ট্রাম্পের জাতিসংঘের ভাষণেও মিথ্যার ফুলঝুরি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ডোনাল্ড ট্রাম্প ভাষণ দিলেও এই আলোচনা শুরু হয়ে যায় যে তিনি কত ভুয়া তথ্য ছড়িয়েছেন। জাতিসংঘে তার এবারের ভাষণেও তার ব্যতিক্রম হয়নি।
গতকাল মঙ্গলবার জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নিজের প্রশাসনের বিভিন্ন সাফল্যগাথা তুলে ধরেছেন। তবে যুদ্ধ বন্ধ, বৈশ্বিক উষ্ণায়ন, যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগ, সামরিক গোলাবারুদের মজুদ এবং ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ কমার যে তথ্য তিনি দিয়েছেন, তা সত্যতা নিয়ে উঠেছে প্রশ্ন।
ট্রাম্প বলেছেন, প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তিনি আটটি যুদ্ধ বন্ধ করেছেন। কম্বোডিয়া-থাইল্যান্ড, কসোভো-সার্বিয়া, রুয়ান্ডা-কঙ্গো, ভারত-পাকিস্তান, আর্মেনিয়া-আজারবাইজান এবং গাজা যুদ্ধের কথা উল্লেখ করেছেন তিনি।
এর আগে তিনি ইসরায়েল-ইরানের ২০২৫ সালের স্বল্পস্থায়ী সংঘাত এবং মিসর-ইথিওপিয়ার কথিত যুদ্ধ বন্ধ করার দাবিও করেছিলেন।
তবে এই তালিকার দুটি ঘটনাকে যুদ্ধ হিসেবে চিহ্নিত করা যায় না। মিসর ও ইথিওপিয়ার মধ্যে বিরোধটি ছিল ইথিওপিয়ার বাঁধ প্রকল্প নিয়ে কূটনৈতিক বিরোধ। কসোভো ও সার্বিয়ার মধ্যেও ট্রাম্পের মেয়াদে কোনো যুদ্ধ চলছিল না।
রুয়ান্ডা ও কঙ্গোর সংঘাতের ক্ষেত্রেও ট্রাম্প প্রশাসনের মধ্যস্থতায় শান্তিচুক্তি হলেও লড়াই পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। গাজায় যুদ্ধবিরতি কার্যকর হওয়ার পরও ইসরায়েলি হামলার ঘটনা অব্যাহত রয়েছে।
তবে ২০২৫ সালে ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে কয়েক দিনের সংঘাত থামাতে ট্রাম্প প্রশাসন ভূমিকা রেখেছিল। যদিও ২০২৬ সালে ইরানকে কেন্দ্র করে আবারও যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং বা বৈশ্বিক উষ্ণায়ন নিয়ে ট্রাম্প দাবি করেছেন, আগে যারা বলেছিলেন ‘১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে’, তারাই পরে পৃথিবী ঠান্ডা হওয়ার কারণে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ নাম বদলে ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ করেছে।
জলবায়ু বিজ্ঞানীদের ব্যবহারে ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ ও ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ দুটি আলাদা হলেও পরস্পর সম্পর্কিত ধারণা। ‘গ্লোবাল ওয়ার্মিং’ বলতে দীর্ঘমেয়াদে পৃথিবীর গড় তাপমাত্রা বৃদ্ধিকে বোঝানো হয়। আর ‘ক্লাইমেট চেঞ্জ’ বলতে এর ফলে তাপমাত্রা, বৃষ্টিপাত, সমুদ্রপৃষ্ঠসহ জলবায়ু ব্যবস্থায় বিস্তৃত পরিবর্তনকে বোঝানো হয়।
পৃথিবীর তাপমাত্রা কমে যাওয়ার দাবির সঙ্গেও তথ্যের মিল নেই। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা জানিয়েছে, রেকর্ড রাখা শুরুর পর গত ১১ বছরই ছিল সবচেয়ে উষ্ণ ১১ বছর। ২০২৩, ২০২৪ ও ২০২৫ ছিল রেকর্ডের সবচেয়ে উষ্ণ তিন বছর।
‘১২ বছরের মধ্যে সবাই মারা যাবে’— এমন কোনো বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্তও ২০১৮ সালের জলবায়ুবিষয়ক প্রতিবেদনে দেওয়া হয়নি। ওই সময় বিজ্ঞানীরা বলেছিলেন, বৈশ্বিক উষ্ণতা ১ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের মধ্যে রাখতে হলে পরবর্তী ১২ বছরে গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণ দ্রুত কমানো জরুরি।
অর্থাৎ সতর্কবার্তাটি ছিল ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে দ্রুত পদক্ষেপের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে, ১২ বছরের মধ্যে মানবজাতির বিলুপ্তি নিয়ে নয়।
যুক্তরাষ্ট্রে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের নতুন বিনিয়োগের প্রতিশ্রুতি পাওয়ার দাবিও করেছেন ট্রাম্প। তবে তার এই সংখ্যার পক্ষে স্পষ্ট কোনো ভিত্তি পাওয়া যায়নি।
ট্রাম্প জাতিসংঘে বক্তব্য দেওয়ার সময় হোয়াইট হাউজের ওয়েবসাইটে তার দ্বিতীয় মেয়াদে ‘বড় বিনিয়োগ ঘোষণার’ পরিমাণ ১১ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার বলা হয়েছিল। অর্থাৎ প্রেসিডেন্টের উল্লেখ করা ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের তুলনায় সেটি প্রায় অর্ধেক।
এর মধ্যে যুক্তরাষ্ট্রে বিনিয়োগের পাশাপাশি বাণিজ্য, অর্থনৈতিক সহযোগিতা এবং ভবিষ্যৎ বিনিয়োগের অস্পষ্ট প্রতিশ্রুতিও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানির ঘোষণাও তালিকায় রয়েছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রে নতুন বিদেশি প্রত্যক্ষ বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল প্রায় ২৩২ বিলিয়ন ডলার। ফলে ২১ ট্রিলিয়ন ডলারের অঙ্কটি সরাসরি বিদেশি বিনিয়োগের পরিমাণ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
ইরানের সঙ্গে যুদ্ধের প্রসঙ্গে ট্রাম্প বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের কোনো ঘাটতি নেই। তার দাবি, দেশটির কাছে এত বেশি গোলাবারুদ রয়েছে যে সেগুলো কখনো পুরোপুরি ব্যবহার করাও সম্ভব নয় এবং বর্তমানে আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় বেশি হারে সেগুলো তৈরি হচ্ছে।
তবে প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শক এবং কংগ্রেসনাল বাজেট অফিসের সাম্প্রতিক দুটি প্রতিবেদনে সামরিক সরঞ্জামের মজুদ ও উৎপাদন সক্ষমতা নিয়ে ঘাটতির কথা উঠে এসেছে।
প্রতিরক্ষা বিভাগের মহাপরিদর্শকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইরান যুদ্ধে গোলাবারুদ ব্যবহারের কারণে কৌশলগত মজুদে ঘাটতি তৈরি হয়েছে এবং নতুন করে গোলাবারুদ সরবরাহে প্রতিরক্ষা শিল্পের সক্ষমতার কিছু সীমাবদ্ধতা প্রকাশ পেয়েছে।
বিশেষ করে সলিড রকেট মোটর, উচ্চমানের বিস্ফোরক ও প্রপেল্যান্ট এবং দক্ষ উৎপাদনকর্মীর ঘাটতিকে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।
কংগ্রেশনাল বাজেট অফিসও জানিয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় ব্যবহৃত ইন্টারসেপ্টরের ঘাটতি রয়েছে। সংস্থাটির হিসাবে, ২০২৫ সালের জুনের পর যুক্তরাষ্ট্র সম্ভবত এসব অস্ত্রের মজুদের অর্ধেক থেকে দুই-তৃতীয়াংশ পর্যন্ত ব্যবহার করেছে। উৎপাদন বাড়ালেও মজুত আগের অবস্থায় ফিরতে অন্তত পাঁচ বছর সময় লাগতে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে মার্কিন প্রতিরক্ষা বিভাগ ধারাবাহিকভাবে বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের গোলাবারুদের সামগ্রিক ঘাটতি নেই।
ওয়াশিংটন ডিসিতে অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে বলে ট্রাম্পের দাবি নিয়েও তথ্যের অমিল রয়েছে।
ট্রাম্প বলেছেন, গত বছরের ২০ জানুয়ারি তিনি দায়িত্ব নেওয়ার সময় রাজধানী শহরটি অপরাধে জর্জরিত ছিল। এখন অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে এবং তা শূন্যে নামিয়ে আনার লক্ষ্য রয়েছে তার।
তবে স্থানীয় পুলিশের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরে সোমবার পর্যন্ত ওয়াশিংটনে ১৫ হাজারের বেশি অপরাধ নথিভুক্ত হয়েছে। একই সময়ের ২০২৪ সালের তুলনায় মোট অপরাধ কমেছে প্রায় ২৩ শতাংশ। ২০২৫ সালের একই সময়ের তুলনায় কমেছে প্রায় ১৫ শতাংশ।
অর্থাৎ শহরে অপরাধ কমেছে ঠিকই, কিন্তু সামগ্রিক অপরাধের ক্ষেত্রে ৮৭ শতাংশ কমার দাবি পুলিশের প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে মেলে না।
হোয়াইট হাউজ এর আগে ওয়াশিংটনে অপরাধ ৮১, ৮৮ কিংবা ৯২ শতাংশ কমেছে— এমন বিভিন্ন দাবি করেছিল। পরে এসব দাবির ব্যাখ্যা দিতে প্রশাসনের কর্মকর্তারা নির্দিষ্ট কিছু অপরাধের পরিসংখ্যানের কথা উল্লেখ করেছেন। এর মধ্যে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ২০২৫ সালের চারটি থেকে চলতি বছরে একটিতে নেমে আসার তথ্যও ছিল।
সুতরাং ওয়াশিংটনে অপরাধ কমার প্রবণতা থাকলেও সামগ্রিক অপরাধ ৮৭ শতাংশ কমেছে— এমন তথ্য সরকারি পরিসংখ্যানে পাওয়া যাচ্ছে না।
সূত্র : সিএনএন
