কঠোর ভিসানীতির পথে জাপান, অনিশ্চয়তায় বিদেশি চাকরিপ্রার্থীরা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ জুলাই ২০২৬, ১২:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
জাপানের ব্যবসা পরিচালনা ভিসার নতুন নীতিমালা প্রবাসী ব্যবসায়ীদের কপালে চিন্তার ভাঁজ ফেলেছে। নিয়মের কড়াকড়ির কারণে দেশটিতে থাকা অনেক বিদেশি উদ্যোক্তার ভবিষ্যৎ এখন অনিশ্চিত।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, নতুন এসব শর্ত সময়মতো পূরণ করতে ব্যর্থ হলে অনেককেই পাততাড়ি গুটিয়ে জাপান ছেড়ে চলে যেতে হবে।
৩৮ বছর বয়সী নেপালি নাগরিক বুধাথোকি সামঝানা টোকিওর ওকুবো এলাকায় নেপালি খাবারের একটি ছোট রেস্তোরাঁ চালান। দিনরাত এক করে নিজের পরিশ্রমে যে ব্যবসাটি তিনি দাঁড় করিয়েছিলেন, ভিসার নতুন নিয়মের মারপ্যাঁচে সেটিই এখন হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে।
তিনি বলেন, ‘আমি সবসময় জাপান ও নেপালের মধ্যে একটি সেতুবন্ধন হতে চেয়েছিলাম। কিন্তু এখন মনে হচ্ছে আমার সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে।’
জনসংখ্যা হ্রাস ও তীব্র শ্রমিক সংকটে ভুগলেও জাপানের অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে অভিবাসনবিরোধী হাওয়া বেশ প্রবল। এরই ধারাবাহিকতায়, ২০২৫ সালের শেষভাগে দেশটির ক্ষমতাসীন লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টি 'বিজনেস ম্যানেজমেন্ট' বা ব্যবসা পরিচালনা ভিসার শর্তাবলি আরো কঠিন করার সিদ্ধান্ত নেয়, যা বিদেশি উদ্যোক্তাদের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
নতুন নিয়ম অনুযায়ী, ব্যবসা পরিচালনার ভিসা পেতে ন্যূনতম মূলধনের পরিমাণ ৫০ লাখ ইয়েন থেকে বাড়িয়ে ৩ কোটি ইয়েন (প্রায় ১ লাখ ৮৫ হাজার মার্কিন ডলার) করা হয়েছে।
বুধাথোকি বলেন, এত বড় অঙ্কের মূলধন জোগাড় করা আমাদের মতো ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে অসম্ভব।
২০১৬ সালে শিক্ষার্থী হিসেবে জাপানে আসেন তিনি। কয়েক বছর সঞ্চয় করে ২০২৩ সালে প্রথম রেস্তোরাঁ চালু করেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তৃতীয় রেস্তোরাঁ খোলার পর ১০ বছর পর নিজের ১৪ বছর বয়সী মেয়েকে নেপাল থেকে জাপানে নিয়ে আসতে সক্ষম হন।
তিনি বলেন, ‘এখন সবচেয়ে বেশি চিন্তা মেয়েকে নিয়ে। সে জাপানের স্কুলে ভর্তি হয়েছে। ভিসা নবায়ন না হলে তার ভবিষ্যৎ কী হবে, সেটাই ভাবছি।’
ভারতীয় বংশোদ্ভূত আরেক ব্যবসায়ী মনীশ কুমারও একই সমস্যায় পড়েছেন। প্রায় ৩০ বছর ধরে জাপানে বসবাস করলেও সম্প্রতি তাকে জানানো হয়েছে, তার ব্যবসা পরিচালনার ভিসা নবায়ন করা হবে না।
ভিসা–সংক্রান্ত বিশেষজ্ঞদের মতে, সাম্প্রতিক সময়ে জাপানের অভিবাসন কর্তৃপক্ষ আগের তুলনায় অনেক বেশি কঠোর হয়েছে। এখন কর পরিশোধের রসিদ, সামাজিক বীমার কাগজসহ অতিরিক্ত নথি জমা দিতে হচ্ছে।
নতুন নিয়ম বাতিলের দাবিতে এরই মধ্যে ৬৭ হাজারের বেশি মানুষ একটি অনলাইন আবেদনে স্বাক্ষর করেছেন।
২০২৪ সালের মে মাসে জাপানের বিচার মন্ত্রণালয় ‘অবৈধ বিদেশি শূন্যে নামিয়ে আনা’ পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এরপর থেকেই বিদেশিদের জন্য ভিসা নীতিতে কড়াকড়ি বাড়ানো হয়।
বিশ্লেষকদের মতে, গত বছরের উচ্চকক্ষের নির্বাচনে ‘জাপানিজ-ফার্স্ট’ নীতির পক্ষে অবস্থান নেওয়া রাজনৈতিক দলের উত্থানের পর বিদেশিদের বিষয়ে সরকারের অবস্থান আরও কঠোর হয়েছে।
তবে প্রশাসনিক বিষয়ক বিশেষজ্ঞ কাজুকি ইউদা ও দাইসুকে কোমোরি মনে করেন, নতুন নীতির লক্ষ্য ভিসার অপব্যবহার রোধ করা হলেও এর সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ছে ছোট রেস্তোরাঁ মালিক, তরুণ উদ্যোক্তা এবং বৈধভাবে ব্যবসা পরিচালনা করা বিদেশিদের ওপর।
নতুন নিয়মে ব্যবসা পরিচালনার ভিসাধারীদের একজন জাপানি নাগরিক বা দীর্ঘমেয়াদি বাসিন্দাকে চাকরিতে নিয়োগ দেওয়ার শর্তও রাখা হয়েছে। কিন্তু শ্রমিক সংকটে থাকা জাপানে এই শর্ত পূরণ করাও অনেক উদ্যোক্তার জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
সূত্র: এএফপি
