আইসিইউতে এএমআর ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকি
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের হাসপাতালগুলোর আইসিইউতে (নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র) ছড়িয়ে পড়ছে সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধপ্রতিরোধী (ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট/এএমআর) ব্যাকটেরিয়া।
আইসিডিডিআরবি’র সা¤প্রতিক দুটি গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব রোগী হাসপাতালে ভর্তির সময় এই ধরনের ওষুধপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি আইসিইউতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় এগুলোতে আক্রান্ত বা সংক্রমিত হয়েছেন। এই সংক্রমণে আক্রান্ত রোগীদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল অত্যন্ত বেশি। গবেষকরা বলছেন, হাসপাতালে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করে এই মৃত্যু ও মারাত্মক সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। গতকাল শনিবার গণমাধ্যমে পাঠানো আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র, বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়, আইসিডিডিআরবি’র গবেষকদের নেতৃত্বে পরিচালিত এই গবেষণা দুটি আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী ‘মাইক্রোবায়োলজি স্পেকট্রাম’ এবং ‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত হয়েছে। ঢাকার একটি বিশেষায়িত সরকারি হাসপাতালের আইসিইউতে ২০২৩ সালের জুলাই থেকে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ভর্তি হওয়া ৩৭৩ জন গুরুতর অসুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক রোগী এবং একই হাসপাতালের নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (এনআইসিইউ) ২০২৩ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ভর্তি থাকা ৩৬৩ জন নবজাতকের তথ্য বিশ্লেষণ করে এই গবেষণা প্রবন্ধ দুইটি প্রকাশিত হয়।
আইসিডিডিআরবি’র সহকারী বিজ্ঞানী এবং সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার উচ্চ ঝুঁকি সংক্রান্ত গবেষণার প্রধান লেখক ড. গাজী মো. সালাহউদ্দীন মামুন বলেন, আমরা আইসিইউতে অবস্থানকালীন পুরো সময়জুড়ে রোগীদের পর্যবেক্ষণ করেছি এবং ল্যাবরেটরি পরীক্ষা ও জিনোম সিকোয়েন্সিং করে দেখেছি যে কীভাবে হাসপাতালে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ছড়িয়ে পড়ে এবং কীভাবে শরীরে সুপ্ত থাকা ব্যাকটেরিয়া পরবর্তীতে সংক্রমণে রূপ নেয়। এর মাধ্যমে রোগীর বহন করা ব্যাকটেরিয়া (কলোনাইজেশন) এবং পরবর্তীতে হওয়া প্রাণঘাতী সংক্রমণের মধ্যকার সম্পর্কগুলো চিহ্নিত করা সম্ভব হয়েছে।
ইউএস সেন্টারস ফর ডিজিজ কন্ট্রোল অ্যান্ড প্রিভেনশন (সিডিসি)-র অর্থায়নে পরিচালিত এই গবেষণাটি মূলত ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার ওপর আলোকপাত করেছে। এটি এমন একজাতীয় ব্যাকটেরিয়া যা বহুল ব্যবহৃত অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধী, যার দ্বারা সংক্রমিত হলে চিকিৎসা করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া বিশেষ করে সংকটাপন্ন রোগীদের ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মূত্রনালীর সংক্রমণ এবং ক্ষতের সংক্রমণের মতো গুরুতর রোগের কারণ হতে পারে।
আইসিডিডিআরবি’র পূর্ববর্তী একটি গবেষণায় হাসপাতাল ও কমিউনিটি পর্যায়ে, এমনকি নবজাতকদের মধ্যেও ওষুধ-প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়া গিয়েছিল। বর্তমান গবেষণা ২টি আইসিইউতে কীভাবে এসব ব্যাকটেরিয়া ছড়ায় এবং কীভাবে উন্নত সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ ও মৃত্যু কমানো যায়, সে বিষয়ে নতুন তথ্য যোগ করেছে।
গবেষকরা হাসপাতালে সংক্রমণকারী প্রধান চারটি গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়া পরীক্ষা করেছেন: ইশেরিশিয়া কোলাই, ক্লেবসিয়েলা নিউমোনি, অ্যাসিনেটোব্যাক্টার বাউমানি এবং সিউডোমোনাস অ্যারুজিনোসা।
গবেষণায় দেখা গেছে, আইসিইউর প্রায় অর্ধেক রোগীর (৪৮ দশমিক ৫ শতাংশ) অন্ত্রে ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট রেজিস্ট্যান্ট গ্রাম-নেগেটিভ ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি ছিল। শরীরে রোগ না ছড়িয়ে ব্যাকটেরিয়ার উপস্থিতি থাকাকে কলোনাইজেশন বলা হয়, যদিও এসব বহনকারী রোগীদের নিজের অসুস্থ হওয়ার এবং স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে তা ছড়ানোর ঝুঁকি থেকে যায়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, শুরুতে এসব প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত থাকা ১৯৮ জন রোগীর মধ্যে ১০৫ জনই (৫৩ শতাংশ) আইসিইউতে অবস্থানকালে সংক্রমিত হন, যা হাসপাতালে এই ব্যাকটেরিয়ার ব্যাপক বিস্তারের ইঙ্গিত দেয়।
যাদের শরীরে এই ডিফিকাল্ট-টু-ট্রিট ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ কালচার পরীক্ষার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া গেছে, তাদের মধ্যে মৃত্যুর হার ছিল আশঙ্কাজনকভাবে বেশি। আইসিইউতে এই সংক্রমণে আক্রান্ত ৯০ শতাংশেরও বেশি রোগী মারা গেছেন।
গবেষকদের মতে, এই গবেষণায় পর্যবেক্ষিত অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ মৃত্যুহারের একটি কারণ হতে পারে সীমিত সুবিধার আইসিইউ সেবার নানা সীমাবদ্ধতা। সীমিত চিকিৎসাসুবিধা, অতিরিক্ত রোগীর চাপে হাসপাতাল-সংশ্লিষ্ট সংক্রমণের (নোসোকোমিয়াল ইনফেকশন) ঝুঁকি বাড়ায় এবং এ ধরনের অন্যান্য চ্যালেঞ্জ মৃত্যুহার বাড়াতে ভূমিকা রাখতে পারে। হোল-জিনোম সিকোয়েন্সিং প্রযুক্তি ব্যবহার করে গবেষকরা দেখেছেন, কিছু রোগীর শরীরে যে ব্যাকটেরিয়া শুরুতে কেবল নীরব বা সুপ্ত অবস্থায় অবস্থান করছিল, পরবর্তীতে সেটিই চূড়ান্ত সংক্রমণের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর থেকে স্পষ্ট হয় যে, শরীরে নীরবে বহন করা এসব ব্যাকটেরিয়া পর্যায়ক্রমে মারাত্মক প্রাণঘাতী রোগে রূপ নিতে পারে।
আইসিডিডিআরবি’র এএমআর রিচার্স ইউনিটের প্রধান এবং এই গবেষণার প্রধান গবেষক (পিআই) ড. ফাহমিদা চৌধুরী বলেন, হাসপাতাল হওয়া উচিত আরোগ্যের স্থান, চিকিৎসা নিতে এসে অন্য একটি প্রাণঘাতী সংক্রমণে আক্রান্ত হওয়ার জায়গা নয়। যেসব রোগী শুরুতে এসব সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ামুক্ত ছিলেন, তাদের অর্ধেকেরও বেশি রোগীর অন্ত্রে আইসিইউতে অবস্থানকালে পরবর্তীতে এসব মারাত্মক জীবাণু পাওয়া গিয়েছে- যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। সংকটাপন্ন রোগীদের আরও ভালোভাবে সুরক্ষিত রাখতে সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার জোরদার করা অপরিহার্য।
এই গবেষণাটি বাংলাদেশের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা-প্রতিরোধী ড্রাগ-রেজিস্ট্যান্ট ব্যাকটেরিয়ার চ্যালেঞ্জের ব্যাপ্তি তুলে ধরলেও, একই গবেষণা দলের দ্বিতীয় একটি গবেষণা প্রমাণ করে যে হাসপাতালগুলো শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মাধ্যমে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমাতে পারে।
‘অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স অ্যান্ড ইনফেকশন কন্ট্রোল’-এ প্রকাশিত এই গবেষণায় ঢাকার একটি এনআইসিইউতে টার্গেটেড বা সুনির্দিষ্ট সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ কর্মসূচির মূল্যায়ন করা হয়। গবেষকরা বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুযায়ী স্বাস্থ্যকর্মী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীদের হাত পরিষ্কার রাখা, পরিবেশগত পরিচ্ছন্নতা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং সংক্রমণ প্রতিরোধ ব্যবস্থার ওপর প্রাথমিক ও প্রতি মাসে প্রশিক্ষণ প্রদান করেন এবং একই সঙ্গে নির্দেশিকা মেনে চলার হার, রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ, মৃত্যুহার এবং কার্বাপেনেম-রেজিস্ট্যান্ট অর্গানিজমের কোলোনাইজেশন পর্যবেক্ষণ করেন।
৭ মাস কর্মসূচির পর, এনআইসিইউতে প্রতি ১০০ জন ভর্তি রোগীর ক্ষেত্রে রক্তপ্রবাহের সংক্রমণ ২৮ জন থেকে কমে ৪ জনে নেমে আসে (যা ৮৬ শতাংশ কমে), অন্যদিকে মৃত্যুহার প্রতি ১০০ জন ভর্তিতে ২৬ থেকে কমে ৪ জনে নেমে এসেছে। এটি নির্দেশ করে যে, যেখানে প্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়া ব্যাপকভাবে ছড়াচ্ছে সেখানেও শক্তিশালী সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা এসব জীবাণুকে প্রাণঘাতী সংক্রমণে রূপ নিতে বাধা দিতে পারে।
আইসিডিডিআরবি’র নির্বাহী পরিচালক ড. তাহমিদ আহমেদ বলেন, এই গবেষণা দুটি একটি উদ্বেগজনক বাস্তবতাকে প্রকাশ করেছে, আমাদের হাসপাতালগুলোতে চিকিৎসা গ্রহণকালে রোগীরা সহজে চিকিৎসা করা যায় না এমন ওষুধপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ায় আক্রান্ত হচ্ছেন এবং এর পরিণতি হতে পারে ভয়াবহ। একই সময়ে গবেষণা দেখায় যে মৌলিক সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা জোরদার করলে সংক্রমণ ও মৃত্যু বহুগুণ কমানো সম্ভব। আমরা যদি রোগীদের রক্ষা করতে এবং অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা করতে চাই, তবে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও নীতি নির্ধারকদের অবশ্যই সংক্রমণ প্রতিরোধ, হাসপাতালের পরিচ্ছন্নতা, নজরদারি এবং দায়িত্বশীল অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহারকে রোগীর সুরক্ষার মূল অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, এই গবেষণা দুটি বাংলাদেশের পাশাপাশি সীমিত সম্পদের অন্যান্য দেশের স্বাস্থ্যসেবা খাতের জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা দেয়। হাসপাতালে ওষুধপ্রতিরোধী ব্যাকটেরিয়ার বিস্তার এবং রোগীদের চরম ঝুঁকির মুখে ফেলার এই চিত্রে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলো কিন্তু একেবারেই অসহায় নয়। হাত ধোয়া বা পরিচ্ছন্নতা, চারপাশের সার্বিক জীবাণুমুক্তকরণ, অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিক ও দায়িত্বশীল ব্যবহার, নিয়মিত নজরদারি এবং নিরাপদ রোগী সেবার মতো সংক্রমণ প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণমূলক পদক্ষেপগুলো জোরদার করতে পারলে সংক্রমণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমিয়ে আনা সম্ভব। গবেষণার এসব তথ্য জোরালোভাবে তুলে ধরে যে অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স মোকাবিলা ও ঝুঁকিপূর্ণ রোগীদের সুরক্ষায় সংক্রমণ প্রতিরোধ এবং নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় বিনিয়োগই অন্যতম কার্যকর কৌশল।
