গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল
ঐতিহ্য আর সর্বাধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয়
সেবিকা দেবনাথ, চীন থেকে ফিরে
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৪ পিএম
গত ২৫ অক্টোবর ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের চিকিৎসাকেন্দ্র পরিদর্শন করেন বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সদস্যরা। ছবি: রিপোর্টার
হৈ হট্টগোল, বর্হিবিভাগ কিংবা জরুরি বিভাগের সামনে রোগীদের দীর্ঘ লাইন নেই। নেই ট্রলি বা হুইল চেয়ার টানার গড়গড় শব্দ, রোগীদের আর্তনাদ। যে দিকে চোখ যায় ঝাঁ তকতকে মেঝে, কোথাও কোন ময়লার চিহ্ন মাত্র নেই। দেখে বোঝার কোন জো নেই এটি একটি হাসপাতাল। তাও ১২৭ বছরের পুরাতন, সরকারি হাসপাতাল। চীনের গুয়াংডং প্রদেশের গুয়াংজু শহরে অবস্থিত গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের বিভিন্ন ক্যাম্পাস সরেজমিন পরিদর্শনে এমন চিত্রই মিলেছে।
হাসপাতালের প্রথম পরিদর্শনেই মনে হলো, হাসপাতালের ক্যাম্পাসের চারপাশেই রয়েছে মন ভালো হয়ে যাওয়ার মত পরিবেশ। হাসপাতালে সর্বাধুনিক চিকিৎসা সেবার পাশাপাশি রয়েছে দেশটির ঐতিহ্যবাহী (ট্রেডিশনাল) চিকিৎসা সেবার ব্যবস্থাও। ঐতিহ্য এবং সর্বাধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের অপূর্ব সমন্বয় ঘটেছে এই হাসপাতালে।
চীনের স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা সরেজমিন দেখার জন্য বাংলাদেশ হেলথ রিপোর্টার্স ফোরামের (বিএইচআরএফ) সদস্যদের আমন্ত্রণ জানায় গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতাল। সেই আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে ফোরামের ৩৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধিদল গত ২৫ অক্টোবর হাসপাতালটি পরিদর্শন করে। এসময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিশেষায়িত বিভাগ, চিকিৎসা অবকাঠামো, আধুনিক প্রযুক্তি এবং আন্তর্জাতিক রোগীদের জন্য গড়ে তোলা সেবাব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা দেয়া হয়।

পরিদর্শনের পাশাপাশি হাসপাতালের ব্যবস্থাপনায় বিএইচআরএফের প্রতিনিধিদলের সদস্যদের নানা স্বাস্থ্য পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়। কেন্দ্রটিতে রয়েছে পজিট্রন এমিশন টমোগ্রাফি-কম্পিউটেড টমোগ্রাফি (পিইটি-সিটি) এবং ৩ টেসলা ম্যাগনেটিক রেজোন্যান্স ইমেজিংয়ের (এমআরআই) মতো আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম।
জানা যায়, ১৮৯৯ সালে প্রতিষ্ঠিত এই হাসপাতালটি গুয়াংজু মেডিকেল ইউনিভার্সিটির প্রথম অধিভুক্ত হাসপাতাল এবং দক্ষিণ চায়না ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজির অধিভুক্ত হাসপাতাল হিসেবে চিকিৎসা সেবা ও গবেষণায় নেতৃত্ব দিয়ে আসছে। চীনের শীর্ষ ১০০টি হাসপাতালের তালিকায় ধারাবাহিকভাবে স্থান পাওয়া এই প্রতিষ্ঠানটি ২০২৪ সালে আন্তর্জাতিক মানের হাসপাতাল স্বীকৃতিও লাভ করেছে। হেমাটোলজি বা রক্তরোগ, জেরিয়াট্রিকস, গ্যাস্ট্রোএন্টারোলজি ও ইউরোলজিসহ বিভিন্ন বিভাগে চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি স্টেম সেল প্রতিস্থাপন, কোষভিত্তিক চিকিৎসা এবং জিন থেরাপি নিয়েও কাজ করছে প্রতিষ্ঠানটি। দীর্ঘদিনের চিকিৎসা অভিজ্ঞতার সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশেষায়িত সেবার সমন্বয় হাসপাতালটির অন্যতম বৈশিষ্ট্য।
পরিদর্শনকালে ওই হাসপাতালের স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্টেশন অ্যান্ড সেলুলার থেরাপি ইউনিটের সামনে কথা হয় বাংলাদেশ থেকে আসা আব্দুল্লাহ হাসান নাসিফ রবিনের সঙ্গে। ঢাকার ধানমন্ডির বাসিন্দা রবিনের স্ত্রী স্নিগ্ধা ব্লাড ক্যান্সারে আক্রান্ত। স্নিগ্ধার চিকিৎসা চলছে এই হাসপাতালে। রবিন জানান, ২০২৫ সালের অক্টোবরে স্নিগ্ধার মাল্টিপল মায়েলোমা শনাক্ত হওয়ার পর প্রথমে ভারতে চিকিৎসার পরিকল্পনা করলেও ভিসা জটিলতায় শেষ পর্যন্ত যেতে পারেননি। পরে প্রথমে চীনের একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসা শুরু করেন। পরবর্তীতে স্ত্রীকে নিয়ে আসেন গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস সরকারি হাসপাতালে।

এই হাসপাতালে স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ সম্পর্কে জানতে চাইলে রবিন জানান, বোনম্যারো ট্রান্সপ্লান্টসহ সামগ্রিক চিকিৎসার প্যাকেজে প্রায় ৪৫ লাখ টাকা খরচ হবে। অনান্য দেশের তুলনায় এখানে খরচ কম বলে জানান রবিন। জানান, চীনারা ইংরেজি না জানায় ভাষাগত সমস্যায় পড়তে হয়। তাছাড়া বাংলাদেশিদের উপযোগী খাবারও সহজে মেলে না। তবে ভাষাগত সমস্যা, আবাসন ও দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানোর মতো চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় হাসপাতালের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্র থেকে সহায়তার ব্যবস্থা রয়েছে। মুসলিম রোগী ও স্বজনদের জন্য আলাদাভাবে খাবার রান্নার ব্যবস্থা রয়েছে। চিকিৎসক, নার্স এবং হাসপাতালে অনান্যকর্মীরা রোগী ও তাদের স্বজনদের সঙ্গে বন্ধুসুলভ আচরণ করেন বলেও জানান রবিন।
ইন্টারন্যাশনাল মেডিকেল সেন্টার অব গুয়াংজু ফার্স্ট পিপলস হাসপাতালের নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝাং বিএইচআরএফ প্রতিনিধিদলের সঙ্গে আলাপকালে জানান, প্রতিষ্ঠানটিতে জাতীয় পর্যায়ের ৪টি বিশেষায়িত বিভাগ এবং প্রাদেশিক পর্যায়ের ২১টি গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ রয়েছে। ৩টি ক্যাম্পাসে বেডের সংখ্যা প্রায় ২ হাজার ৯৭০। বছরে প্রায় ৩০ লাখ রোগীকে চিকিৎসাসেবা দেয়া হয়। হাসপাতালটিতে স্টেট কাউন্সিলের বিশেষ সরকারি ভাতা পাওয়া ১০ জন বিশেষজ্ঞ এবং এক হাজারের বেশি সিনিয়র পেশাজীবী রয়েছেন। এ ছাড়া আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ৮৩ জন আমন্ত্রিত গবেষক ও বিশেষজ্ঞের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটির সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, স্বাস্থ্য পরীক্ষার ফল বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের মাধ্যমে একাধিক ধাপে পর্যালোচনা ও মান যাচাই করা হয়। পরীক্ষায় কোনো অস্বাভাবিকতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে জানানোর পাশাপাশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ দেয়ার ব্যবস্থাও রয়েছে। পিইটি-সিটি ও এমআরআইয়ের মতো প্রযুক্তি রোগ নির্ণয় এবং চিকিৎসার পরিকল্পনা তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে রোগীর প্রয়োজন অনুযায়ী কোন পরীক্ষা করা হবে তা নির্ধারণ করেন চিকিৎসকেরা।
হাসপাতালের পুনর্বাসন কার্যক্রম সম্পর্কে জানান প্রতিষ্ঠানের উপ-পরিচালক ওউইয়াং ইংজুন। এ বিভাগে অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের সুস্থ করে তোলা এবং দীর্ঘমেয়াদি রোগ ব্যবস্থাপনায় বিভিন্ন আধুনিক যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসাপদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। রোগীর শারীরিক সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা, চলাচলের সীমাবদ্ধতা কমানো ও স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতে সহায়তার বিভিন্ন কার্যক্রম সম্পর্কেও তুলে ধরেন তিনি।
হাসপাতালের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিভাগ হেমাটোলজি বিভাগ। ওউইয়াং ইংজুন জানান, এখানে অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া, অ্যাকিউট লিউকেমিয়া, লিম্ফোমা ও মাল্টিপল মায়েলোমাসহ বিভিন্ন জটিল রক্তরোগের চিকিৎসা দেয়া হয়। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেয়া তথ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটিতে বছরে প্রায় ৩০০টি হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট (এইচএসসিটি) করা হয়। এ ছাড়া রোগীদের চিকিৎসার জন্য বিশেষায়িত ট্রান্সপ্লান্ট ওয়ার্ডে গ্রেড-১০০ ল্যামিনার-ফ্লো সুবিধাসম্পন্ন ৩০টি কক্ষ রয়েছে।
হাসপাতালের আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রের নির্বাহী পরিচালক চেংজুয়ান ঝাং জানান, অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়ার চিকিৎসায় হাসপাতালে বছরে প্রায় ১০০টি হেমাটোপয়েটিক স্টেম সেল ট্রান্সপ্লান্ট করা হয়। স্টেম সেল প্রতিস্থাপনের পাশাপাশি কোষভিত্তিক চিকিৎসা ও জিন থেরাপি নিয়েও কাজ করছে হাসপাতালটি।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, মাল্টিপল মায়েলোমার চিকিৎসায় কার-টি সেল থেরাপির সুবিধা রয়েছে। থ্যালাসেমিয়া রোগের মতো বিরল রোগের চিকিৎসায় জিন থেরাপি এবং রক্তরোগের চিকিৎসায় কোষ ও জিন থেরাপির ক্লিনিক্যাল গবেষণা ও প্রয়োগ নিয়েও কাজ চলছে।
আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থার পাশপাশি এই স্বাস্থ্য সেবা প্রতিষ্ঠানে চীনের ঐতিহ্যবাহী চিকিৎসা ব্যবস্থার জন্যও রাখা হয়েছে আলাদা বিভাগ। সেখানে ব্যথা ব্যবস্থাপনা এবং স্নায়ু ও রক্তনালিসংক্রান্ত সমস্যায় পুনর্বাসনের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত আকুপাংচার, কাপিং থেরাপি, চাইনিজ ভেষজ চিকিৎসাসহ বিভিন্ন চিকিৎসাপদ্ধতি রয়েছে।
আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর বিষয়ে গুরুত্ব দিচ্ছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। বিদেশি রোগীদের চিকিৎসাসেবা দেয়ার সক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক চিকিৎসাকেন্দ্রে আলাদা বহিঃর্বিভাগ ও অন্তঃর্বিভাগের ব্যবস্থা করা হয়েছে। বিশেষায়িত হেমাটোলজি প্রতিস্থাপন ওয়ার্ড, দুভাষী, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ ও বহুবিষয়ক চিকিৎসক দলের (এমডিটি) মাধ্যমে চিকিৎসা পরিকল্পনা তৈরি, বিদেশি রোগীদের চিকিৎসাসেবা সহজ করতে বাণিজ্যিক বিমা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সরাসরি বিল পরিশোধের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
হংকং ও ম্যাকাওকে ঘিরে গড়ে ওঠা এ অঞ্চলে চিকিৎসা, গবেষণা ও আধুনিক প্রযুক্তির সমন্বয়ে উন্নত স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণের পরিকল্পনা রয়েছে হাসপাতালটির। সেই লক্ষ্যে ‘গ্রেটার বে এরিয়া ড্রাগস এন্ড মেডিকেল ডিভাইসেস পাস’ নীতির আওতায় আন্তর্জাতিক পর্যায়ের ওষুধ ও চিকিৎসা সরঞ্জাম ব্যবহারের সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে। পাশাপাশি কোষ ও জিন থেরাপির ক্লিনিক্যাল গবেষণা এবং গবেষণালব্ধ চিকিৎসাপদ্ধতির প্রয়োগ নিয়েও কাজ করছে বলে জানান হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ।
সব মিলিয়ে, চীনের গুয়াংজু শহরের এই হাসপাতালটি শুধু দেশেরই নয় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের রোগীদের আস্থা অর্জনে প্রতিনিয়তই প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বাড়াতে কাজ করছে কর্তৃপক্ষ।
