চলতি মাস থেকেই মহাতাণ্ডব চালাবে শক্তিশালী ‘এল নিনো’
বাংলাদেশেও পড়বে প্রভাব; বন্যার আশঙ্কাও রয়েছে
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বিশ্বজুড়ে জলবায়ুর পরিবর্তন নিয়ে উদ্বেগের মধ্যেই আবারো আলোচনায় এসেছে ‘এল নিনো’। হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে এর উৎপত্তি হলেও এর প্রভাব বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলের মতো বাংলাদেশেও পড়তে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর কারণে দেশে তাপমাত্রা বাড়া, বৃষ্টিপাতের অনিয়ম, কৃষি উৎপাদনে বিঘ্ন এবং পানি সংকটের ঝুঁকি বাড়তে পারে।
এখন প্রশ্ন হচ্ছে ‘এল নিনো’ কী? বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রশান্ত মহাসাগরের ক্রান্তীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার প্রাকৃতিক জলবায়ু চক্র হলো ‘এল নিনো’। এল নিনো নিজে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সৃষ্টি হয় না। তবে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের সঙ্গে মিলিত হয়ে এর প্রভাব আরো তীব্র হয়ে ওঠে। ১৯৯৭-৯৮ সালের শক্তিশালী এল নিনোর পর ১৯৯৮ সাল সে সময়ের সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ড গড়েছিল। একইভাবে ২০১৫-১৬ সালের এল নিনোর পর ২০১৬ সালে নতুন রেকর্ড তৈরি হয়। ২০২৪ সাল সবচেয়ে উষ্ণ বছর হিসেবে রেকর্ডধারী। সে বছর বৈশ্বিক গড় তাপমাত্রা শিল্পবিপ্লব-পূর্ব সময়ের তুলনায় ১ দশমিক ৬ ডিগ্রি সেলসিয়াস বেশি ছিল। জলবায়ু মডেল অনুযায়ী, ২০২৭ সাল আরো উষ্ণ হতে পারে।
এল নিনো যে চলতি বছর আবারো ভয়ঙ্কর রূপে ফিরে আসবে, সেই আভাস ও শঙ্কার কথা আগেই জানিয়েছিলেন বিশেষজ্ঞরা। আশঙ্কা করা হচ্ছিল, জুলাই-আগস্টের মধ্যেই এল নিনো সক্রিয় হবে এবং এটি হতে পারে সুপার এল নিনো। সেই আশঙ্কাই সত্যি হতে যাচ্ছে। তাই এর সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দেশগুলোকে সতর্ক ও প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘের আবহাওয়া ও জলবায়ুবিষয়ক সংস্থার (ডব্লিউএমও)। গতকাল শুক্রবার সংস্থাটির প্রকাশিত মাসিক ‘ গ্লোবাল সিজনাল ক্লাইমেট আপডেট’-এ বলা হয়েছে, এল নিনো ইতোমধ্যে শুরু হয়েছে। জুলাই থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে এটি দ্রুত শক্তিশালী হবে। এর ফলে বিশ্বের বহু অঞ্চলে চরম আবহাওয়ার ঘটনা ঘটার আশঙ্কা বাড়বে। তাই সম্ভাব্য প্রভাব মোকাবিলায় দেশগুলোকে প্রস্তুত থাকার আহ্বান জানিয়েছে ডব্লিউএমও। সংস্থাটি বলছে, প্রশান্ত মহাসাগরে দ্রুত একটি শক্তিশালী ‘এল নিনো’ জলবায়ু পরিস্থিতি তৈরি হচ্ছে, যার প্রভাবে আগামী মাসগুলোতে বিশ্বজুড়ে তীব্র দাবদাহ, খরা এবং অনাবৃষ্টির মতো চরম আবহাওয়া দেখা দিতে পারে। এল নিনো হলো একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়া প্রক্রিয়া, যেখানে প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলের মধ্য ও পূর্ব অংশের সমুদ্রপৃষ্ঠের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি উষ্ণ হয়ে ওঠে। সাধারণত প্রতি দুই থেকে সাত বছর পরপর এল নিনো দেখা দেয়। এর স্থায়িত্ব থাকে প্রায় নয় থেকে ১২ মাস।
ডব্লিউএমও এল নিনোকে দুর্বল, মাঝারি, শক্তিশালী ও অতি শক্তিশালী- এই ৪টি শ্রেণিতে ভাগ করে। সাধারণত নভেম্বর থেকে ফেব্রুয়ারির মধ্যে এল নিনো সর্বোচ্চ শক্তিতে পৌঁছায়। তবে এর ফলে তাপমাত্রা বাড়ার প্রভাব পরে আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। বর্তমান পরিস্থিতিতে এটি তৃতীয় সর্বোচ্চ অর্থাৎ ‘শক্তিশালী’ পর্যায়ে পৌঁছানোর পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। সংস্থাটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, এবার সমুদ্রের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ২ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও বেশি বাড়তে পারে।
সংস্থাটি বলেছে, উত্তর গোলার্ধের শরৎকালজুড়ে এল নিনো আরো শক্তিশালী হবে। এর প্রভাব বিশ্বের বহু অঞ্চলে বিস্তৃত হবে। এছাড়া ভারতীয় উপমহাদেশ, পুরো অস্ট্রেলিয়া এবং গ্রীষ্মমণ্ডলীয় ভারত মহাসাগরের কিছু অংশে গড় বৃষ্টিপাত স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এতে এশিয়ার দেশগুলোতে শস্য উৎপাদন ও গবাদি পশুর মারাত্মক ক্ষতি হতে পারে।
ডব্লিউএমওর মহাসচিব সেলেস্তে সাউলো জানিয়েছেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে সমুদ্র ও বায়ুমণ্ডল আগে থেকেই উত্তপ্ত থাকায় এল নিনোর প্রভাব এবার আরো বেশি মারাত্মক রূপ নিতে পারে। জীবন ও জীবিকার ক্ষতি কমাতে বিশ্বজুড়ে আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা জোরদার করার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
এর আগে গত ১৬ জুন এল নিনোর ভয়ঙ্কর রূপ নিয়ে সতর্ক করে অস্ট্রেলিয়া। দেশটির আবহাওয়া ব্যুরো জানিয়েছিল, গ্রীষ্মমণ্ডলীয় প্রশান্ত মহাসাগরে ‘এল নিনো’ আবহাওয়া পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এটি বছরের দ্বিতীয়ার্ধে আরো ঘনীভূত হতে পারে এবং গত সাত দশকের মধ্যে অন্যতম শক্তিশালী এল নিনোতে রূপ নিতে পারে। ক্রান্তীয় মধ্য প্রশান্ত মহাসাগরের তাপমাত্রা বাড়া শক্তিশালী থেকে অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর ইঙ্গিত দিচ্ছে। প্রায় অর্ধেক গাণিতিক মডেল ইঙ্গিত দিচ্ছে, ১৯৫০ সালের পর থেকে রেকর্ড করা এল নিনোগুলোর মধ্যে এবারেরটি তীব্রতার দিক থেকে সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাতে পারে।
আবহাওয়াবিদরা বলছেন, এই আবহাওয়ার প্রভাবে উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকা মহাদেশে অত্যধিক বৃষ্টিপাত হতে পারে এবং এশিয়ায় প্রচণ্ড গরম ও শুষ্ক পরিস্থিতি দেখা দিতে পারে। এর প্রভাবে ইতোমধ্যে এশিয়ায় ফসল রোপণে নানা সমস্যা দেখা দিয়েছে। এতে করে খাদ্য সরবরাহের বিষয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
পরিবেশ বিজ্ঞানী ও গবেষক অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার এই পরিস্থিতিকে জলবায়ু পরিবর্তনের এক নিষ্ঠুর বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখছেন। তিনি মনে করেন, দেশের তাপমাত্রা কমাতে সাহায্য করে এমন উপাদানগুলোকে (জলাশয়, গাছপালা) ধ্বংস করে তাপমাত্রা বৃদ্ধিকারী উপাদানগুলোকে শক্তিশালী করার ফলেই এই বিপর্যয়। বাংলাদেশের উপর এল নিনোর প্রভাব পড়বে কিনা, পড়লে কতটা পড়তে পারে এ প্রসঙ্গে তিনি ভোরের কাগজকে বলেন, বাংলাদেশ এল নিনোর প্রভাবে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত দেশের মধ্যেই পড়ে। আমাদের বঙ্গোপসাগর থেকে জলীয় বাষ্পপূর্ণ বাতাস আসে। সেই বাতাসের উপর নির্ভর করে এই জুলাই মাস থেকেই সাধারণত আমাদের এখানে বৃষ্টিপাত হয়। এবং তখন বাতাসটা শীতল থাকে। কিন্তু আমরা লক্ষ্য করছি জুলাই মাসের মধ্যে মৃদু থেকে মধ্যম মানের হিটওয়েবের (দাবদাহ) মধ্যে আছে। এই ধরনের তাপমাত্রায় আমরা অভ্যস্ত নই। ইতোমধ্যেই দিনের বেলায় চলাচলে মানুষের মধ্যে ভাবনা শুরু হয়েছে যে, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর মতো আমাদের জীবনযাত্রাও শুরু করতে হবে কিনা। তাপমাত্রা বাড়ার কারণে আমাদের শরীরের উপরই প্রভাব পড়বে, বিষয়টি তা নয়। উদ্ভিদ ও প্রাণী সবার মধ্যেই পরিবর্তন হবে। আমাদের জীবনযাত্রার যে ধরন, তার উপরও প্রভাব আসবে। জুন-জুলাই-আগস্ট-সেপ্টেম্বর এই চার মাসই মূলত বৃষ্টিপাত হয়। কিন্তু আমরা দেখছি বৃষ্টি হলেও যে শীতলতা হবার কথা, তা কিন্তু হচ্ছে না। বৃষ্টি শুরুর আগেও গরম অবস্থা থাকছে এবং বৃষ্টির পরপরই গরম উত্তপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মাইক্রো পর্যায়ে বিভিন্ন ম্যাট্রোলজিক্যাল পরিবর্তন আসছে। পরিবেশ, আবহাওয়া ও জলবায়ুর মধ্যে বিভিন্ন পরিবর্তন আসছে। যেগুলো সাধারণত এল নিনো পরিস্থিতিতে হয়ে থাকে।
ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, এল নিনোর কারণে কেবল বৃষ্টি কম হয় তা নয়, বরং অকাল বন্যা বা অসময়ে ঝড়-বৃষ্টির মতো ঘটনাও মাঝেমধ্যে ঘটতে পারে, কারণ আবহাওয়া পুরোপুরি ‘আনপ্রেডিক্টেবল’ বা অনিশ্চিত হয়ে যায়। এল নিনোর পরবর্তীতে আরেকটি প্রভাব আসে। সেটিতে আমরা লা নিনা বলি। সেখানে অল্প সময়ে বেশি বৃষ্টিপাত হয়ে যায়। সে কারণে বন্যা হবার আশঙ্কা করা হয়।
এদিকে চলতি জুলাই ও আগস্ট মাসে ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা নদী অববাহিকায় বন্যা পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। দেশের উজানে ভারী বৃষ্টিপাতের কারণে এই বন্যার পূর্বাভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র (এফএফডব্লিউসি)। সংস্থাটি বলছে, বর্ষার এই সময়টিতে জলবায়ুগত কারণেই বন্যার ঝুঁকি বেশি থাকে। একই সঙ্গে চলতি মাসে বঙ্গোপসাগরে একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হলে উপকূলীয় নিম্নাঞ্চলেও আকস্মিক বন্যা দেখা দিতে পারে।
ধরিত্রী রক্ষায় আমরা (ধরা)-এর কেন্দ্রীয় সদস্যসচিব ও পরিবেশ আন্দোলনের কর্মী শরীফ জামিল সম্প্রতি জাতিসংঘের সতর্কবার্তা উল্লেখ করে বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে বিশ্বজুড়ে যে ‘এক্সট্রিম ওয়েদার প্যাটার্ন’ বা চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া তৈরি হচ্ছে, তাপপ্রবাহ এই এল নিনোরই অংশ।
তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশে দাবানল হয় না দেখে আমরা কিছুটা বেঁচে গেছি, তবে আমরা এখন ‘প্ল্যানেট অব ইমার্জেন্সি’ বা জরুরি গ্রহের মধ্যে আছি। দুর্ভাগ্যবশত, নীতিনির্ধারকেরা মানুষের এই দুর্ভোগ বা প্রকৃতির বিপদাপন্ন অবস্থা আমলে না নিয়ে ব্যবসায়িক উদ্দেশ্যে প্রকৃতি ও পরিবেশকে ব্যবহার করছেন। জীবাশ্ম জ্বালানির বিস্তার, দূষিত কলকারখানা বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক দ্বন্দ্বের কারণে পৃথিবী ধ্বংসের মুখে পড়ছে। সামনে আমাদের জন্য মহাবিপদ অপেক্ষা করছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এল নিনোর প্রভাব সব অঞ্চলে এক রকম হয় না। কোথাও খরা দেখা দেয়, আবার কোথাও অতিবৃষ্টি ও বন্যা হয়।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) গত ৯ জুন সতর্ক করে বলেছে, দক্ষিণ আফ্রিকা এবং সাহেল অঞ্চলের মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। এর আগে ২০২৩-২৪ সালের এল নিনোর সময় দক্ষিণ আফ্রিকায় এক শতাব্দীরও বেশি সময়ের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ খরা দেখা গিয়েছিল।
এফএওর মতে, সোমালিয়ায় অক্টোবর পর্যন্ত খরা চলতে পারে। এরপর ডিসেম্বর পর্যন্ত ভারী বৃষ্টিপাত হতে পারে। তবে দীর্ঘ খরার পর অতিবৃষ্টি পরিস্থিতি আরো খারাপ করতে পারে। কারণ শুকিয়ে যাওয়া মাটিতে বৃষ্টির পানি সহজে শোষিত হয় না, ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশে এল নিনোর অন্যতম দৃশ্যমান প্রভাব হতে পারে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ। স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তাপমাত্রা মানুষের দৈনন্দিন জীবন, কর্মক্ষমতা এবং জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। অতিরিক্ত গরমে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা এবং তাপজনিত বিভিন্ন রোগের ঝুঁকি বেড়ে যায়। বিশেষ করে শিশু, বয়স্ক এবং বাইরে কর্মরত শ্রমজীবী মানুষ সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে থাকেন।
আবহাওয়াবিদদের মতে, এল নিনোর সময় বর্ষা মৌসুমে বৃষ্টিপাতের স্বাভাবিক ছন্দে পরিবর্তন দেখা দিতে পারে। কোথাও স্বাভাবিকের তুলনায় কম বৃষ্টি হয়ে খরার পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে পারে, আবার কোথাও স্বল্প সময়ে অতিবৃষ্টি হয়ে জলাবদ্ধতা বা আকস্মিক বন্যার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে। ফলে কৃষি উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দেয়।
বাংলাদেশের কৃষি এখনো অনেকাংশে মৌসুমি বৃষ্টির ওপর নির্ভরশীল। বৃষ্টিপাত কম হলে আমন ধান, পাট, সবজি ও অন্য ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হতে পারে। অন্যদিকে অতিবৃষ্টি হলে জমিতে পানি জমে ফসলের ক্ষতি, রোগবালাই বেড়ে যাওয়া এবং কৃষকের আর্থিক ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ে। কৃষি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, আবহাওয়ার এই অনিশ্চয়তা দেশের খাদ্যনিরাপত্তার জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্বেগের বিষয়। পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনাতেও এল নিনোর প্রভাব পড়তে পারে। বৃষ্টিপাত কমে গেলে নদ-নদীর পানির প্রবাহ কমে যেতে পারে, ভূগর্ভস্থ পানির পুনর্ভরণ কমে যাওয়া এবং সেচের জন্য পানির সংকট দেখা দিতে পারে। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের মতো খরাপ্রবণ এলাকায় এ পরিস্থিতি আরো তীব্র হতে পারে।
জনস্বাস্থ্যও এল নিনোর প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তীব্র গরমের পাশাপাশি অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ডেঙ্গু, ডায়রিয়া ও অন্যান্য জলবাহিত রোগের বিস্তারে সহায়ক পরিবেশ তৈরি করতে পারে। স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার ওপরও অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অর্থনীতিতেও এর প্রভাব কম নয়। কৃষি উৎপাদন কমে গেলে খাদ্যপণ্যের দাম বাড়তে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়বে, সেচ ব্যয় বাড়বে এবং উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়ায় সামগ্রিক অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টি হতে পারে।
‘এল নিনো’র অর্থ কী এবং এই নাম এলো কীভাবে?
‘এল নিনো’ শব্দটি স্প্যানিশ ভাষা থেকে এসেছে। এর সহজ অর্থ হলো- ‘ছোট্ট বালক’ বা ‘শিশু পুত্র’। শিশু যিশুকে বোঝানো হয়। দক্ষিণ আমেরিকার দেশ পেরু ও ইকুয়েডরের জেলেরা সমুদ্রের এই অস্বাভাবিক পরিবর্তনের বিষয়টি শত শত বছর আগে প্রথম লক্ষ্য করেন। তারা খেয়াল করেন, কয়েক বছর পর পর বছরের শেষ দিকে অর্থাৎ ডিসেম্বর মাসের দিকে (বড়দিনের আশপাশে) সমুদ্রের পানি হঠাৎ অস্বাভাবিক গরম হয়ে ওঠে। যেহেতু এই ঘটনাটি যিশু খ্রিস্টের জন্মদিন বা বড়দিনের কাছাকাছি সময়ে ঘটত, তাই জেলেরা ভালোবেসে এই গরম পানির স্রোতটির নাম দিয়েছিলেন ‘এল নিনো’ বা ‘শিশু যিশু’।
