আতঙ্কের জনপদ মহাখালীর স্বাস্থ্যপল্লী
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১১ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
দেশের জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার মূল স্নায়ুকেন্দ্র ঢাকার মহাখালী ‘স্বাস্থ্যপল্লী’ এখন চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতার জনপদে পরিণত হয়েছে। দেশের শীর্ষ চিকিৎসা ও গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বিশেষায়িত হাসপাতাল এবং স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের প্রধান প্রশাসনিক কার্যালয়গুলো যেখানে অবস্থিত, সেখানেই এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে উগ্রবাদী গোষ্ঠী ও সন্ত্রাসী চক্র। হাসপাতালের টেন্ডার, আউটসোর্সিং নিয়োগ এবং অবৈধ প্রভাব বিস্তারকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক কর্মকর্তা, চিকিৎসক ও কর্মীদের ওপর হামলা, কুপিয়ে জখম, এমনকি প্রাণনাশের হুমকি দেয়ার ঘটনাও নিয়মিত চিত্রে পরিণত হয়েছে।
হুমকি, হামলা ও ক্যাডারদের তাণ্ডব : সম্প্রতি ২০২৬ সালের মে মাসে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (প্রশাসন) অধ্যাপক ডা. মো. জাহিদ রায়হানকে প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে চিঠি পাঠানো হয়। এর আগে সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে একটি টেন্ডারকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সাততলা বস্তিভিত্তিক এক উগ্রবাদী গোষ্ঠী (যারা নিজেদের ক্ষমতাসীন দলের কর্মী হিসেবে পরিচয় দেয়) এক নারী চিকিৎসককে অবরুদ্ধ করে রাখে। এছাড়া একই প্রতিষ্ঠানের এক ঠিকাদারকে মারধর করা এবং স্বাস্থ্যমন্ত্রীর সঙ্গেও অশালীন ও অশোভন আচরণ করার অভিযোগ ওঠে ওই চক্রটির বিরুদ্ধে। এর আগে ২০২৫ সালে জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটে কোটেশনের মাধ্যমে কাজ পেতে সেখানকার প্রধান সহকারীকে পিটিয়ে মারাত্মক আহত করে এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা তুহিনকে কুপিয়ে জখম করে। পরে তাকে নিউরো সায়েন্স হাসপাতালে বদলি করা হয়। সম্প্রতি সংক্রামক ব্যধি হাসপাতালের ক্রয় কমিটির সদস্য ডা. তানজিন আরাকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ এসে তাকে উদ্ধার করে।
ক্যাডার ও সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভয়ভীতি থেকে বাদ যাননি শীর্ষ চিকিৎসকরাও। রাজধানীর জাতীয় অর্থোপেডিক হাসপাতাল ও পুনর্বাসন প্রতিষ্ঠানের (পঙ্গু হাসপাতাল) সহকারী পরিচালক ডা. রাশেদের কক্ষে ঢুকে আউটসোর্সিং নিয়োগে নিজস্ব লোক নেয়ার জন্য অস্ত্রের মুখে হুমকি দেয় একদল যুবক।
চিকিৎসকদের ওপর রক্তক্ষয়ী হামলা : মহাখালীর হাসপাতালকেন্দ্রিক অপরাধ চক্রের সহিংসতা এখন কুপিয়ে জখম করার পর্যায়ে পৌঁছেছে। গত ২০ এপ্রিল সোমবার অফিস শেষে বাড়ি ফেরার পথে বনানীতে জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনের ওপর ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালায় সন্ত্রাসীরা। তার হাত ও পিঠে গুরুতর জখম করা হয়। পরবর্তীতে র্যাব-১ ও গোয়েন্দা শাখার অভিযানে দক্ষিণখান, বাড্ডা ও গুলশান থেকে শরিফুল আলম করিম, আমিনুল ইসলাম কালু, সাজ্জাদ বদি, সালাউদ্দিন ও আরিফুজ্জামান নামে ৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। র্যাব জানায়, মালয়েশিয়ায় অবস্থানরত রুবেল নামে এক ব্যক্তির নির্দেশে ‘রুবেলের ইএমই ট্রেডার্স’ ও ‘মোনায়েম গ্রুপ’-এর
মধ্যে ক্যানসার হাসপাতালের টেন্ডারসংক্রান্ত দ্ব›েদ্বর জেরে মাত্র ২০ হাজার টাকায় ভাড়াটে সন্ত্রাসী দিয়ে এই হামলা চালানো হয়।
তবে মহাখালীর বিভিন্ন স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং কয়েকজন ঠিকাদার নিশ্চিত করেছেন, রুবেল দেশেই আছেন এবং মহাখালীতেই অবস্থান করছেন। তিনি শৈশব থেকেই এই এলাকায় বেড়ে উঠেছেন, বক্ষব্যাধি হাসপাতালের চতুর্থ শ্রেণির এক কর্মচারীর সন্তান রুবেল কিশোর বয়স থেকেই বিভিন্ন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়েন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ক্যানসার হাসপাতালের একজন কর্মকর্তা বলেন, জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালের উপপরিচালক ডা. আহমদ হোসেনের ওপর হামলার আগে হাসপাতালে তার কক্ষে ঢুকে হুমকি দেয়া হয়। এছাড়া আরো বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে ছোট ও মাঝারি ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটেছে ও ঘটছে, যে ঘটনাগুলোর খবর বাইরে আসছে না। মহাখালীতে একের পর এক এ ধরনের ঘটনা ঘটায় প্রায় প্রত্যেকটি স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে এক ধরনের চাপা আতঙ্ক বিরাজ করছে।
গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের কর্মীকে ছুরিকাঘাত : গত সোমবার (২০ জুলাই) বিকালে মহাখালী গাউসুল আজম মসজিদের বিপরীতে ওয়াসা অফিসের সামনে জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের ডাটা এন্ট্রি অপারেটর সুদীপ চন্দ্র দে-কে মোটরবাইকে বাড়ি ফেরার পথে পিঠে ছুরিকাঘাত করে দুর্বৃত্তরা। এর পেছনেও টেন্ডার নিয়ন্ত্রণ।
সংকট ও প্রশাসনিক প্রতিক্রিয়া : মহাখালী স্বাস্থ্যপল্লীতে যেখানে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্বাস্থ্য শিক্ষা অধিদপ্তর, নিপসম, ওষুধ প্রশাসন, আইইডিসিআর, বিএমআরসি, আইসিডিডিআর, বি-সহ ৪টিরও বেশি প্রধান বিশেষায়িত হাসপাতাল অবস্থিত সেখানে একের পর এক সহিংসতায় চরম ক্ষোভ ও আতঙ্কের সৃষ্টি হয়েছে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে। অন্যদিকে, দেশের হাসপাতালগুলোর অবকাঠামোগত ও সেবামূলক ঘাটতিও পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলছে। গত ১৬ মার্চ মধ্যরাতে মহাখালীর সংক্রামক ব্যাধি হাসপাতালে হামে আক্রান্ত এক শিশুর মৃত্যুর পর স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন হাসপাতালটি আকস্মিক পরিদর্শন করেন এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্র (আইসিইউ) চালুর নির্দেশ দেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের স্বাস্থ্যসেবার মূল চালিকাশক্তি মহাখালী স্বাস্থ্যপল্লীতে চিকিৎসকদের ওপর হামলা ও প্রশাসনিক কাজ ব্যাহত করার মতো ঘটনায় চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীরা তীব্র নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, টেন্ডারবাজি, আউটসোর্সিং নিয়োগে রাজনৈতিক চাপ এবং সন্ত্রাসী চক্রের দৌরাত্ম্য এখনই কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে দেশের সার্বিক চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ার চরম ঝুঁকিতে পড়বে।
এ প্রসঙ্গে বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মোহাম্মদ ফরিদুল ইসলাম বলেন, ক্যানসার হাসপাতলের উপপরিচালকের ওপরে হামলার ঘটনায় মূল আসামিসহ সবাইকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। অন্যদিকে গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালের কম্পিউটার অপারেটর এর ওপর হামলার ঘটনায় সন্দেহভাজন দুজনকে গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেয়া হয়েছে। আশা করছি তাদের থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে প্রকৃত দোষীদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হবে।
সামগ্রিক বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. প্রভাত কুমার বিশ্বাস বলেন, স্বাস্থ্য প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডের যে বিষয়গুলো আমাদের নজরে এসেছে সেগুলো আমরা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর মাধ্যমে ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিয়েছি, পাশাপাশি ফলোআপ করছি। যাতে পরবর্তীতে এ ধরনের ঘটনা না ঘটে।
