চুনতি বন্যপ্রাণীর অভয়ারণ্য যেন দখলদারের ‘অভয়ারণ্য’
চট্টগ্রাম অফিস
প্রকাশ: ১৩ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
চট্টগ্রামে লোহাগাড়া-বাঁশখালী এলাকার পাহাড়ি-সমতল ও জঙ্গল ঘিরে অবস্থিত চুনতি অভয়ারণ্য এখন আর হাতি বা অন্য বন্যপ্রাণীর জন্য নয়, এটি বরং দখলদার মানুষের অভয়ারণ্যে পরিণত হয়েছে। এই অভয়ারণ্যের ভেতরেই বনবিভাগের চোখের সামনেই অন্ততপক্ষে ৩ শতাধিক পরিবার বসবাস করছে। এসব অবৈধ বসবাসকারীরা নির্বিচারে বন ধ্বংস করছে। সেই সঙ্গে হাতির খাবারের যেসব বনভূমি রয়েছে তাও কেটে ফেলছে।
বনে মানুষের উপস্থিতি বাড়ায় খাদ্য সংকটে পড়ছে বন্যহাতি। সংরক্ষিত বনে বসতি স্থাপনের কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতিরা। বন্ধ হয়ে গেছে হাতি চলাচলের পথ এবং সংকুচিত হয়েছে তাদের আবাসস্থল। স্থানীয় বনবিভাগসহ বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে, চুনতি সংরক্ষিত বনের পূর্ব জঙ্গল চাম্বল এলাকায় অন্তত দেড় শতাধিক পরিবার বসতি স্থাপন করেছে। শুধু চাম্বল অংশেই নয়, পুইছড়ি, নাপোড়া, জলদি ও কালীপুর এলাকার সংরক্ষিত বনেও অসংখ্য অবৈধ বসতি গড়েছেন। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে হাতির আবাসভূমি।
বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের মোট আয়তন ২৪ হাজার ৪৫৪ একর। এর মধ্যে জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ১৫ হাজার ৫৯৬ একর এলাকা বাঁশখালী উপজেলায় পড়েছে। বাঁশখালী অংশে রয়েছে একটি রেঞ্জ ও চারটি বিট। উপজেলার পূর্ব পাশের পাহাড়ি এলাকার পুরোটাই সংরক্ষিত বন এবং হাতি চলাচলের করিডর। ২০১৬ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত নয় বছরে চুনতি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্যের বাঁশখালী অংশে ১৪টি হাতি মারা গেছে। একই সময়ে হাতির কারণে প্রাণ হারিয়েছেন ১৫ জন মানুষ।
এমতাবস্থায় হাতির বিলুপ্তি রোধ, সুরক্ষা এবং তাদের আবাসস্থল সংরক্ষণে সচেতনতা তৈরির লক্ষ্যে চট্টগ্রামের বাঁশখালীতে নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হয়েছে বিশ্ব হাতি দিবস। গতকাল বুধবার নাপোড়া শেখেরখীল উচ্চ বিদ্যালয়ের হল রুমে র্যালি, আলোচনা সভা ও চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হয়। এবারের বিশ্ব হাতি দিবসের প্রতিপাদ্য- ‘বিশ্বজুড়ে ঐক্য গড়ি, হাতির জীবন রক্ষা করি।’
হাতি সংরক্ষণ প্রকল্পের অর্থায়নে চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও
প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের উদ্যোগে এসব কর্মসূচির আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে হাতির আক্রমণসহ বিভিন্নভাবে ক্ষতিগ্রস্ত ৪৫ জনের মধ্যে মোট ১৯ লাখ ১৫ হাজার টাকার চেক বিতরণ করা হয়।
চট্টগ্রাম বন্যপ্রাণী ব্যবস্থাপনা ও প্রকৃতি সংরক্ষণ বিভাগের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ কর্মকর্তা দীপান্বিতা ভট্টাচার্যের সভাপতিত্বে এবং বাঁশখালী জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হকের সঞ্চালনায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তারা জানান, জলবায়ু উদ্বাস্তুরা গহিন বনে হাতির খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত বিভিন্ন গাছপালা ধ্বংস করে চাষাবাদ শুরু করেছেন। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতি বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। এ সংকট আরো বাড়তে থাকলে হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব যেমন বাড়বে, তেমনি পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হবে।
স্থানীয় শীলকূপ আষিঘর পাড়া এলাকার কৃষক আবদুর রশীদ ও ইনফাস মিয়া বলেন, ছোটবেলা থেকে তারা সংরক্ষিত বনে কৃষিকাজ করে আসছেন। কিন্তু আগে হাতির আক্রমণের শিকার হতে হয়নি। কয়েক বছর ধরে চাষাবাদে নতুন
আতঙ্ক হয়ে দাঁড়িয়েছে বন্যহাতি।
তারা বলেন, প্রায়ই রাতে দলবেঁধে হাতির পাল এসে কলাবাগান ও সবজির খেত নষ্ট করে দেয়। এতে কৃষকেরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
চাম্বল এলাকার কৃষক রামপ্রসাদ দাশ ও রাজীব দাশ বলেন, ‘হাতি লোকালয়ে এলে শিস দিয়ে সবাইকে একত্র করা হয়। এরপর আগুন জ্বালিয়ে গহিন বনের দিকে হাতির পালকে তাড়িয়ে দেয়া হয়।’
জলদি বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার ইসরাইল হক বলেন, ‘ভৌগোলিকভাবে সংরক্ষিত বন ও লোকালয় কাছাকাছি হওয়ায় হাতি-মানুষের দ্ব›েদ্বর ঝুঁকি বেশি। উপকূলীয় এলাকার অনেক মানুষ বনের জমিতে বসতি স্থাপন করায় পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠেছে।’
তিনি বলেন, ‘হাতির বাসস্থান রক্ষায় ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি গ্রহণ করা হয়েছে। পাশাপাশি হাতিদের জন্য খাদ্য উপযোগী বাগান করা হচ্ছে।’
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রেজাউল করিম বলেন, ‘কয়েক বছর ধরে মানুষ ও হাতির দ্ব›দ্ব বেড়েছে। সংরক্ষিত বনে জলবায়ু ক্ষতিগ্রস্ত ও গৃহহীন মানুষকে পুনর্বাসন করা হয়েছে। এতে প্রকৃতি, বন্যপ্রাণী ও মানুষ- সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।’
তার মতে, এভাবে পাহাড়ি এলাকায় মানুষের পুনর্বাসন চলতে থাকলে হাতির সঙ্গে মানুষের দ্ব›দ্ব আরো বাড়বে।
বাঁশখালী সরকারি আলাওল কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ আজিজুর রহমান বলেন, ‘হাতির আবাসস্থল হলো বনাঞ্চল। সেই বনের স্বাস্থ্য ভালো না থাকলে হাতি খাবারের সন্ধানে লোকালয়ে চলে আসবেই। হাতিকে ভালো রাখতে হলে নিরাপদ আবাসস্থল, পানি ও পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা করতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘বনাঞ্চলে অবাধে গাছ কাটা, অবৈধভাবে বালু-পাথর উত্তোলন এবং বন দখল করে বসতি স্থাপনের ফলে মানুষের আনাগোনা বেড়েছে। এর পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে পাহাড়ে বন্যপ্রাণীর খাদ্যভাণ্ডারও কমে গেছে। খাবারের অভাবে প্রায়ই হাতি লোকালয়ে নেমে আসছে। এতে হাতি-মানুষের দ্ব›েদ্বর ঘটনাও বেড়েছে।’
প্রধান অতিথির বক্তব্যে বাঁশখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রুহুল আমীন বলেন, ‘সংরক্ষিত বনে বসতি গড়ে ওঠায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে হাতি। হাতি চলাচলের পথ বন্ধ হয়ে গেছে এবং সংকুচিত হয়েছে তাদের আবাসস্থল।’
তিনি বলেন, ‘গহিন বনে হাতির খাদ্যোপযোগ্য গাছপালা ধ্বংস করে বিভিন্ন ধরনের চাষাবাদ করা হচ্ছে। ফলে খাবারের সন্ধানে হাতি বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে।’
রুহুল আমীন বলেন, ‘হাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে না পারলে পরিবেশ টিকবে না। পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় হাতিকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে। হাতির বিচরণক্ষেত্রে কোনো ধরনের বাধা সৃষ্টি করা যাবে না।’
আলোচনা সভায় বক্তারা হাতির আবাসস্থল ও চলাচলের করিডর রক্ষা, বন দখল বন্ধ, হাতির খাদ্য ও পানির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা এবং হাতি-মানুষের দ্ব›দ্ব কমাতে সমন্বিত উদ্যোগ নেয়ার ওপর গুরুত্ব দেন।
