হাদি হত্যা মামলার তদন্তে বেরিয়ে এলো চাঞ্চল্যকর তথ্য
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৪ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৬ এএম
ছবি : সংগৃহীত
ইনকিলাব মঞ্চের মুখ্য সমন্বয়ক ও জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের পরিচিত মুখ শরিফ ওসমান হাদি হত্যা মামলার তদন্তে হত্যার পরিকল্পনা, নজরদারি, হামলা, পালানোর প্রস্তুতি এবং ভারতে আত্মগোপনের বিষয়ে বেশ কিছু তথ্য উঠে এসেছে বলে তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তদন্তে বলা হয়েছে, হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই হাদির চলাচল ও নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছিল। পরে হামলার প্রধান শুটার হিসেবে চিহ্নিত ফয়সাল করিম মাসুদ ওরফে দাউদ এবং মোটরসাইকেলচালক মোহাম্মদ আলমগীর শেখ সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে চলে যান। ২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স তাদের গ্রেপ্তার করে।
তদন্তে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকেও হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার তথ্য এসেছে। তবে তদন্তে উঠে আসা এসব অভিযোগের চূড়ান্ত সত্যতা আদালতের বিচারেই নির্ধারিত হবে।
হামলার আগে নজরদারি
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ২০২৫ সালের ১২ ডিসেম্বর হামলার কয়েক দিন আগে থেকেই ফয়সাল ও আলমগীর হাদির গতিবিধি অনুসরণ করছিলেন। অনুসারী, ভোটার বা রাজনৈতিক কর্মীর পরিচয় ব্যবহার করে তাঁরা হাদির চলাচল, গন্তব্য ও নিরাপত্তাব্যবস্থা সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে।
৯ ডিসেম্বর ঢাকার সেন্ট্রাল লাইব্রেরিতে হাদির সঙ্গে ৭-৮ জনের একটি বৈঠকেও ফয়সালের উপস্থিতির তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তকারীরা এটিকে হামলার প্রস্তুতির অংশ হিসেবে দেখেছেন।
হামলার দিন দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে হাদি মতিঝিল ওয়াপদা মসজিদে জুমার নামাজ পড়তে প্রবেশ করেন। এর কয়েক মিনিট পর ফয়সাল ও আলমগীর মোটরসাইকেলে করে মসজিদের কাছাকাছি এলাকায় অবস্থান নেন।
আরও পড়ুন: প্রধানমন্ত্রীর এপিএস পরিচয়ে ফেসবুকে প্রতারণা, গ্রেপ্তার ১
প্রায় সোয়া এক ঘণ্টা তাঁরা ওই এলাকা ও আশপাশে অবস্থান করে হাদির গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করেন। নামাজ শেষে হাদি অটোরিকশায় উঠলে তাঁরা মোটরসাইকেলে করে তাঁকে অনুসরণ করেন।
দুপুর আনুমানিক ২টা ২৪ মিনিটে বক্স কালভার্ট রোডের ডিআর টাওয়ারের সামনে পৌঁছালে মোটরসাইকেলের পেছনে থাকা ফয়সাল খুব কাছ থেকে হাদিকে গুলি করেন বলে তদন্তে উল্লেখ করা হয়েছে। এরপর তাঁরা বিজয়নগরের পানির ট্যাংকি মোড় হয়ে পল্টনের দিকে চলে যান।
গুলিবিদ্ধ হাদিকে প্রথমে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং পরে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে সিঙ্গাপুরে নেওয়া হলে সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ১৮ ডিসেম্বর রাত ১০টার দিকে তাঁর মৃত্যু হয়।
কারা ছিলেন হামলায়?
প্রাথমিক তদন্তে ফয়সাল করিম মাসুদকে প্রধান শুটার এবং মোহাম্মদ আলমগীর শেখকে মোটরসাইকেলচালক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। তদন্ত প্রতিবেদনে ফয়সালকে ঢাকা মহানগর উত্তর ছাত্রলীগের সাবেক সহসভাপতি ও আদাবর থানা ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আলমগীরও আদাবর এলাকার স্থানীয় আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
তদন্তকারীরা মোবাইল নম্বর, কল রেকর্ড, সিডিআর, আইএমইআই, সিসিটিভি ফুটেজ ও সন্দেহভাজনদের অবস্থান বিশ্লেষণ করে হামলার সঙ্গে আরও কয়েকজনের যোগাযোগের তথ্য পেয়েছেন বলে দাবি করেছেন।
অস্ত্র সরবরাহ, নিরাপদ আশ্রয়, পালানোর প্রস্তুতি এবং হামলার আগের রাতে কয়েকটি এলাকায় সন্দেহজনক চলাচলের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
হামলার আগের রাতেও তৎপরতা
তদন্ত অনুযায়ী, হামলার আগের দিন ১১ ডিসেম্বর আলমগীর আদাবরে তাঁর বাসায় গিয়ে স্ত্রী, মা ও দুই মেয়ের সঙ্গে দেখা করেন। হামলার আগে ও পরে একাধিক মোবাইল নম্বর ও হ্যান্ডসেট ব্যবহারের তথ্যও পাওয়া গেছে।
তদন্তকারীরা জানান, কিছু নম্বর অল্প সময়ের জন্য সক্রিয় ছিল এবং কিছু নম্বর অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রে নিবন্ধিত ছিল। একই আইএমইআই নম্বরে একাধিক সিম ব্যবহারের তথ্যও তদন্তে এসেছে।
আরও পড়ুন: দুই পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্ব ভাগ, পরিপত্র জারি
এ ছাড়া হামলার আগের রাতে তানজিমুল ও আলী নামে দুই ব্যক্তি পৃথকভাবে কেরানীগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে যান বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পরে তাঁদের ঢাকায় ফেরার তথ্য পাওয়া যায়। কয়েকজনকে পরবর্তী সময়ে র্যাব গ্রেপ্তার করে। হামলায় তাঁদের ভূমিকা ছিল কি না, তা তদন্তের অংশ হিসেবে খতিয়ে দেখা হয়।
হামলার পর সীমান্ত পেরিয়ে ভারতে
তদন্তকারীদের দাবি, হত্যাকাণ্ডের পর ফয়সাল ও আলমগীরের ভারতে পালানোর প্রস্তুতিও আগে থেকেই করা হয়েছিল। দেশীয় মানব পাচারকারী ও চোরাকারবারি নেটওয়ার্কের সহায়তায় তাঁরা ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট সীমান্ত দিয়ে ভারতে প্রবেশ করেন বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
ভারতীয় নাগরিক ফিলিপ সাংমাসহ কয়েকজন তাঁদের সীমান্ত পারাপার ও ভারতে অবস্থানে সহায়তা করেছিলেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চে পশ্চিমবঙ্গের বিশেষ টাস্কফোর্স উত্তর ২৪ পরগনার বনগাঁ সীমান্ত এলাকা থেকে ফয়সাল ও আলমগীরকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের বিরুদ্ধে ভারতে অবৈধ অনুপ্রবেশ, পরিচয় গোপন এবং বেআইনিভাবে অবস্থানের অভিযোগ আনা হয়।
তদন্তসংশ্লিষ্টদের দাবি, ভারতের জাতীয় তদন্ত সংস্থা ও গোয়েন্দা কর্মকর্তারাও তাঁদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। ওই জিজ্ঞাসাবাদে বাংলাদেশে তাঁদের রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, অস্ত্র সরবরাহকারী, অর্থদাতা এবং ভারতে সহযোগিতাকারীদের বিষয়ে তথ্য পাওয়া গেছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বাপ্পী কোথায়?
তদন্ত প্রতিবেদনে পলাতক যুবলীগ নেতা মো. তাইজুল ইসলাম বাপ্পীকে হত্যাকাণ্ডের অন্যতম পরিকল্পনাকারী হিসেবে চিহ্নিত করার কথা বলা হয়েছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বাপ্পী ২০২৫ সালের ২৩ সেপ্টেম্বর ভ্রমণ ভিসায় বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে গিয়ে কলকাতায় অবস্থান করছেন।
তদন্তে দাবি করা হয়েছে, ভারতে তিনি পরিচয় গোপন করে মো. মহিউদ্দিন চৌধুরী নামে আধার ও প্যান কার্ড সংগ্রহ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর পরিচয়পত্রের কিছু তথ্য পরিবর্তন করা হয়েছে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র, পরে অধিকতর তদন্ত
হাদি হত্যার ২১ দিনের মধ্যে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ১৭ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয়। তবে হাদির পরিবার ও ইনকিলাব মঞ্চ ওই অভিযোগপত্র নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করে।
তাদের অভিযোগ ছিল, ডিবির তদন্তে হামলায় সরাসরি জড়িত ব্যক্তিদের চিহ্নিত করা হলেও হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী, অর্থদাতা ও রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকদের আড়ালে রাখা হয়েছে।
আরও পড়ুন: রোহিঙ্গা ইস্যুতে আন্তর্জাতিক উদ্যোগ ও জাতীয় ঐকমত্য জরুরি
পরে তাঁরা আদালতে নারাজি আবেদন করেন। এরপর মামলাটি অধিকতর তদন্তের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ—সিআইডিতে হস্তান্তর করা হয়।
বর্তমানে সিআইডি হত্যাকাণ্ডের মূল নির্দেশদাতা, অর্থের উৎস, অস্ত্র সংগ্রহ ও সরবরাহ, ডিজিটাল যোগাযোগ, রাজনৈতিক আশ্রয়দাতা, সীমান্ত পারাপার এবং ভারতে পালানোর পুরো প্রক্রিয়া খতিয়ে দেখছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রত্যর্পণে জটিলতা
ফয়সাল ও আলমগীরকে বাংলাদেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়াও জটিল হয়ে উঠেছে। তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে বন্দি প্রত্যর্পণ চুক্তি থাকলেও ভারতে তাঁদের বিরুদ্ধে পৃথক মামলা থাকায় সরাসরি প্রত্যর্পণ করা যাচ্ছে না।
ভারতে চলমান মামলার বিচারিক নিষ্পত্তি, আসামিদের পরিচয় নিশ্চিতকরণ, বাংলাদেশের পাঠানো নথির গ্রহণযোগ্যতা এবং দুই দেশের আইনে অপরাধের সামঞ্জস্য—এসব বিষয় প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়াকে দীর্ঘায়িত করছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এ ছাড়া বাংলাদেশে হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডের বিধান থাকায় ভারতে মানবাধিকার ও সম্ভাব্য সাজা নিয়েও আইনি প্রশ্ন উঠতে পারে বলে তদন্তসংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
১৮ বার পিছিয়েছে তদন্ত প্রতিবেদন
ভারত থেকে তথ্য সংগ্রহ, গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ এবং সীমান্ত পারাপার ও সহযোগীদের বিষয়ে তথ্য পেতে দেরি হওয়ায় সিআইডির তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের সময়সীমা এ পর্যন্ত ১৮ বার পিছিয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
সর্বশেষ ২০ আগস্ট প্রতিবেদন দাখিলের দিন নির্ধারিত থাকলেও ওই তারিখে প্রতিবেদন জমা পড়েনি।
ইনকিলাব মঞ্চের পক্ষ থেকে ডিসেম্বরের মধ্যে হত্যাকারীদের সর্বোচ্চ শাস্তি এবং নেপথ্যের পরিকল্পনাকারীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানানো হয়েছে। তদন্ত ও প্রত্যর্পণ প্রক্রিয়ায় দৃশ্যমান অগ্রগতি না হলে সংগঠনটি আন্দোলনে যেতে পারে বলেও প্রতিবেদনে আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে।
