সেমিনারে বক্তারা
জীবন-পরিক্রমায় পরিবেশকে ভাবনায় রাখতেন রবীন্দ্রনাথ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
রবীন্দ্রনাথ মানুষ থেকে উদ্ভিদ সবার জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে গেছেন তার কবিতা থেকে চিঠি, গল্প থেকে গান, উপন্যাস থেকে নাটক, প্রবন্ধ থেকে অভিভাষণ- সর্বত্র। পরিবেশচিন্তা তার কাছে কোনো আলাদা বর্গের ভাবনা নয় বরং তার গোটা সৃজনশীল অস্তিত্বেরই অনিবার্য অংশ। রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক নন, একই সঙ্গে বিশ্বমানের একজন পরিবেশ-ভাবুকও বটে। তিনি তার জীবন-পরিক্রমায় পরিবেশকে সবসময় ভাবনাবিন্দুর কেন্দ্রে রেখেছেন, তার পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেছেন পরিবেশ সচেতন হতে। একের পর এক রচনায় তিনি পরিবেশের বিপর্যয়ের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন, পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে সম্পাদিত উন্নয়নকর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন।
‘রবীন্দ্রনাথের পরিবেশচিন্তা’ শীর্ষক সেমিনারে বক্তারা এসব কথা বলেন। গতকাল বুধবার বিকালে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ৮৫তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে বাংলা একাডেমি এই
সেমিনারের আয়োজন করে। একাডেমির কবি শামসুর রাহমান সেমিনার কক্ষে সেমিনার ছাড়াও অনুষ্ঠিত হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সেমিনারে অনুষ্ঠানে সূচনা বক্তব্য রাখেন বাংলা একাডেমির পরিচালক ও সচিব (অতিরিক্ত দায়িত্ব) সমীর কুমার সরকার। ‘রবীন্দ্রনাথের পরিবেশচিন্তা’ শীর্ষক প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন লেখক ও গবেষক পাভেল পার্থ। আলোচনায় অংশ নেন বাংলা একাডেমির মহাপরিচালক অধ্যাপক মোহাম্মদ আজম এবং লেখক ও সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ। সভাপ্রধানের দায়িত্ব পালন করেন পানিসম্পদ ও জলবায়ু বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন বাংলা একাডেমির উপপরিচালক কাজী রুমানা আহমেদ সোমা।
পাভেল পার্থ বলেন, ভূমি-জলধারা-অরণ্য কি প্রাণ ও প্রকৃতির উপর নিরবচ্ছিন্ন অন্যায় ভোগদখল ও পণ্যকরণের উপরই টিকে আছে চলতি দুনিয়ার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা ও নয়া-উদারবাদী অর্থনৈতিক উন্নয়ন। আর প্রাণ ও প্রকৃতিবিনাশী এই অন্যায় উন্নয়নধারার সাফাই গাওয়ার উপরই নির্ভর করে গরিব জাতিরাষ্ট্রসমূহের সার্বভৌম অস্তিত্ব ও রাজনৈতিক পালাবদল। সামগ্রিক উন্নয়ন প্রক্রিয়ায় শুধু মানুষকে ঘিরেই, আরো স্পষ্ট করে বলতে গেলে ধনী ও ক্ষমতাবানদের স্বার্থেই। এখানে অন্যায়ভাবে বাদ থাকছে সমাজে বিদ্যমান অপরাপর ঐতিহাসিক শ্রেণি সম্পর্ক ও পরিচয়গুলো। তলিয়ে যায় বৃক্ষলতা, গুল্ম, মাছ, পাখি, পতঙ্গ, বাঘ বা শামুকের সংসার। পরিবেশপ্রশ্ন বা সামগ্রিক উন্নয়নচিন্তায় কেবলমাত্র একতরফাভাবে মানুষকেন্দ্রিকতাকে পরিহার করা জরুরি। সমাজ, ভূগোল ও বিশ্বনিখিলে বিকশিত সমুদয় প্রাণসাত্তার কথাই বিবেচনা করতে হবে। রবীন্দ্রনাথ যাকে বলেছেন ‘সহজপাঠ’। আর এটিই সহজভাবে বলতে গেলে রবীন্দ্রনাথের পরিবেশচিন্তা। কেবলমাত্র মানুষ নয়, মৌমাছি কী তরুলতা বা নদীর চোখে জীবনকে দেখতে শেখা। সকলের অস্তিত্ব ও বিকাশকে মান্য করা, সহযোগিতা করা। মূলত তার আহ্বান আমরা যেন আমাদের চারধার থেকে জানতে শিখি, চারধারকে আমাদের মরমে ধারণ করতে সাহস করি। আর এটিই রবীন্দ্রনাথের পরিবেশ-বীক্ষা।
আইনুন নিশাত বলেন, রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক নন, একই সঙ্গে বিশ্বমানের একজন পরিবেশ-ভাবুকও বটে। তিনি তার জীবন-পরিক্রমায় পরিবেশকে সবসময় ভাবনাবিন্দুর কেন্দ্রে রেখেছেন, তার পাঠককে উদ্বুদ্ধ করেছেন পরিবেশসচেতন হতে। একের পর এক রচনায় তিনি পরিবেশের বিপর্যয়ের বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে বলেছেন, পরিবেশের ক্ষতি সাধন করে সম্পাদিত উন্নয়নকর্মকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছেন। তার পরিবেশচিন্তা থেকে দীক্ষা নিয়ে আমরা আজকের দিনেও আমাদের এই পৃথিবীর সার্বিক পরিবেশ নিরাপদ ও সুন্দর করতে নিরলস কাজ করতে পারি।
সমীর কুমার সরকার বলেন, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জগৎ ও জীবনের প্রায় সব বিষয়কে তার ভাবনায় ধারণ করেছেন, সৃষ্টিকর্মে প্রকাশ করেছেন। তিনি আমৃত্যু পৃথিবীর পরিবেশ নিয়ে ভেবেছেন এবং তার রচনায় পরিবেশ-রক্ষার গভীর আকুতি প্রকাশ করে গেছেন। আজকের যুগেও তার পরিবেশচিন্তার প্রাসঙ্গিকতা তীব্রভাবে অনুভূত হয়।
আলোচকরা বলেন, রবীন্দ্রনাথ মানুষ থেকে উদ্ভিদ সবার জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করার তাগিদ দিয়ে গেছেন তার কবিতা থেকে চিঠি, গল্প থেকে গান, উপন্যাস থেকে নাটক, প্রবন্ধ থেকে অভিভাষণ- সর্বত্র। পরিবেশচিন্তা তার কাছে কোনো আলাদা বর্গের ভাবনা নয় বরং তার গোটা সৃজনশীল অস্তিত্বেরই অনিবার্য অংশ। আজকের বৈশ্বিক উষ্ণায়নের যুগেও রবীন্দ্রনাথের পরিবেশচিন্তার কথা আমাদের সংগত কারণেই মনে আসে কারণ তিনি বহু আগেই মানুষ ও মহাবিশ্বের নিরাপদ ভবিষ্যতের জন্য যান্ত্রিক অগ্রগতিকে একমাত্র মানদণ্ড না ধরে পরিবেশবান্ধব অগ্রসরমানতাকে গুরুত্ব দিয়ে এসেছেন।
এরপর সাংস্কৃতিক পর্বে রবীন্দ্রকবিতা আবৃত্তি করেন নূরুল হাসনাত জিলান। রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন ফাহিম হোসেন চৌধুরী এবং অণিমা রায়।
