এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কিনতে আগ্রহ সরকারের
হরলাল রায় সাগর
প্রকাশ: ১৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
অবশেষে ইউরোপে তৈরি এয়ারবাসের উড়োজাহাজ কেনার বিষয়েও আগ্রহ জানিয়েছে সরকার। জাতীয় পতাকাবাহী সংস্থা বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সে উড়োজাহাজের বহর বাড়াতে সরকারে নীতিগত সিদ্ধান্ত রয়েছে। বিমানের কোনো রকম মূল্যায়ন ছাড়াই কূটনৈতিক চাপে মাস পাঁচেক আগে যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি করেছে সরকার। বোয়িংয়ের উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ঘোষণার পর থেকে ইউরোপীয়দেরও চাপ বাড়ছিল। ফলে বিমানের মূল্যায়ন ছাড়া কূটনৈতিক চাপে উড়োজাহাজ কেনা হলে তা বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আগে থেকেই। যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি, স্পেন এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিরা গতকাল বুধবার সরকারের বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এবং প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাতের পর বেসামরিক বিমান চলাচল ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেশীয় স্বার্থ বজায় রেখে টেকসই মিক্সড ফ্লিট তৈরির ক্ষেত্রে এয়ারবাস ক্রয়ের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন।
গত ৩০ এপ্রিল ঢাকার একটি হোটেলে বোয়িংয়ের সঙ্গে ১৪টি উড়োজাহাজ কেনার চুক্তি স্বাক্ষর করে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্স বিমান। এসব উড়োজাহাজ কিনতে খরচ পড়বে ৩ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার বা ৪৫ হাজার ৪০৮ কোটি টাকা (১ ডলারে ১২২ টাকা ৭৩ পয়সা হিসাবে)।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমল থেকেই বিমানের জন্য উড়োজাহাজ কেনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। বিলিয়ন ডলারের এই ব্যবসা মার্কিন জায়ান্ট বোয়িং না ইউরোপীয় নির্মাতা এয়ারবাসের পাতে যাবে, সে নিয়ে তখন থেকেই একটা দর কষাকষি চলছিল। আওয়ামী লীগ সরকার শেষ দিকে এসে এয়ারবাসের পক্ষে ঝুঁকেছিল। এয়ারবাসের কাছ থেকে ১০টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত করার কথা জানিয়েছিলেন তখনকার বিমানমন্ত্রী মাহাবুব আলী। তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পালাবদলের পর পাশার দান উল্টে যায়। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আমেরিকার সিয়াটলের বোয়িংয়ের কাছ থেকে উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত দেয়।
গত ফেব্রুয়ারিতে ক্ষমতায় আসা বিএনপি সরকারও সিয়াটলের পথেই হেঁটেছে। দায়িত্ব নেয়ার দুই মাসের মাথায় বোয়িংয়ের কাছ থেকে ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার চুক্তি করেছে সরকার। তবে সেই চুক্তির পরেও এয়ারবাসের কর্মকর্তারা দৃশ্যত হাল ছেড়ে দেননি। এয়ারবাসের কর্মকর্তারা সরকারের উচ্চপর্যায়ে দৌড়ঝাঁপ অব্যাহত রাখেন। সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর রাষ্ট্রদূতরাও যোগাযোগ চালিয়ে যান। জুন মাসেই জানা গিয়েছিল এয়ারবাস কিনতে সরকার ইতিবাচক।
সেই ধারাবাহিকতায় বুধবার দুপুরে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম এবং প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাতের সঙ্গে মন্ত্রণালয়ের সম্মেলন কক্ষে সাক্ষাৎ করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত ফ্রান্সের রাষ্ট্রদূত জ্যঁ সার্ক সেরে শার্লে, যুক্তরাজ্যের রাষ্ট্রদূত সারাহ কুক, স্পেনের রাষ্ট্রদূত গ্যাব্রিয়েল সিস্তিয়াগা, জার্মান দূতাবাসের চার্জ দ্যা অ্যাফেয়ার্স আনজা টারস্টেন এবং ইউরোপিয়ান ইউনিয়ন মিশনের ডেপুটি মিশন চিফ বাইবা জেরিন।
মন্ত্রণালয়ের পাঠানো সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাক্ষাতে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের বহর স¤প্রসারণের অংশ হিসেবে এয়ারবাস যুক্তকরণ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। এসময় মন্ত্রী ও প্রতিমন্ত্রী দেশীয় স্বার্থ বজায় রেখে টেকসই মিক্সড ফ্লিট তৈরির ক্ষেত্রে এয়ারবাস ক্রয়ের বিষয়ে আগ্রহ প্রকাশ করেন। জবাবে প্রতিনিধিরা প্রয়োজনীয় সব ধরনের সহযোগিতা প্রদানের প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সাক্ষাতে বাংলাদেশ ও ইউরোপিয়ান ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোর মধ্যকার বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ককে আরো সুদৃঢ়, গতিশীল ও বহুমাত্রিকভাবে স¤প্রসারণের বিষয়ে উভয় পক্ষ গুরুত্বারোপ করেন। পারস্পরিক সহযোগিতা বাড়ানো, বিশেষ করে বেসামরিক বিমান চলাচল খাতের উন্নয়ন নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়।
মাক্রোঁ থেকে ট্রাম্প : ২০২৩ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা সফরে এসে ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে বলেছিলেন, বাংলাদেশ ফ্রান্সের বিমান নির্মাতা কোম্পানি এয়ারবাস থেকে ১০টি বড় উড়োজাহাজ কেনার প্রতিশ্রæতি দিয়েছে।
বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় ১০টি এয়ারবাস কেনার নীতিগত সিদ্ধান্ত জানানো হয়েছিল। কিন্তু কোটাবিরোধী আন্দোলনে শেখ হাসিনা সরকারের পতন আর ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুল্কের চাপে পাল্টে যায় সিদ্ধান্ত।
ট্রাম্পের ৩৫ শতাংশ শুল্ক আরোপের মধ্যে গত বছরের জুলাইয়ে বোয়িংয়ের কাছ থেকে ২৫টি উড়োজাহাজ কেনার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করে মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকার। সেই ধারাবাহিকতায় শেষ পর্যন্ত ১৪টি এয়ারক্রাফট কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়।
এদিকে বোয়িংয়ের ব্যাগে চূড়ান্তভাবে ক্রয়াদেশ যাওয়ার আগেই ইউরোপীয়রা সক্রিয় হয়ে ওঠে। গত বছরের ৪ নভেম্বর ফ্রান্স দূতাবাসে যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, জার্মানি এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূতরা একযোগে সংবাদ সম্মেলনে অংশ নেন। তারা ইউরোপের সঙ্গে বাংলাদেশের পুরনো বাণিজ্য সম্পর্ক, যুক্তরাজ্যের বাজারে শুল্কমুক্ত প্রবেশাধিকার, এলডিসি থেকে উত্তরণ ইত্যাদি নানা বিষয় মনে করিয়ে দেন।
শেষ পর্যন্ত তাদের ক্ষেত্রেও ইতিবাচক মনোভাব দেখাতে শুরু করেছে সরকার। তবে যাদের জন্য উড়োজাহাজগুলো কেনা হবে, সেই বিমানের মূল্যায়ন নেয়া হয়নি। বোয়িং কিংবা এয়ারবাস- কোনো এয়ারলাইান্সের এয়ারক্রাফট কেনার বিষয়ে বিমানের কোনো মূল্যানের তোয়াক্কা করা হয়নি। এই মূল্যায়ন ছাড়া কূটনৈতিক চাপে উড়োজাহাজ কেনা হলে তা বাণিজ্যিকভাবে কতটা সফল হবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠছে আগে থেকেই।
বিমানের বহরে এখন ১৯টি উড়োজাহাজের মধ্যে ১৪টিই বোয়িং। আর পাঁচটি স্বল্প দূরত্বে চলাচল উপযোগী ড্যাশ ৮-৪০০ সিরিজের উড়োজাহাজ। এখন মিশ্র বহর বিমান কী করে সামলাবে, সেই পরিকল্পনার বিষয়েও বিস্তারিত কিছু জানানো হয়নি।
