বাজার দর
চিনি তেল ও আটায় উত্তাপ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
ছবি: সংগৃহীত
প্রতি সপ্তাহেই কোনো না কোনো পণ্যের দাম বাড়বেই। হয় সবজি, নয় চাল-ডাল-তেল, নয় মাংস-ডিম। মাছের দামতো সাধারণ ও নিম্নআয়ের মানুষের নাগালের বাইরে। মোট কথা স্বস্তিতে বাজার করার কোনো উপায় নেই। জীবন যে কীভাবে চলছে সেই কষ্টের কথা আর বলার মতো নয়। এভাবেই আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলেন গোপীবাগ কাঁচা বাজারের এক ক্রেতা মুজাহেরুল হক ভূঁইয়া। পেশায় সরকারি চাকরিজীবী মুজাহেরুল হক ভূঁইয়া বলেন, ভালো মুড নিয়েও যদি কেউ শুক্রবারের বাজার করতে আসেন, বাজারে ঢুকলেই মুড খারাপ হতে বাধ্য। এমন একটা সপ্তাহ পেলাম না যে সপ্তাহে জিনিসপত্রের দাম নাগালের মধ্যে পেয়েছি। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন কাঁচাবাজার ঘুরে এই ক্রেতার কথার সত্যতা পাওয়া গেছে।
গত সপ্তাহ থেকেই সবজির দাম কিছুটা কমতির দিকে দেখা যায় সেই ধারা গতকালও অব্যাহত ছিল। ডিম, মাংসের দাম আগের দামেই স্থিতিশীল ছিল। তবে অস্থিরতা বেড়েছে মুদি পণ্যের দামে। বিশেষ করে ভোজ্যতেল, চিনি, আটা, ময়দাসহ বেশকিছু পণ্যের দাম বেড়েছে। যার ফলে বাজারে গিয়ে স্বস্তি পাচ্ছেন না ক্রেতারা। দাম বাড়ার পাশাপাশি বাজারে বোতলজাত ভোজ্যতেল ও চিনির সরবরাহ কমিয়েছে কোম্পানিগুলো। অনেক দোকানে তেল ও চিনি পাওয়া যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে বাজারের সরকারের নজরদারি আরো বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা বলছেন ভোক্তারা। বেসরকারি চাকরিজীবী সাফকাত হোসেন গতকাল এই প্রতিবেদককে বলেন, বাজার পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের তেমন মাথাব্যাথা আছে বলে মনে হচ্ছে না। সরবরাহ ঠিক রাখা ও মুনাফাখোর সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্টদের তৎপরতা দেখা যাচ্ছে না। বাণিজ্য মন্ত্রনালয়কে এসব বিষয়ে আরো তৎপর হতে হবে। নজরদারি জোরদার না করলে ভোগ্যপণ্যের দাম বাড়ানোর চলমান প্রতিযোগিতা থামানো যাবে না।
অস্থির চিনি-তেল-আটার বাজার: রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে, তেল ও চিনির বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। খুচরা বাজারে বর্তমানে প্রতি কেজি চিনি ১২০ থেকে ১২৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে দাম বেড়েছে প্রায় ১০ টাকা। প্যাকেটজাত চিনিরও গায়ে লেখা সর্বোচ্চ খুচরা মূল্য ১১০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১২০ টাকা করা হয়েছে।
বিক্রেতারা বলছেন, কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ৯০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন ডিলাররা। প্যাকেটজাত চিনির দামও কেজি প্রতি ১০ টাকা বেড়েছে। তারপরও বাজারে অনেক দোকানে চিনি মিলছে না, সরবরাহ বেশ কমে গেছে। ক্রেতারা কয়েক দোকান ঘুরে তারপর প্যাকেটজাত চিনি কিনতে পারছেন।
বিক্রেতারা জানিয়েছেন, মূলত কোম্পানি (মিলগেট) ও পাইকারি পর্যায়ে চিনির দাম বাড়ায় খুচরা পর্যায়ে পণ্যটির দাম বেড়েছে। মিলগেট থেকে আগের চেয়ে চিনির সরবরাহও কমেছে।
এদিকে, বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। খোলা পাম তেলের দাম প্রতি লিটার ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা। আর সরকার নির্ধারিত বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম প্রতি লিটার ২০০ টাকা। বিক্রেতারা জানান, বাজারে ভোজ্যতেলের সরবরাহও কমেছে। যদিও খোলা সয়াবিন তেলের দাম বাড়লেও এখনো বোতলজাত তেলের দাম বাড়েনি। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, কোম্পানিগুলো দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক দোকানেই চাহিদা অনুযায়ী বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না।
বর্তমানে প্যাকেটজাত ময়দা প্রতি কেজি ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও এই ময়দা বিক্রি হয়েছে ৭০ টাকায়। অর্থাৎ কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। বাজারে দুই কেজি ময়দার প্যাকেটের গায়ে লেখা দাম এখন ১৬০ টাকা, যা ১৪০ টাকা ছিল।
সবজির দাম কিছুটা কমেছে: রাজধানীর বাজারে পেঁপে সবচেয়ে কম দামে ৩০ টাকা কেজি বিক্রি হচ্ছে। পটল, ঢেঁড়শ, কাঁকরোল, ঝিঙে, ধুন্দল ৬০ টাকা থেকে ৮০ টাকা, করলা ৭০ টাকা, শসা ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে দেশি শসার দাম তুলনামূলক বেশি, কেজি ৮০ থেকে ১০০ টাকা। বেগুন ও টমেটোর দাম এখনো বেশ চড়া। লম্বা বেগুন ১০০ টাকা, গোল বেগুন ১২০ টাকা এবং টমেটো ১২০ থেকে ১৪০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। সবচেয়ে বেশি দামের সবজির তালিকায় রয়েছে শিম। বাজারভেদে প্রতি কেজি শিম ১৮০ থেকে ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বর্তমানে সরবরাহ বাড়ায় কাঁচা মরিচ মানভেদে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। প্রতি পিস লাউ ৭০ থেকে ১২০ টাকা, চালকুমড়া ৬০ থেকে ৮০ টাকা। এছাড়া কচুর মুখি ৬০ থেকে ৮০ টাকা, লতি ৮০ টাকা, মিষ্টি কুমড়া এক ফালি ৪০ টাকা, কাঁচা কলা প্রতি হালি ৪০ থেকে ৫০ টাকা, লাল শাক ও শাপলা ফুল প্রতি আটি ২০ টাকা, লাউ শাক, পুঁই শাক ও ডাটা শাক ৩০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়েই বলছেন, আগের তুলনায় বেশ কিছু সবজির দাম এখন নাগালের মধ্যে এসেছে। ৬০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে কয়েক ধরনের সবজি পাওয়া যাচ্ছে। এতে বাজারের খরচ কিছুটা কমেছে। তবে এখনো কিছু সবজির দাম চড়া।
বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে সরবরাহ বাড়ার কারণে পটল, ঢেঁড়শ, ঝিঙে ও জালির দাম কমেছে। এসব সবজি ৬০ টাকার মধ্যেই বিক্রি করছি। বেগুন ও টমেটো পাইকারি বাজার থেকেই বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। তাই বাধ্য হয়েই বেশি দামে বিক্রি করতে হচ্ছে। ভারত থেকে কাঁচা মরিচ আমদানির সুযোগ দেয়ার পর সরবরাহ বেড়েছে। এ কারণে দামও অনেকটা কমেছে।
অন্যদিকে, কয়েক সপ্তাহ ধরে পেঁয়াজের দামে অবশ্য বড় কোনো পরিবর্তন নেই। মানভেদে প্রতি কেজি ৫৫ থেকে ৬০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আলুর দামও দীর্ঘদিন ধরে প্রায় একই রয়েছে। প্রতি কেজি আলু ৩০ থেকে ৩৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
ডিম-মুরগি-মাছের দাম আগের উচ্চমূল্যেই স্থির : সবজির বাজারে কিছুটা স্বস্তি এলেও মাছ, মাংস ও ডিমের বাজারে সেই স্বস্তির ছাপ নেই। সপ্তাহের ব্যবধানে উল্লেখযোগ্য কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। আগের উচ্চমূল্যেই স্থির আছে এসব পণ্যের দাম। রাজধানীর বাজারে ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৮০ থেকে ২০০ টাকা এবং সোনালি মুরগি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংসের বাজারেও বড় কোনো পরিবর্তন দেখা যায়নি। বর্তমানে প্রতি কেজি গরুর মাংস ৮০০ টাকা দরে আর খাসির মাংস ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বাজারে প্রতি ডজন ডিম (বাদামি) ১৫০ টাকা, সাদা ডিম ১৩০ থেকে ১৪০ টাকা, হাঁসের ডিম ২২০ থেকে ২৪০ টাকা ডজন বিক্রি হচ্ছে। কিছু পাড়া-মহল্লার খুচরা দোকানে এক ডজন ডিম ১৬০ টাকাও বিক্রি হতে দেখা গেছে।
মাছের বাজারও মোটামুটি আগের মতোই রয়েছে। তেলাপিয়া ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই-কাতল ৩৮০ থেকে ৪২০ টাকা এবং চিংড়ি ১ হাজার থেকে ১ হাজার ৩০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা এবং ট্যাংরা ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৪০০ টাকা, বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা এবং পোয়া ২৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা এবং মাঝারি আকারের রুই ৩০০ থেকে ৩৫০ টাকা কেজি দরে পাওয়া যাচ্ছে। রূপচাঁদা, শোল ও নদীর বেলে মাছ কিনতে গুনতে হচ্ছে হাজার টাকার বেশি।
মাছ বিক্রেতারা বলছেন, মাছের দাম সবসময় এক থাকে না। সরবরাহ বেশি থাকলে দাম কম থাকে, আর বাজারে মাছ কম এলে দাম বাড়ে। একইভাবে ক্রেতা বেশি হলে দাম বাড়ে। তাই সকাল আর বিকালে অনেক সময় একই মাছের দামও এক থাকে না।
স্থিতিশীল চালের বাজার: চালের বাজারে সামগ্রিক স্থিতিশীলতা দেখা গেছে। খুচরা বাজারে মিনিকেট (মোজাম্মেল) ৮৫ টাকা, মিনিকেট (রশিদ ও ফ্রেশ) ৮০ টাকা, আঠাশ ৬০ টাকা, পাইজাম ৬০ টাকা এবং মোটা চাল (গুটি-স্বর্ণা) ৫৫ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। দেশি মসুর ডাল ১৬০ থেকে ১৭০ টাকা, মোটা মসুর ডাল ১০০ থেকে ১১০ টাকা, মুগ ডাল ১৭০ টাকা।
