স্থানীয় সরকার নির্বাচনের আগে ৫ হাজার কোটির উন্নয়ন প্রকল্প
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
বর্ষা মৌসুম শেষ হওয়ার পরপরই সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরুর যে পরিকল্পনা করছে সরকার, তাতে দলীয় প্রার্থীদের জয়ী করতে প্রায় পাঁচ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন প্রকল্প নেয়া হল কিনা সেই প্রশ্ন উঠছে। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) গতকাল বুধবার ‘গ্রাম সড়ক পুনর্বাসন ও শক্তিশালীকরণ প্রকল্পে’র অনুমোদন দিলে সাংবাদিকদের তরফেও এ প্রশ্ন উঠে আসে।
একনেক পরবর্তী ব্রিফিংয়ে এসে অবশ্য এ প্রকল্পের সঙ্গে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কোনো সম্পর্ক নেই বলে দাবি করেন পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী মো. জোনায়েদ আব্দুর রহিম সাকি।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ের পরিকল্পনা কমিশনে এনইসি সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী এবং একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এদিন ৪ হাজার ৯৬৩ কোটি ৬৭ লাখ টাকার এ প্রকল্পের অনুমোদন মেলে। এ প্রকল্প নেয়া হল এমন এক সময়, যখন একমাস পর থেকেই ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচনের কথা ভাবছে সরকার। স্থানীয় সরকারের প্রকল্পগুলো যেমন জনমানুষের একদম সরাসরি উপকারে আসে, তেমনি এর প্রভাব গিয়ে পড়ে স্থানীয় নির্বাচনেও।
গত ফেব্রুয়ারির জাতীয় নির্বাচনে ক্ষমতায় এসে বিএনপি যেমন জোটসঙ্গীদের নিয়ে তার সরকার সাজিয়েছে; তেমনি দলীয় নেতাদের প্রশাসক করে স্থানীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানগুলোও চালাচ্ছে। কেউ কেউ আবার তার ওই অন্তর্বর্তীকালীন পদে বসে আগামী নির্বাচনের জন্য প্রচার ও জনসংযোগ চালাচ্ছেন।
সবশেষ সংসদ অধিবেশনে এক প্রশ্নের জবাবে স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছিলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ, জেলা পরিষদ এবং সিটি করপোরেশন নির্বাচন সম্পন্ন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এক্ষেত্রে ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচন দিয়েই প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। আগামী সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর থেকে ধাপে ধাপে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু হতে পারে বলেও সে সময় বলেছিলেন তিনি।
এদিকে স্থানীয় সরকার নির্বাচন সামনে রেখে মঙ্গলবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক সাক্ষাৎ করেছেন পুলিশ মহাপরিদর্শক আলী হোসেন ফকির।
বৈঠক শেষে আইজিপি আলী হোসেন বলেন, আমরা স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে কিছু আলোচনা করেছি। সেখানে আইনশৃঙ্খলা কমিটির সমন্বয় সেল গঠন, বিভিন্ন জেলা- উপজেলার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
এর একদিন পরই স্থানীয় সরকার বিভাগের এ প্রকল্পের অনুমোদনের বিষয়ে প্রশ্ন করলে জোনায়েদ সাকি বলেন, লোকাল গভার্নমেন্ট নির্বাচনের সাথে আসলে এর (প্রকল্প) কোনো সম্পর্ক নেই। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের অধীন স্থানীয় সরকার বিভাগ এই প্রকল্পটি গ্রহণ করেছে। মূলত সারা বাংলাদেশের প্রায় প্রতিটি উপজেলাতেই অনেক রাস্তা আছে যেগুলো নির্মাণের পরে দীর্ঘদিন কোনোরকম মেনটেইন্যান্স করা হয়নি। ফলে রাস্তা একেবারে ভেঙেচুরে এমন অবস্থায় আছে যে মানুষের চলাচলে খুব অসুবিধা হয়। নতুন সরকার দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথেই- আপনারা এটা সকলেই উপলব্ধি করেন, কিছুটা জানেনও- যে প্রত্যেকের কাছেই নানা ধরনের রাস্তা সংস্কারের ব্যাপারে ডিও লেটারগুলো এসেছে।
প্রতিমন্ত্রীর ভাষ্য, এখন এই সংস্কারের যে ডিও লেটার, এটা তো মানুষ যখন নির্বাচিত হয়, নির্বাচিত প্রতিনিধির কাছ থেকে দ্রুতই এসব
বিষয়গুলো আশা করতে থাকে। তো এখন সারা দেশে এগুলোকে যাচাই-বাছাই করা হয়েছে যে কোন রাস্তাগুলো একেবারে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে করা দরকার যেখানে মানুষ খুবই দুর্ভোগের মধ্যে আছেন। সেই হিসেবেই ৫ হাজারের উপরে কিলোমিটার রাস্তা এখানে। এটা কিন্তু আসলে এক ধরনের মেনটেইন্যান্স বা রিপেয়ারিং। মেনটেইন্যান্স না বলে এটাকে রিপেয়ারিং বলা দরকার। রিপেয়ারিংয়ের পরে মেনটেইন্যান্সের ব্যাপারটিও কিন্তু মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এখানে বলেছেন যে এটা যুক্ত রাখতে হবে। কারণ আমাদের রাস্তা করে দিয়ে আসার পরে আর কেউ এখানে থাকে না।
৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রাম সড়কের এ প্রকল্প দেশের ৬৪ জেলার সকল (৪৯৫) উপজেলায় বাস্তবায়িত হবে। ২০৩০ জুনের মধ্যে বাস্তবায়নের প্রাক্কলিত এ প্রকল্পের আওতায় ৭ হাজার মিটার ব্রিজ ও কালভার্ট পুনর্বাসনের বিষয়ও রয়েছে। প্রকল্পের পটভূমিতে বলা হয়, দেশের ৯৮ হাজার ২৩২ কিলোমিটার পাকা গ্রাম সড়কের বর্তমানে ৩১ হাজার ৪৩৪ কিলোমিটার রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত রয়েছে। এর মধ্য থেকে যাচাই-বাছাই করে ৫ হাজার ২২৩ কিলোমিটার গ্রাম সড়কের মেরামতকে এখন অগ্রাধিকার দেয়া হচ্ছে।
আরো যেসব প্রকল্পের অনুমোদন : একনেক সভায় এদিন আরো নয় প্রকল্পের অনুমোদন মেলে; এর মধ্যে পাঁচটি নতুন প্রকল্প ও চারটি সংশোধিত প্রকল্প রয়েছে।
অনুমোদিত প্রকল্প হল-স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ১৫৪ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘ঢাকা মেডিকেল কলেজ এর ব্যবহার অনুপযোগী স্থাপনাসমূহ প্রতিস্থাপন ও পুনঃনির্মাণ’ প্রকল্প।
একই মন্ত্রণালয়ের ২০১ কোটি টাকা ব্যয় বৃদ্ধি করে ‘১১টি মেডিকেল কলেজ এর ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য আধুনিক সুবিধা সম্বলিত ১৯টি হোস্টেল ভবন নির্মাণ (প্রথম সংশোধন)’ প্রকল্প। মূল প্রকল্প ছিল ১ হাজার ৪২৮ কোটি টাকার; এবার বেড়ে ১ হাজার ৬৩০ কোটি টাকা হল।
সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের ১১৫ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘ক্যাপাসিটি ডেভেলপমেন্ট ফর স্মার্ট মেনটেইন্যান্স টেকনোলজি অব ব্রিজেস আন্ডার রোডস অ্যান্ড হাইওয়েস ডিপার্টমেন্ট ইন বাংলাদেশ’ প্রকল্প।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ২৯৮ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘ধরলা নদীর ডান তীরের ভাঙন হতে লালমনিরহাট জেলার সদর উপজেলা রক্ষা’ প্রকল্প।
একই মন্ত্রণালয়ের ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘চট্টগ্রাম জেলার সীতাকুণ্ড উপজেলার বাঁশবাড়িয়া ফেরিঘাট শক্তিশালীকরণ’ প্রকল্প।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় হ্রাস করে ‘প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের সক্ষমতা জোরদারকরণ (তৃতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প। মূল প্রকল্প ছিল ২২০ কোটি টাকার, যা প্রথম সংশোধনে বেড়ে ২৫২ কোটি টাকা হয়। পরে দ্বিতীয় সংশোধনে করা হয় ২১৩ কোটি ৬৯ লাখ টাকা। এখন দাঁড়াল ২১৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা।
১০১ কোটি টাকা ব্যয় বাড়িয়ে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ‘জামালপুর জেলার মাদারগঞ্জে ১০০ মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ কেন্দ্র নির্মাণ (দ্বিতীয় সংশোধিত)’ প্রকল্প। মূল প্রকল্প ছিল ১ হাজার ৫১১ কোটি টাকার। এখন বেড়ে হল ১ হাজার ৬১২ কোটি টাকা।
একই মন্ত্রণালয়ের ‘ঢাকাস্থ ডেসকো এলাকায় বৈদ্যুতিক অবকাঠামো সম্প্রসারণ ও শক্তিশালীকরণ (প্রথম সংশোধন)’ প্রকল্পের ব্যয় ৬২৭ কোটি টাকা বেড়েছে। মূল প্রকল্প ছিল ২ হাজার ২৭২ কোটি টাকার; এখন হল ২ হাজার ৮৯৯ কোটি টাকা।
প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের ১ হাজার ৩১১ কোটি টাকা ব্যয়ের ‘রামু সেনানিবাসের জন্য অবকাঠামো উন্নয়ন’ প্রকল্প অনুমোদন করা হয়েছে।
এছাড়াও সভায় সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভলপমেন্ট’ শীর্ষক প্রকাশনার মোড়ক উন্মোচন করা হয়।
পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার বদলে বিএনপি সরকার উন্নয়ন ও সংস্কার কৌশলপত্র করল। আগামী ২০৩১ সালের জুন পর্যন্ত এ কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে তারা উন্নয়নের ছক কষবে।
