মিয়ানমারে বিকট বিস্ফোরণে বাংলাদেশের সীমান্তে আতঙ্ক
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে দফায় দফায় বিকট বিস্ফোরণে বাংলাদেশ সীমান্তে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে। গত বুধবার রাত থেকে গতকাল শুক্রবারও স্থানীয় জনগণের মধ্যে চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। ঘটনার পর থেকে ওই সীমান্তে বার্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) নজরদারি জোরদার করেছে।
জানা গেছে, গত বুধবার রাত পৌনে ১০টা থেকে হঠাৎ একের পর এক বিকট বিস্ফোরণের শব্দে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সীমান্ত এলাকা কেঁপে ওঠে। চার দফা শক্তিশালী বিস্ফোরণের শব্দ শোনা যায়। এসময় আতঙ্কে টেকনাফের সীমান্তবর্তী এলাকার মানুষ ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। পরের দিন বৃহস্পতিবার সকাল এবং বিকালে আবারো রাখাইন রাজ্যের মংডু ও বুথিডং টাউনশিপে আরাকান আর্মির অবস্থান লক্ষ্য করে যুদ্ধবিমান থেকে ধারাবাহিক বিমান হামলা চালায় দেশটির সামরিক জান্তা। সীমান্তের ওপারে বিস্ফোরণের বিকট শব্দে টেকনাফের জাদিমোড়া থেকে শাহপরীর দ্বীপ পর্যন্ত বিস্তীর্ণ এলাকা বারবার প্রকম্পিত হয়।
রাখাইনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম গ্লোবাল আরাকান নেটওয়ার্ক সূত্রে জানা গেছে, গত বুধবার বুথিডং উপজেলার কিয়েত মাউক তাউং গ্রামে মিয়ানমার সেনাবাহিনী একটি যুদ্ধবিমান ও একটি ওয়াই-১২ বিমান থেকে বোমা বর্ষণ করে। এসময় টেকনাফ সীমান্তের বাসিন্দারা আতঙ্কে ঘরবাড়ি ছেড়ে নিরাপদ আশ্রয়ে আসার প্রস্তুতি নেয়।
বিজিবির রামু সেক্টর কমান্ডার লেফটেন্যান্ট কর্নেল মহিউদ্দিন আহমেদ জানিয়েছেন, রাখাইন রাজ্যে বিমান হামলা বা সশস্ত্র সংঘর্ষের ঘটনা ঘটলে এর প্রভাবে বাংলাদেশের সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এমন পরিস্থিতিতে অনেক রোহিঙ্গা নাফ নদী পেরিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশের চেষ্টা করে। ঘটনার পর থেকে রোহিঙ্গাদের সম্ভাব্য অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে। সীমান্তজুড়ে টহল ও নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নিয়েছে।
টেকনাফ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম অনীক চৌধুরী জানিয়েছেন, মিয়ানমারে গোলাগুলি হলে বাংলাদেশ সীমান্তের বাসিন্দাদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হয়। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। বাসিন্দাদের অযথা আতঙ্কিত না হয়ে সতর্ক থাকার অনুরোধ জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিজিবি-কোস্ট গার্ড সতর্ক অবস্থানে রাখা হয়েছে।
সীমান্তের বাসিন্দারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েক মাস পর আবারো সীমান্তের ওপারে রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক গোলাগুলির শব্দ শোনা গেছে। শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দা আনিছুর রহমান জানান, ওপারে গোলাগুলি হলে আমরা এখানের বাসিন্দারা আতঙ্কে থাকি। পরপর চারটি বড় ধরনের বিস্ফোরণের শব্দ শুনেছি। প্রথম বিস্ফোরণের সময় নাফ নদের ওপারে আগুন জ¦লতেও দেখা যায়। তখন মনে হয়েছিল আগুন আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে। অনেকেই ঘর ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে আসে।
এদিকে, বুধবারের বিস্ফোরণের পর কক্সবাজারের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোর বাসিন্দাদের মধ্যেও উদ্বেগ উৎকণ্ঠা দেখা দিয়েছে। তারা এখনো মিয়ানমারে থাকা স্বজনদের নিরাপত্তা নিয়ে উৎকণ্ঠায় দিন কাটাচ্ছে।
ক্যাম্পে আশ্রিত রোহিঙ্গারা বলছেন, রোহিঙ্গা স¤প্রদায়ের প্রতিনিধিদের তথ্য এবং সীমান্তবাসীর বর্ণনা অনুযায়ী, মংডু ও বুথিডংয়ে আরাকান আর্মি নিয়ন্ত্রিত বিভিন্ন অবস্থান লক্ষ্য করে সা¤প্রতিক দুই দিনে প্লেন থেকে প্রায় ৩০টি হামলা চালানো হয়েছে। এসব হামলায় কয়েকটি রোহিঙ্গা গ্রাম ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে হতাহতের খবরও পাওয়া যাচ্ছে।
উল্লেখ্য, দীর্ঘ কয়েক মাস শান্ত পরিস্থিতির পর আবারো সংঘাত তীব্র হয়ে ওঠায় সীমান্তজুড়ে নিরাপত্তা উদ্বেগ বেড়েছে। যুদ্ধের প্রভাবে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী এলাকার বাসিন্দা, জেলেদের জীবিকা, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের সম্ভাবনা ও সীমান্ত নিরাপত্তার ওপরও বড় ধরনের প্রভাব পড়ে। টানা ১১ মাস যুদ্ধের পর ২০২৩ সালের ৮ ডিসেম্বর রাখাইন রাজ্য থেকে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনীকে হটিয়ে মংডু, বুথিডং ও রাচিডং টাউনশিপসহ ৮০ শতাংশ এলাকা (২৭১ কিলোমিটার সীমান্ত) দখলে নেয় আরাকান আর্মি। দখল করা এই এলাকার বিপরীতে বাংলাদেশের টেকনাফ, উখিয়া ও বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা অবস্থিত। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর থেকে আরাকান আর্মির অবস্থানে নতুন করে হামলা শুরু করে মিয়ানমারের সরকারি বাহিনী। পাশাপাশি মিয়ানমারের তিনটি রোহিঙ্গা সশস্ত্র গোষ্ঠীর সঙ্গেও আরাকান আর্মির সংঘাত চলছে।
