সুকান্ত জন্মশতবর্ষ
দোদুল্যমান পৃথ্বীতে নতুন করে ভিত্তি গড়ার প্রত্যয় উদীচীর
কাগজ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৯ আগস্ট ২০২৬, ১২:০০ এএম
প্রিন্ট সংস্করণ
‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করব নতুন ভিত্তি’ এই স্লোগান নিয়ে সুকান্ত জন্মশতবর্ষ উদযাপন করল বাংলাদেশ উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী। গতকাল শুক্রবার বিকালে আগারগাঁওয়ের মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর মিলনায়তনে আয়োজিত এই অনুষ্ঠানের শুরুতে আলোচনা পর্বে সভাপতিত্ব করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহমুদ সেলিম। এ পর্বে আলোচনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সাধারণ সম্পাদক অমিত রঞ্জন দে, সহসাধারণ সম্পাদক প্রদীপ ঘোষ, বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ, লেখক, গবেষক ও প্রাবন্ধিক মামুন সিদ্দিকী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব আবুল খায়ের। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহসাধারণ সম্পাদক সঙ্গীতা ইমাম। আলোচনা পর্বে বক্তারা বলেন, মাত্র ছ’সাত বছরের কবিতা জীবনেও বাঙালি ভুবনকে দশকের পর দশক ধরে আচ্ছন্ন মুগ্ধ অনুপ্রাণিত করে চলেছে সুকান্ত ভট্টাচার্যের সৃষ্টি নিয়ে। সুকান্তের কবিতা একইসঙ্গে সাহিত্যের দায় বহন করেছে, আবার মতাদর্শের, রাজনীতির এবং নিজের রাজনৈতিক দলের হয়েও ভূমিকা পালন করেছে। ঔপনিবেশিক শাসনের বিরোধিতা এবং মহাযুদ্ধের বিভীষিকাময় সময়ে ঔপনিবেশিক শাসকদের চক্রান্তে নেমে আসা মন্বন্তরের সময়ে জনগণের প্রতিদিনের সংগ্রামের সঙ্গী ছিলেন সুকান্ত। ফ্যাসিবাদ ও ঔপনিবেশিক শাসন যুগপৎ বিরোধিতার স্বাক্ষর বহন করছে সুকান্তের কবিতা। সুকান্তের কবিতার সময়পর্ব ফ?্যাসিবিরোধী যুদ্ধ, ফ?্যাসিবাদের পরাজয়, ঔপনিবেশিক শাসনবিরোধী আন্দোলনের দুর্বার হয়ে ওঠা, নৌবাহিনীর বিদ্রোহ আর কলকারখানার শ্রমিকদের ধর্মঘট হয়ে ঔপনিবেশিক শাসন অবসানের প্রাকমুহূর্ত অবধি বিস্তৃত। এর মধ্যেই ১৯৪৬ এর ১৬ আগস্ট থেকে তার
শেষ নিঃশ্বাস ত?্যাগের মুহূর্ত কলকাতা শহর বীভৎস দাঙ্গা দেখেছে যা বারবার আত্মপ্রকাশ করেছে।
অমিত রঞ্জন দে বলেন, সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রয়াণের প্রায় আট দশক পর আমরা যখন বাংলাদেশের দিকে তাকাই, তখন সময় বদলেছে, রাষ্ট্রের কাঠামো বদলেছে, প্রযুক্তি ও অর্থনীতির ধরন বদলেছে; কিন্তু মানুষের কিছু মৌলিক সংকট এখনো আমাদের সামনে রয়ে গেছে। বৈষম্য, বেকারত্ব, দ্রব্যমূল্যের চাপ, শ্রমজীবী মানুষের অনিশ্চয়তা, কৃষকের ন্যায্য মূল্য না পাওয়া, দুর্নীতি, ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন, সামাজিক অবিচার এবং পরিবেশগত সংকট- এসব প্রশ্ন আজো আমাদের সমাজকে নাড়া দেয়।
তিনি আরো বলেন, ২০২৪ সালের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশের মানুষ নতুন প্রত্যাশা নিয়ে গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা, ন্যায়বিচার ও বৈষম্যহীন সমাজের স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। কিন্তু সেই প্রত্যাশার সঙ্গে বাস্তবতার ব্যবধানও ক্রমশ স্পষ্ট হয়েছে। রাজনৈতিক পরিবর্তন তখনই অর্থবহ হয়ে ওঠে, যখন তা মানুষের জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আনে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে জবাবদিহিমূলক করে, নাগরিক অধিকার নিশ্চিত করে এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য কমায়। অন্যথায় কেবল ক্ষমতার পরিবর্তন মানুষের কাক্সিক্ষত সামাজিক পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারে না। আর এই জায়গাতেই সুকান্ত আজও প্রাসঙ্গিক। কারণ তিনি ক্ষমতার পরিবর্তনের চেয়ে মানুষের জীবনের পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মনে করেছিলেন। তার সাহিত্য বারবার আমাদের মনে করিয়ে দেয়- ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে স্বাধীনতা, গণতন্ত্র কিংবা উন্নয়নের প্রকৃত অর্থ তখনই প্রতিষ্ঠিত হয়, যখন তার ঘরে খাবার থাকে, তার শ্রমের ন্যায্য মূল্য থাকে, তার সন্তান নিরাপদে বেড়ে উঠতে পারে এবং সে মর্যাদার সঙ্গে বাঁচতে পারে।
মাহমুদ সেলিম বলেন, আমাদের জীবদ্দশায় আমাদের নানা সংগ্রামে আন্দোলনে সুকান্ত আমাদের পাশে থেকে হাজার সুকান্ত হয়ে আজো যুদ্ধ করেন তার তীক্ষè কবিতা আর গানের অস্ত্র নিয়ে। যেখানেই সংগ্রাম-যুদ্ধ, সেখানেই সুকান্ত।
আলোচনা পর্বের পর সুকান্ত ভট্টাচার্যের প্রতিকৃতিতে শ্রদ্ধা নিবেদন করে উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদ এবং ঢাকা মহানগর সংসদসহ বিভিন্ন শাখা সংসদের নেতাকর্মীরা। করা হয় শত প্রদীপ প্রজ¦ালন। এছাড়া, সুকান্তের লেখা ‘ছাড়পত্র’ কবিতাটি শপথ হিসেবে সবাইকে পাঠ করান উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের সহ-সভাপতি বেলায়েত হোসেন। এরপর সুকান্তের লেখা অবাক পৃথিবী গানটির সঙ্গে দলীয় নৃত্য পরিবেশন করে ধৃতি নর্তনালয়, পরিচালনায় ছিলেন ওয়ার্দা রিহাব। অনুষ্ঠানে সমবেত সংগীত পরিবেশন করে উদীচী কেন্দ্রীয় সংগীত বিভাগের শিল্পীরা। তারা পরিবেশন করেন- হে মহামানব একবার এসো ফিরে, হে সাথী আজকে স্বপ্নের দিন গোনা এবং হিমালয় থেকে সুন্দরবন হঠাৎ বাংলাদেশ গান তিনটি। এছাড়া, একক সংগীত পরিবেশন করেন অলক দাশগুপ্ত, জয়া সেনগুপ্তা, শাওন কুমার রায়, সরস্বতী সরকার ও বিজয় বণিক। সম্মেলক আবৃত্তি পরিবেশন করে উদীচী কেন্দ্রীয় আবৃত্তি বিভাগের শিল্পীরা। এর শিরোনাম ছিল ‘বন্ধু আজকে দোদুল্যমান পৃথ্বী, আমরা গঠন করব নতুন ভিত্তি’। পরিকল্পনা ছিলেন বেলায়েত হোসেন, আর নির্দেশনায় শিখা সেনগুপ্তা। একক আবৃত্তি পরিবেশন করেন মো. মাসুদুজ্জামান, শিখা সেনগুপ্তা ও সুমিত পাল। বৃন্দ আবৃত্তি পরিবেশন করে স্রোত আবৃত্তি সংসদ। এ পর্বটি সঞ্চালনা করেন উদীচী কেন্দ্রীয় সংসদের ভারপ্রাপ্ত কোষাধ্যক্ষ মিতা রায় এবং সম্পাদকমণ্ডলীর সদস্য শেখ আনিসুর রহমান।
