হাইকোর্টের নির্দেশের ১৭ বছর পরও হয়নি যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন
আইনের দীর্ঘসূত্রতায় মহিলা পরিষদের উদ্বেগ
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২০ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
যৌন হয়রানি শুধু একজন নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি তার মর্যাদা ও মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। এই প্রেক্ষাপটে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি এবং নিপীড়ন ঠেকাতে ২০০৯ সালে পূর্ণাঙ্গ আইন করার নির্দেশ দিয়েছিল হাইকোর্ট। সেই সঙ্গে অভিযোগ কমিটি করারও নির্দেশ দেয়। কিন্তু উচ্চ আদালতের নির্দেশের পর ১৭ বছর পেরিয়ে গেলেও তা হয়নি। এ বিষয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ। একই সঙ্গে প্রস্তাবিত আইন দ্রুত প্রণয়ন ও
কার্যকর করারও দাবি জানিয়েছে।
গতকাল বুধবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের জহুর হোসেন চৌধুরী হলে সংবাদ সম্মেলনে এ দাবি জানানো হয়। লিখিত বক্তব্য দেন মহিলা পরিষদের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মাসুদা রেহানা বেগম।
‘উত্ত্যক্তকরণ, যৌন নিপীড়নকে না বলুন, ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলুন’- প্রতিপাদ্যে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইন প্রণয়নের দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে মডারেটর ছিলেন পরিষদের সভাপতি ডা. ফওজিয়া মোসলেম। সংগঠনের পক্ষে বক্তব্য রাখেন পরিষদের সাধারণ সম্পাদক মালেকা বানু। বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির উপদেষ্টা অ্যাড. সালমা আলী, বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট (ব্লাস্ট) এর অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড কমিউনিকেশন বিভাগের পরিচালক মাহাবুবা আক্তার, ব্র্যাকের সামাজিক ক্ষমতায়ন ও আইনি সুরক্ষা কর্মসূচি (সেলপ) এবং জেন্ডার জাস্টিস অ্যান্ড ডাইভার্সিটি কর্মসূচির সহযোগী পরিচালক শাশ্বতী বিপ্লব, জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফোরামের ন্যাশনাল কো-অর্ডিনেটর সৈয়দা আহসানা জামান এ্যানি এবং আইন ও সালিশ কেন্দ্রের সিনিয়র স্টাফ ল’ইয়ার (লিগ্যাল এইড সার্ভিস) অ্যাড. সেলিনা আক্তার।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, ২০০৯ সালের ১৪ মে বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির করা রিটের পর হাইকোর্ট শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে অভিযোগ কমিটি গঠনের নির্দেশ দেন। একই সঙ্গে আইন প্রণয়নের নির্দেশও দেন আদালত। ২০০২ সাল থেকেই তারা যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে আসছে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে আলোচনা করে জনমত গড়ে তোলা হয়। হাইকোর্টের নির্দেশের পর মহিলা পরিষদ যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ আইনের খসড়া তৈরি করে। ২০১০ সালে বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে খসড়াটি আইন কমিশন ও মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া হয়। পরে বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, সরকারি দপ্তর, নারী ও মানবাধিকার সংগঠনের সঙ্গে আলোচনা চালানো হয়। ২০২৪ সালের ১ ও ২০ অক্টোবর মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে অংশীজনদের নিয়ে কর্মক্ষেত্র ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যৌন হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা আইনের খসড়া চূড়ান্ত করার লক্ষ্যে সভা হয়। এরপর ২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি ‘যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, ২০২৬’-এর খসড়া উপদেষ্টা পরিষদের বৈঠকে নীতিগত অনুমোদন পায়। পরে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় খসড়াটি পর্যালোচনা করে আবার মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। আইন প্রণয়নের উদ্যোগ দীর্ঘদিন ধরে চললেও নারী ও কন্যাশিশুরা এখনো যৌন হয়রানি ও উত্ত্যক্তকরণের শিকার হচ্ছেন। তাই দ্রুত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়ন জরুরি। দ্রুত আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের পাশাপাশি নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০-এর ১০ ধারায় উত্ত্যক্তকরণ, যৌন হয়রানি ও নিপীড়নের সংজ্ঞা হালনাগাদের দাবি জানানো হয়। দণ্ডবিধি, ১৮৬০-এর সংশ্লিষ্ট ধারা আধুনিকায়ন, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও কর্মস্থলে অভিযোগ কমিটি গঠন এবং কমিটির কার্যক্রম নিয়মিত তদারকের দাবিও জানানো হয়। যৌন হয়রানি শাস্তিযোগ্য অপরাধ এ বিষয়ে জনসচেতনতা তৈরি, পাঠ্যসূচিতে যৌন হয়রানি প্রতিরোধের বিষয় অন্তর্ভুক্ত এবং ছেলে-মেয়েদের সচেতন করার সুপারিশ করা হয়। প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে আরো সক্রিয় হওয়ার আহ্বান জানানো হয় লিখিত বক্তব্যে।
ডা. ফওজিয়া মোসলেম বলেন, আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে বারবার বিলম্ব এবং মন্ত্রণালয়গুলোর মধ্যে সমন্বয়হীনতা উদ্বেগজনক। নারী সংগঠন ও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শে পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি হলেও তা যাচাই-বাছাই ও পর্যালোচনার নামে আটকে থাকছে। আইন প্রণয়নে সরকারের দ্রুত ও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ প্রয়োজন। হাইকোর্টের নির্দেশনা অনুযায়ী দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে শক্তিশালী ও পূর্ণাঙ্গ আইন তৈরি করে তা কার্যকর করতে হবে।
অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, কর্মক্ষেত্রে নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে ২০০৯ সালের হাইকোর্টের নির্দেশনার পূর্ণাঙ্গ আইনগত প্রতিফলন জরুরি। তিনি ৫ সদস্যের অভিযোগ কমিটি, তদন্তের সুনির্দিষ্ট সময়সীমা, নির্দেশনা অমান্যকারীদের জবাবদিহি, বার্ষিক প্রতিবেদন প্রকাশ ও কার্যকর তদারকি ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করার দাবি জানান।
মালেকা বানু বলেন, যৌন হয়রানি প্রতিরোধে আইন প্রণয়নের দাবি মহিলা পরিষদ বা নারী আন্দোলনের সা¤প্রতিক কোনো উদ্যোগ নয়। দীর্ঘদিনের আন্দোলন ও অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এই দাবি, আন্দোলন গড়ে উঠেছে। ২০০১ সালের দিকে চারুকলার ছাত্রী সিমি, গাইবান্ধার কিশোরী তৃষাসহ বিভিন্ন ঘটনার মধ্য দিয়ে যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন কীভাবে নারীর জীবনকে বিপন্ন করে তুলছে তা পরিলক্ষিত হয়েছে। যৌন হয়রানি শুধু একজন নারীকে শারীরিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে না, এটি তার মর্যাদা ও মানবাধিকারেরও লঙ্ঘন। এই প্রেক্ষাপটে ২০০৯ সাল থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত মহিলা পরিষদ, নারী আন্দোলন এবং বিভিন্ন সংগঠন ধারাবাহিকভাবে এই আইন প্রণয়নের দাবি জানিয়ে এসেছে। যৌথ উদ্যোগে আইনটির খসড়া প্রণয়ন করে নীতিনির্ধারকদের কাছেও তা উপস্থাপন করা হয়েছে। তারপরও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও আইনটি প্রণীত না হওয়া অত্যন্ত উদ্বেগজনক। রাষ্ট্রের দায়িত্ব, দায়বদ্ধতা ও নারীর সুরক্ষার বিষয়টি যথাযথ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেয়া প্রয়োজন।
শাশ্বতী বিপ্লব বলেন, ১৭ বছরে একটি শিশু প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর্যায়ে পৌঁছে যায়। তরুণ বয়স থেকে এই আন্দোলন করে এখন মধ্য বয়সে পৌঁছেও রাষ্ট্রের কাছ থেকে কোনো আইন পাওয়া গেল না। আজো এই আইনের দাবিতে আন্দোলন করে যেতে হচ্ছে। সঠিক আইনি কাঠামোর অভাবে হয়রানির শিকার নারীর সুরক্ষা দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।
