সেই বাঘিনীকে ৬ মাস চিকিৎসা শেষে সুন্দরবনে ছাড়া হবে আজ
বাবুল আকতার, খুলনা
প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
শিকারির ফাঁদ থেকে উদ্ধারকৃত বাঘিনী সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে সুন্দরবনের গহিনে ছেড়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। আজ রবিবার বাঘিনী তার আবাসস্থল সুন্দরবনে ফিরে যাচ্ছে। বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রণী বিশেষজ্ঞদের মতামতের ভিত্তিতে এ সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। রবিবার সকালে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে রয়েল বেঙ্গল টাইগারকে ছেড়ে দেয়া হবে। এদিকে বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার জন্য অভিজ্ঞ ও বন্যপ্রাণী চিকিৎসক, বাঘ বিশেষজ্ঞ এবং বন বিভাগের কর্মকর্তাদের সমন্বয়ে চারটি দল গঠন করা হয়েছে। অন্যদিকে বাঘিনীর গতিবিধি দেখার জন্য সুন্দরবনে ৮ কিলোমিটারজুড়ে ২০টি ক্যামেরা স্থাপন করা হচ্ছে। তবে বন্যপ্রাণীটিকে সুন্দরবনের গহিনে ছেড়ে দেয়ার বিষয়টি নিয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চলতি বছরের ৩ জানুয়ারি দুপুরে সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের শরকিরখালের অদূরে সুন্দরবনে শিকারিদের পেতে রাখা হরিণধরার ছিটকা ফাঁদে আটকে পড়ে একটি বয়স্ক বাঘিনী। গুরুতর আহত অবস্থায় বাঘিনীকে বন বিভাগের বিশেষজ্ঞ দল ৪ জানুয়ারি উদ্ধার করে। উদ্ধারকালে বাঘিনীটি ছিল নিস্তেজ, দুর্বল ও ক্ষীণকায়। সামনের বাঁ পায়ে প্রায় ৩ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ছিল। ফাঁদের রশিতে টানাটানির কারণে বাঘের ক্ষতস্থানে পচনও ধরেছিল। খুলনার
বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের পুনর্বাসন কেন্দ্রে পাঁচ সদস্যের মেডিকেল বোর্ড বাঘিনীকে চিকিৎসা ও নিবিড় পরিচর্যা করেন। দীর্ঘ ৬ মাস চিকিৎসার পর বাঘটি বর্তমানে সম্পূর্ণ সুস্থ। এ প্রাণীটির খাদ্য ও চিকিৎসায় প্রতিমাসে ২ লাখ টাকার বেশি ব্যয় হয়। বাঘিনীটিকে প্রতিদিন ৪-৫ কেজি ফ্রেশ মাংস খেতে দেয়া হতো। এই ব্যয় বহন করাও বন বিভাগের জন্য কঠিন হয়ে পড়েছে।
গত ২১ মে বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার বিষয়ে বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও প্রাণী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি জুম সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে বিশেষজ্ঞদের মধ্যে মতভেদ সৃষ্টি হয়। বিশেষজ্ঞদের একটি অংশের মত, বাঘিনীটি বয়সে প্রবীণ হওয়ায় বনে ছাড়ার পর তার গতিবিধি নজরদারিতে রাখা প্রয়োজন। সেই কারণে স্যাটেলাইট কলার কিংবা মাইক্রো চিপের মতো প্রযুক্তি ব্যবহারের প্রস্তাব দেয়া হয়। পরে বাঘিনীটিকে সুন্দরবনে ছেড়ে দেয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। ওই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী আজ (রবিবার) সকালে পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক বনাঞ্চলে বাঘটিকে ছেড়ে দেয়া হবে। সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগ বাগেরহাটের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মো. রেজাউল করীম চৌধুরী বলেন, ১২ জুলাই সকালে খুলনা থেকে নদী পথে বাঘিনীকে আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রে নেয়া হবে। ওই দিনই সুন্দরবনের আন্ধারমানিক ইকোট্যুরিজম কেন্দ্রের বনাঞ্চলে বাঘটিকে ছেড়ে দেয়া হবে বলেও জানান ডিএফও ।
বন অধিদপ্তরের বন্যপ্রাণী ও প্রকৃতি সংরক্ষণ অঞ্চলের বন সংরক্ষক ছানাউল্যা পাটওয়ারী বলেন, বাঘের জীবনকাল সর্বোচ্চ ১৫ বছর পর্যন্ত হতে পারে। এই বাঘিনীর বয়স ১০ থেকে ১১ বছর। দীর্ঘ চিকিৎসার পর প্রাণীটি হারানো ক্ষিপ্রতা ও গতি ফিরে পেয়েছে। বর্তমানে এর ওজন প্রায় ৯০ কেজি।
বন অধিদপ্তরের ভেটেরিনারি চিকিৎসক হাতেম সাজ্জাত জুলকারনাইন বলেন, বাঘিনীটি উদ্ধারকালে সামনের বাঁ পায়ে প্রায় ৩ ইঞ্চি জায়গাজুড়ে চামড়া, মাংসপেশি ও শিরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল। বিভিন্ন ক্ষতস্থানে পচন ধরেছিল। অ্যান্টিবায়োটিক ও নিয়মিত ড্রেসিংয়ের ফলে মার্চ মাসের দিকে ঘা শুকিয়ে আসে। বর্তমানে ক্ষতস্থান ভরাট হয়ে সেখানে লোমও গজিয়েছে।
বন বিভাগের খুলনা অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) ইমরান আহমেদ বলেন, সুস্থ হয়ে বাঘিনীটি আগের চেহারায় ফিরেছে। সে এখন শিকার ধরে খেতে পারবে। তিনি বলেন , বনে ছাড়ার পরে সুন্দরবনে বাঘের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য বাঘিনীটির গলায় একটি কলার পরানোর সিদ্ধান্ত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন জটিলতায় বিদেশ থেকে সেটি আনা সম্ভব হয়নি। এখন বনে ছাড়ার পরে তার গতিবিধি দেখার জন্য ক্যামেরা ট্র্যাপিং করা হবে। সে লক্ষ্যে আন্ধারমানিক বনাঞ্চলের ৮ কিলোমিটারজুড়ে ২০টি গোপন ক্যামেরা বসানোর কাজ শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালে ক্যামেরা ট্র্যাপিংয়ে বাঘিনীটিকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে তিনবার শনাক্ত করা হয়েছিল। সুন্দরবনে বাঘ ছেড়ে দেয়ার সময় বন ও পরিবেশ প্রতিমন্ত্রীসহ বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও বাঘ বিশেষজ্ঞরা উপস্থিত থাকবেন বলে জানান সিএফ ইমরান আহমেদ।
এদিকে বাঘটিকে সুন্দরবনে অবমুক্ত করার জন্য চারটি দল গঠন করা হয়েছে। এগুলো হলো- বাঘের স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য মেডিকেল দল, বাঘের মানসিক ও আচরণগত সক্ষমতা পরীক্ষার জন্য বাঘ বিশেষজ্ঞ দল, বাঘটিকে ধরা, অবমুক্তকরণের স্থানে পরিবহন ও অবমুক্ত করার জন্য একটি বিশেষায়িত দল এবং বাঘের নিরাপত্তা ও বনের পার্শ্ববর্তী জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য অবমুক্ত-পরবর্তী বাঘের গতিবিধি নজরদারির জন্য একটি পর্যবেক্ষণ দল। এই কমিটিগুলোর সদস্যরা অন্তত এক বছর ধরে বাঘ অবমুক্তকরণ এলাকার চারপাশে বাঘের গতিবিধি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করবে।
অন্যদিকে বিশেষজ্ঞদের অপর পক্ষের মতে- বাঘিনীটির জীবনকাল শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে, ফলে বন্য পরিবেশে অন্যান্য পশুর সঙ্গে লড়াইয়ে টিকে থাকার সম্ভাবনা কম। এ পরিস্থিতিতে সুস্থ হওয়ার পর প্রাণীটিকে বনে ছাড়ার বদলে কোনো সাফারি পার্কে রাখার পরামর্শ দেয়া হয়।
