বহুমাত্রিক শিল্পস্রষ্টা মুস্তাফা মনোয়ার বনানীতে শায়িত
অন্তিম যাত্রায় সিক্ত হলেন শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর স্মরণে
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বহুমাত্রিক গুণের অনন্য শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ার। যার প্রয়াণে শিল্প-সাহিত্য ও সংস্কৃতির অঙ্গনে নেমে এসেছে শোকের ছায়া। বলা যায়, শোকে স্তব্ধ। তিনি কারো কাছে ছিলেন শিক্ষক, কারোর কাছে অভিভাবক, কারোর কাছে অনুপ্রেরণার উৎস। তাদের সবাই গতকাল মঙ্গলবার শামিল হয়েছিলেন তার অন্তিম যাত্রায়। গত সোমবার সকালে ৯০ বছর বয়সে প্রয়াত হন গুণী এই মানুষ। ওই দিন ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদ থেকে গোসল সেরে দুপুর ১২টায় শিল্পীকে নিজ বাসভবনে নেয়া হয়। সেখানে বিকাল পর্যন্ত মরদেহ রাখা হয়। শিল্পীর পরিবার ও শুভাকাক্সক্ষীদের শ্রদ্ধা জানানোর পর রাতে স্কয়ার হাসপাতালের হিমঘরে রাখা হয় মরদেহ। গতকাল সকাল থেকেই মুস্তাফা মনোয়ারের শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। প্রথমে রামপুরায় বাংলাদেশ টেলিভিশন (বিটিভি) প্রাঙ্গণে তার মরদেহে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয় এবং সেখানে প্রথম জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। গতকাল শেষবারের মতো কফিনবন্দি হয়ে বিটিভি প্রাঙ্গণে যান সব্যসাচী এই শিল্পী। তাকে শেষ শ্রদ্ধা জানাতে জড়ো হয়েছিলেন সহকর্মী, গুণগ্রাহীরা, ছিলেন সরকারের মন্ত্রীরাও। সকাল ৮টা ৫৫ মিনিটে মুস্তাফা মনোয়ারের মরদেহবাহী গাড়িটি বিটিভি প্রাঙ্গণে এসে পৌঁছায়। গাড়িটি পৌঁছালে সেখানে এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এরপর সকাল ৯টা ৫২ মিনিটে বিটিভি প্রাঙ্গণেই তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় উপস্থিত ছিলেন তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন, প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী, বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম, নাট্যকার ম হামিদ, চ্যানেল আইয়ের বার্তাপ্রধান শাইখ সিরাজসহ সংস্কৃতির নানা অঙ্গনের অনেকে। বিটিভি প্রাঙ্গণে জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে মুস্তফা মনোয়ারের মরদেহ নিয়ে সর্বস্তরের জনগণের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য নেয়া হয় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে। বাংলাদেশ গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশনের ব্যবস্থাপনায় এখানে শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব শুরু হয় সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নিয়াজ মাহমুদ খৈয়ামের পুষ্পস্তবক অর্পণের মধ্য দিয়ে। এরপর বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক দল ও প্রতিষ্ঠান থেকে এবং ব্যক্তিগতভাবে অনেকে শিল্পীর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদনের ফাঁকে ফাঁকে শিল্প-সংস্কৃতি ক্ষেত্রের বিশিষ্টজনেরা মুস্তাফা মনোয়ারের অবদানের প্রতি আলোকপাত করেন।
পরিবারের পক্ষে শিল্পীর ছেলে সাদাত মনোয়ার বাবার প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আসার জন্য সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানান। তিনি মরহুমের রুহের মাগফিরাত কামনা করে দোয়া করতে অনুরোধ করেন। এরপর ছায়ানট ও রবীন্দ্রসংগীত শিল্পী সংস্থার শিল্পীদের পরিবেশনায় মুস্তাফা মনোয়ারের প্রিয় গান ‘ধনধান্য পুষ্পভরা’ পরিবেশন এবং এক মিনিট নীরবতা পালনের মধ্য দিয়ে শেষ হয় শ্রদ্ধা নিবেদন পর্ব।
শোকমঞ্চ থেকে শিল্পীর মরদেহ শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে এনে আচ্ছাদিত করা হয় জাতীয় পতাকায়। রমনা অঞ্চলের সহকারী কমিশনার (এসিল্যান্ড) শেখ আবদুল্লাহ আল মামুনের নেতৃত্বে ও ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপির) উপপরিদর্শক (এসআই) খন্দকার মো. আশরাফুল ইসলামের পরিচালনায় পুলিশের একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়।
শহীদ মিনারে যেসব প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ফুলেল শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়, সেগুলোর মধ্যে ছিল- বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, ছায়ানট, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর, জাতীয় রবীন্দ্রসংগীত সম্মিলন পরিষদ, থিয়েটার, ঢাকা থিয়েটার, গ্রাম থিয়েটার ফেডারেশন, প্রাচ্যনাট, নাগরিক নাট্যাঙ্গন, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, চারণ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, উদীচী শিল্পীগোষ্ঠীর উভয় অংশ, মাল্টিমিডিয়া পাপেট থিয়েটার, চলচ্চিত্র উন্নয়ন করপোরেশন, সত্যেন সেন শিল্পী গোষ্ঠী, নজরুলসংগীত সংস্থা, নৃত্যাঞ্চল, কণ্ঠশীলন, কথা আবৃত্তি চর্চা কেন্দ্র, গণসংগীত সমন্বয় পরিষদ, ডিরেক্টরর্স গিল্ড, বাংলাদেশ নৃত্যশিল্পী সংস্থা, বাংলাদেশ ফটোগ্রাফিক সোসাইটি, স্রোত আবৃত্তি সংসদ, সংস্কৃতি বিকাশ কেন্দ্র, গ্রিন ভয়েস, চিলড্রেনস ফিল্ম সোসাইটি, বঙ্গ রঙ্গ নাট্যদল, পাঠশালা সাউথ এশিয়া মিডিয়া ইনস্টিটিউট, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র, নারায়ণগঞ্জ চারুকলা ইনস্টিটিউট, আবদুল্লাহ আল মামুন থিয়েটার স্কুল, কর্মজীবী নারী, বাংলাদেশের ওয়ার্কার্স পার্টি, বিপ্লবী কমিউনিস্ট পার্টি, গণতান্ত্রিক বাম ঐক্য, গণতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্ট, জাতীয় শিক্ষা সংস্কৃতি আন্দোলন। এই পর্ব পরিচালনা করেন মানজার চৌধুরী।
শহীদ মিনার থেকে মরদেহ নেয়া হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় মসজিদে। বাদ জোহর এখানে দ্বিতীয় জানাজার পর শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারকে শেষবারের মতো আনা হয় তার প্রথম কর্মস্থল চারুকলা অনুষদে। এখানে অনুষদ ও বিভিন্ন বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, বেঙ্গল ফাউন্ডেশন, কসমস ফাউন্ডেশন, স্টুডিও ৪৮সহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে এবং শিল্পীরা ব্যক্তিগতভাবেও শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। ফুলে ফুলে ভরে ওঠে কফিন। এরপর মরদেহ আধা ঘণ্টার জন্য নেয়া হয় তার প্রিয় কর্মস্থল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদে। দাফনের আগে তার মরদেহ নেয়া হয় চ্যানেল আই প্রাঙ্গণে। সেখানে সহকর্মী, শুভানুধ্যায়ী, সংস্কৃতিকর্মী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শেষ শ্রদ্ধা জানান। পরে দুপুর ২টা ১৫ মিনিটে তার শেষ জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজায় অভিনয়শিল্পী আবুল হায়াত, শহীদুজ্জামান সেলিম, সালাহউদ্দিন লাভলু, রাশেদ মামুন অপু, হাবিবুর রহমান খান, খোরশেদ আলম খসরুসহ চ্যানেল আই পরিবারের কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং সাংস্কৃতিক অঙ্গনের বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।
সর্বস্তরের শ্রদ্ধা নিবেদনের পর্ব শেষে বিকালে বনানী কবরস্থানে শ্বশুর তোফায়েল উদ্দিন আহমেদের কবরের পাশে তাকে সমাহিত করা হয় দেশের চিত্রকলা ও পাপেট আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ মুস্তাফা মনোয়ারকে।
স্মরণ
বরেণ্য শিল্পী ইমেরিটাস অধ্যাপক হাশেম খান বলেন, তিনি ছিলেন অত্যন্ত মেধাবী ও সৃজনশীল মানুষ। শিল্পের বিভিন্ন মাধ্যমে তার এই প্রতিভার স্ফুরণ ঘটেছিল।
বিটিভিতে অনুষ্ঠিত শিল্পীর জানাজায় অংশ নিয়ে তথ্যমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপন বলেন, দেশের সমস্ত প্রতিভাবান মানুষের তালিকা করলে প্রথম সারিতে থাকবেন মুস্তাফা মনোয়ার। আমাদের কৈশোর থেকেই আমরা তার বহুমুখী প্রতিভার সঙ্গে পরিচিত। তিনি অন্তর্গতভাবেই একজন খাঁটি শিল্পী ছিলেন। যেখানেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই তার দক্ষতা, যোগ্যতা ও মননশীলতার ছাপ রেখে গেছেন। আমাদের সৌভাগ্য যে, তার অন্তিম যাত্রার সময় দীর্ঘদিনের চেনা এই বিটিভি প্রাঙ্গণে আমরা সবাই তার জানাজায় অংশ নিতে পেরেছি। তথ্য মন্ত্রণালয় ও বিটিভি পরিবারের পক্ষ থেকে আমরা তার জান্নাত কামনা করছি।
নাট্যব্যক্তিত্ব রামেন্দু মজুমদার বলেন, তার মতো বহুমাত্রিক শিল্পস্রষ্টা দেশে আর নেই। ঐতিহ্যবাহী পাপেটকে তিনি পুনর্জন্ম দিয়েছেন। টিভি নাটককে তিনি উচ্চতর পর্যায়ে নিয়ে গিয়েছেন। বিশেষত শিশুতোষ অনুষ্ঠানে তার জুড়ি ছিল না।
মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ট্রাস্টি মফিদুল হক বলেন, শিল্পের স্পর্শে জাতির মানসকে রাঙিয়ে তোলার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অন্যতম পথিকৃৎ। সমাজকে আলোকিত করতে তিনি নিরন্তর কাজ করেছেন। দেশবাসীর মন ও মননে তার অবদান খোদিত হয়ে থাকবে।
নাট্যব্যক্তিত্ব নাসির উদ্দীন ইউসুফ বলেন, শিল্প ও সংস্কৃতিক্ষেত্রে তিনি শ্রেণিকক্ষের শিক্ষক ছিলেন না বটে; কিন্তু ছিলেন জীবনের শিক্ষক। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ইতিহাস তাকে ছাড়া অপূর্ণ থেকে যাবে।
বিশিষ্ট নাট্যকার ও অভিনয় শিল্পী মামুনুর রশীদ বলেন, শিল্পী হিসেবে তিনি বড় ছিলেন নিঃসন্দেহে; কিন্তু অনেক বড় মনের মানুষ ছিলেন তিনি। ছিলেন প্রগতিশীল চিন্তার অধিকারী। টেলিভিশনের নাটকসহ বিভিন্ন অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে মধ্যবিত্তের শিল্পরুচি উন্নত করেছিলেন তিনি। বিশিষ্ট শিল্পী মনিরুল ইসলাম বলেন, চারুকলার শিক্ষক হিসেবে তিনি খুব বেশি দিন কাজ করেননি; কিন্তু প্রথম থেকেই অত্যন্ত জনপ্রিয় শিক্ষক হয়ে উঠেছিলেন। ছাত্রদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলেছিলেন প্রথম থেকেই। শিল্পের অনেক মাধ্যমে কাজ করেছেন। পাপেটসহ বেশ কিছু ক্ষেত্রে তিনি পথিকৃতের ভূমিকা পালন করেছেন।
শিল্পী মুস্তাফা মনোয়ারের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করে শিল্পী কেরামত মওলা, তারিক আনাম খান, শহীদুজ্জামান সেলিম, সংগীতশিল্পী খায়রুল আনাম শাকিল, শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক রেজাউদ্দিন স্টালিন প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।
বিটিভিতে জানাজা শেষে স্মৃতিকাতর হয়ে পড়েন ম হামিদ। মুস্তাফা মনোয়ারের অবদান স্মরণ করে তিনি বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার কার গুরু ছিলেন না, এটা খুঁজে বের করা মুশকিল। বিশেষ করে টেলিভিশন ও শিল্প সংশ্লিষ্ট যারা আছেন, উনি সবারই শিক্ষক ছিলেন। তিনি ছিলেন আমাদের ফ্রেন্ড, ফিলোসফার অ্যান্ড গাইড। তার সঙ্গে যেমন জমিয়ে আড্ডা দেয়া যেত, তেমনি আড্ডার মধ্যেও শেখার অনেক কিছু থাকত।
বাংলাদেশ টেলিভিশনকে গড়ে তোলার পেছনে তার ভূমিকার কথা তুলে ধরে ম হামিদ আরো বলেন, এখানকার কর্মী-কর্মকর্তা যারা আছেন, প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে তার ছাত্র। বিটিভির সামগ্রিক চিত্রে তার ভূমিকা অসাধারণ। এমনকি তিনি আমার পেশাটাও বদলে দিয়েছিলেন। আমি বিসিএস অ্যাডমিন ক্যাডারের চাকরি পেয়েছিলাম। উনি আমাকে বললেন ‘ওখানে তোমার জায়গা না, তুমি টেলিভিশনে আসো।’ তার কথাতেই আমি টেলিভিশনে আসি এবং আজীবন এই পেশাটাকে আনন্দের সঙ্গে উপভোগ করেছি।
বিটিভির মহাপরিচালক মো. মাহবুবুল আলম বলেন, মুস্তাফা মনোয়ার স্যার ছিলেন আমাদের প্রেরণার উৎস। শিল্প, সাহিত্য ও সংস্কৃতির এমন কোনো অঙ্গন নেই যেখানে তার ছোঁয়া নেই। তিনি শুধু বাংলাদেশ টেলিভিশনেরই মহাপরিচালক ছিলেন না, শিল্পকলা একাডেমিসহ দেশের শিল্প-সংস্কৃতির শীর্ষ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তিনি নেতৃত্ব দিয়েছেন।
প্রসঙ্গত; দীর্ঘদিন ধরে নানা রোগে ভুগে রাজধানীর স্কয়ার হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় সোমবার সকাল সাড়ে ৮টার দিকে এই সব্যসাচী শিল্পীর মৃত্যু হয়। তিনি স্ত্রী মেরী মনোয়ার, ছেলে সাদাত মনোয়ার ও মেয়ে নন্দিনী মনোয়ারসহ অসংখ্য আত্মীয়স্বজন, গুণগ্রাহী ও শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে গেছেন।
