংকট ও ঘনঘন লোডশেডিংয়ের প্রভাবে হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। ভোগান্তি ও দুর্ভোগ বেড়েছে রোগী ও তাদের সঙ্গে থাকা স্বজনদের। ঢাকার চেয়ে গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং বেশি হওয়ায় অনেকটাই ভেঙে পড়েছে প্রান্তিক স্বাস্থ্যসেবা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎহীন থাকায় হাসপাতালগুলোর ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে নেমে আসে অন্ধকার, তীব্র গরম সেই সঙ্গে চরম দুর্ভোগ। কোথাও জেনারেটর থাকলেও জ্বালানির অভাবে তা চালানো যায় না। আবার কোথাও সীমিত সোলার ব্যবস্থার কারণে অফিস কক্ষ সচল থাকলেও সাধারণ রোগীদের ওয়ার্ডগুলো থাকছে অন্ধকারে। দিনের পর দিন রোগীদের এমন ভোগান্তি এখন চরম আকার নিয়েছে।
গত ২২ আগস্ট সকাল সাড়ে ৯টা থেকে সাড়ে ১১টা পর্যন্ত বিদ্যুৎহীন ছিল চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতাল। এতে ভোগান্তিতে পড়েন হাসপাতালের রোগী ও স্বজনরা। জরুরি বিভাগে চিকিৎসাসেবা নিতে, পরীক্ষা করাতে আসা রোগীদের বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগে সেবা পেতে রোগীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে।
রেডিওলজি ও ইমেজিং বিভাগের প্রধান কাজী মো. আলম জানান, বিদ্যুৎ না থাকায় রোগীদের এক্স-রে করা সম্ভব হয়নি। আলট্রাসনোগ্রাফির মেশিন চালাতেও শীতাতপনিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার প্রয়োজন হয়। বিদ্যুৎ না থাকায় সেটিও চালু রাখা সম্ভব হয়নি।
চমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মো. তসলিম উদ্দীন বলেন, বিদ্যুৎ না থাকলেও হাসপাতালের নিজস্ব জেনারেটরের মাধ্যমে চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছিল। বিশেষ করে অপারেশন থিয়েটার, জরুরি বিভাগ, সার্জারি ওয়ার্ড, আইসিইউ, সিসিইউ ও এইচডিইউ সচল রাখা হয়। এতে বড় ধরনের কোনো সমস্যা হয়নি।
তীব্র লোডশেডিংয়ের কারণে মোবাইল লাইট জ্বালিয়ে চিকিৎসাসেবা চালিয়ে যাওয়ার খবরও ওঠে এসেছে বিভিন্ন গণমাধ্যমে। গত ১২ আগস্ট মেহেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালে তীব্র লোডশেডিংয়ে মোবাইল লাইট জ্বালিয়ে চিকিৎসাসেবার রিপোর্ট প্রচার হয়।
বিদ্যুৎ না থাকায় কুমিল্লা জেলার ১৭ উপজেলার উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সরকারি-বেসরকারি হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোতে রোগীদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা, জরুরি চিকিৎসা এমনকি জটিল রোগীদের অস্ত্রোপচারও ব্যাহত হচ্ছে বলে জানা গেছে।
দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানান, বিদ্যুৎ বিভ্রাট এখন চরম আকার ধারণ করেছে। দিন-রাত সমানতালে লোডশেডিং হওয়ায় হাসপাতালের স্বাভাবিক চিকিৎসাসেবা ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে রোগীদের বিভিন্ন পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং জটিল রোগীদের অপারেশন করা সম্ভব হচ্ছে না। দিনাজপুরের বিরামপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের দায়িত্বরত স্বাস্থ্যসেবা কর্মীরা জানান, লোডশেডিংয়ের সময় ভর্তি রোগীদের গরমে কষ্ট হচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকায় অন্ধকারে ইনজেকশন ও স্যালাইন দেয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। শ্বাসকষ্টের রোগীদের নেবুলাইজার ও অক্সিজেন কনসেনট্রেটর চালাতেও সমস্যার কথা জানান তারা।
বিদ্যুৎ না থাকায় ধামরাই উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এক্স-রে সেবা ব্যাহত হচ্ছে। সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে লোডশেডিংয়ের সময় প্যাথলজি ও অপারেশনসহ জরুরি সেবা ব্যাহত হওয়ার খবরও মিলেছে। হাসপাতালের জেনারেটর দীর্ঘদিন ধরে অচল থাকায় বিদ্যুৎ চলে গেলে বিকল্প ব্যবস্থা থাকে না।
জামালপুরের সরিষাবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই ধরনের পরিস্থিতির কথা উঠে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে জেনারেটর অচল থাকায় ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের সময় রোগীদের দুর্ভোগ বাড়ছে। বিশেষ করে রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে রোগী ও স্বজনদের ভোগান্তি চরমে ওঠে।
গত ১২ আগস্ট ভারপ্রাপ্ত স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগে নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ২৪ ঘণ্টা নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত হয়। প্রায় ৬ লাখ টাকা ব্যয়ে স্থাপিত এই বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় যুক্ত হয় সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সোলার ইনভার্টার, লিথিয়াম ব্যাটারি ও অটোমেটিক চেঞ্জওভার সুইচ।
তবে রাজধানী ঢাকার চিত্র তুলনামূলক অনেকটাই ভালো। বিদ্যুৎ চলে গেলে সরবরাহ নিশ্চিত করতে বিকল্প ব্যবস্থায় সরবরাহ সচল রাখা হয়। রাজধানীর বেসরকারি হাসপাতাল হেলথ অ্যান্ড হোপ-এর চেয়ারম্যান জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. এম এইচ চৌধুরী লেলিন ভোরের কাগজকে বলেন, বিদ্যুৎ সরবরাহ স্বাভাবিক না থাকলে হাসপাতাল-ক্লিনিকে সমস্যা হবেই। আমাদের হাসপাতালে তেমন সমস্যা হয় না, কারণ জেনারেটর ব্যবহার করি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা জেনারেটরে চললে খরচ বেড়ে যায়। লিফট এয়ারকন্ডিশন সবগুলো চালু রাখলে সেই লোডটাওতো জেনারেটরের উপর পরে। ঢাকার শ্যামলীতে অবস্থিত ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট টিবি হাসপাতালের উপ-পরিচালক ডা. আয়শা আক্তার ভোরের কাগজকে
বলেন, বিদ্যুৎ চলে গেলে আমাদের হাসপাতালে সমস্যা এখনো পর্যন্ত হয়নি। জেনারেটর আছে। বিদ্যুৎ চলে গেলে সঙ্গে সঙ্গে জেনারেটর চালু হয়ে যায়। হাসপাতালে ভর্তি অধিকাংশ রোগীকেই অক্সিজেন দিতে হয়। ফলে কোন ব্যত্যয় ঘটলে বড় সমস্যা তৈরি হবে। তাই এ বিষয়ে আগে থেকেই আমাদের প্রস্তুতি থাকে।
লোডশেডিংয়ের কারণে হাসপাতালগুলোতে রোগীদের সমস্যার কথা স্বীকার করেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (হাসপাতাল ও ক্লিনিকসমূহ) ডা. মো. নুরুল ইসলাম। তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, হাসপাতালের পরিচালকদের সঙ্গে কথা হয়েছে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় এবং স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বিষয়টি সম্পর্কে অবগত আছেন। লোডশেডিং থাকলেও অধিকাংশ হাসপাতালেই ইমার্জেন্সি ও আইসিইউতে জেনারেটর, আইপিএস বা সোলার প্যানেলের মাধ্যমে বিকল্প ব্যবস্থা আছে। আমরা হাসপাতাল পরিচালকদের বলেছি নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় কীভাবে এই সমস্যা সমাধান করা যায় সেই উদ্যোগ নেয়ার জন্য। যাদের জেনারেটর আছে তারা জেনারেটর চালাবে, যেখানে জেনারেটর কার্যকর নয় তা যেন কার্যকর করা হয় সেই কথা বলা হয়েছে। এক কথায় স্থানীয় পর্যায়ের পরিকল্পনা করে সেই অনুযায়ী সমস্যা সমাধানের নির্দেশ দেয়া হয়েছে। কারোর যদি কোথাও সমস্যা হয় সে বিষয়টিও আমাদের জানানোর জন্য বলা হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত অভিযোগ খুব একটা বেশি আসেনি বলেও জানান ডা. নুরুল ইসলাম।
