ট্রাম্পের পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট হওয়ার আলোচনায় যারা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:০৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের কাছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের দলের বড় পরাজয় ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে নতুন রাজনৈতিক সমীকরণ তৈরি করেছে। ট্রাম্পের উত্তরসূরি হিসেবে হোয়াইট হাউসে কে আসতে পারেন, তা নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা আরও জোরালো হয়েছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের পরাজয়ের পর সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। এত দিন ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে এগিয়ে ছিলেন তিনি। তবে ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হওয়ায় প্রেসিডেন্টের জনপ্রিয়তা কমে যাওয়ার প্রভাব তাঁর ওপরও পড়তে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অন্যদিকে, নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটদের সাফল্য দলটির নতুন প্রজন্মের কয়েকজন নেতার সামনে সম্ভাবনার দুয়ার খুলে দিয়েছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জর্জিয়ার সিনেটর জন অসফ। তরুণসুলভ উপস্থিতি ও বক্তৃতার ধরন দিয়ে নজর কেড়েছেন তিনি। এসব কারণে সাবেক প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার সঙ্গেও তাঁর তুলনা করা হচ্ছে।
রিপাবলিকান শিবিরে নতুন সমীকরণ
২০১৬ ও ২০২৪ সালে ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ক্ষমতায় আনতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা ‘মেক আমেরিকা গ্রেট অ্যাগেইন’ বা ম্যাগা জোট মঙ্গলবারের মধ্যবর্তী নির্বাচনে বড় ধাক্কা খেয়েছে। এতে ২০২৮ সালের নির্বাচনে রিপাবলিকান দলের সম্ভাব্য প্রার্থীদের সামনে কঠিন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
দীর্ঘদিন ধরে ২০২৮ সালের নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার দৌড়ে এগিয়ে ছিলেন জেডি ভ্যান্স। মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে ট্রাম্পের সঙ্গে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি অঙ্গরাজ্যে সভা-সমাবেশেও অংশ নেন তিনি। এতে তাঁর প্রতি ট্রাম্পের সমর্থনের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়।
তবে নির্বাচনে রিপাবলিকানদের বিপর্যয়ের পর ট্রাম্পের কাছ থেকে নিজেকে কিছুটা দূরে রাখার চেষ্টা করেছেন ৪২ বছর বয়সী ভ্যান্স। বুধবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক দীর্ঘ পোস্টে নির্বাচনে পরাজয়ের জন্য ইরানের বিরুদ্ধে ট্রাম্পের অজনপ্রিয় যুদ্ধকে দায়ী করেন তিনি।
তবে ভোটাররা তাঁর এই অবস্থানকে কতটা গ্রহণ করবেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্টদের জন্য এ ধরনের পরিস্থিতি নতুন নয়। ২০২৪ সালের নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট প্রার্থী ও তৎকালীন ভাইস প্রেসিডেন্ট কমলা হ্যারিসও একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছিলেন। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেনের কাছ থেকে নিজেকে কীভাবে আলাদা করবেন—এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেছিলেন, ‘এমন কিছু মাথায় আসছে না।’
কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের জেমস লিন্ডসে বলেন, ভ্যান্সের জন্য উদ্বেগের বিষয় হলো, দায়িত্বে থাকা ভাইস প্রেসিডেন্টদের মধ্যে খুব কমই পরবর্তী সময়ে প্রেসিডেন্ট হতে পেরেছেন।
রিপাবলিকানদের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছেন ট্রাম্পের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওও। ৫৫ বছর বয়সী রুবিও মধ্যবর্তী নির্বাচনের প্রচারে তুলনামূলকভাবে কম সক্রিয় ছিলেন। তবে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তাদের পক্ষে ইরান যুদ্ধের দায় এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হতে পারে।
রিপাবলিকানদের নির্বাচনি বিপর্যয় দলের অন্য সম্ভাব্য প্রার্থীদের জন্যও সুযোগ তৈরি করেছে। ২০২৪ সালে দলীয় মনোনয়ন পেতে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা ফ্লোরিডার গভর্নর রন ডিস্যান্টিস সম্প্রতি বেশ সরব হয়েছেন।
৪৮ বছর বয়সী ডিস্যান্টিস ডেমোক্র্যাটদের বড় জয়কে ‘রাজনৈতিক ক্ষেত্রে উল্কাপাতের সমতুল্য’ বলে মন্তব্য করেছেন। একই সঙ্গে তিনি দাবি করেছেন, শুধু তাঁর নিজের অঙ্গরাজ্যেই রিপাবলিকানরা ডেমোক্র্যাটদের জয় ঠেকাতে পেরেছে।
টেক্সাসের সিনেটর টেড ক্রুজও প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা উড়িয়ে দেননি। ৫৫ বছর বয়সী এই নেতা ২০১৬ সালে ট্রাম্পের বিরুদ্ধে রিপাবলিকান দলের মনোনয়ন পাওয়ার লড়াইয়ে অংশ নিয়েছিলেন। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনে টেক্সাসে সিনেট ও গভর্নর পদে ডেমোক্র্যাটদের বড় জয় তাঁর সম্ভাবনার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে।
ডেমোক্র্যাট শিবিরে আত্মবিশ্বাস
২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে ডেমোক্র্যাট দলের সম্ভাব্য প্রার্থীর সংখ্যা বেশ বড়। তবে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল কয়েকজন নেতার অবস্থান আরও শক্ত করেছে।
জর্জিয়া থেকে সিনেটর হিসেবে পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় জন অসফকে ঘিরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে তাঁর সম্ভাব্য অংশগ্রহণ নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। ৩৯ বছর বয়সী এই নেতা ক্যামেরায় আকর্ষণীয় উপস্থিতি ও বক্তৃতার ধরনের কারণে ইতিমধ্যে নজর কেড়েছেন। ট্রাম্পের সঙ্গে এক তরুণ কর্মীর সম্পর্ক নিয়ে ব্যঙ্গ করেও আলোচনায় এসেছেন তিনি।
অসফ অবশ্য বলেছেন, প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়ে তাঁর ‘একেবারেই কোনো আগ্রহ নেই’। তবে জর্জিয়ায় দ্রুত বিজয় নিশ্চিত করা এবং বিজয়ী ভাষণ ডেমোক্র্যাট শিবিরে তাঁর অবস্থান আরও দৃঢ় করেছে।
মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে ৬২ বছর বয়সী কমলা হ্যারিস ডেমোক্র্যাট দলের সম্ভাব্য মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে এগিয়ে ছিলেন। তবে দলের অনেক নেতা এমন একজন প্রার্থী চান, যাঁর আগে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে পরাজয়ের অভিজ্ঞতা নেই।
পেনসিলভানিয়ার গভর্নর জশ শাপিরোর অবস্থানও মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর শক্ত হয়েছে। ৫৩ বছর বয়সী এই নেতা ২০২৪ সালে কমলা হ্যারিসের রানিং মেট বা ভাইস প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার জন্য সাক্ষাৎকার দিয়েছিলেন। মঙ্গলবার গুরুত্বপূর্ণ দোদুল্যমান অঙ্গরাজ্য পেনসিলভানিয়ায় বড় ব্যবধানে পুনর্নির্বাচিত হয়েছেন তিনি।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন ক্যালিফোর্নিয়ার বিদায়ী গভর্নর গ্যাভিন নিউসমও। ৫৯ বছর বয়সী এই নেতা নিয়মিত ট্রাম্পের সমালোচনা করে আসছেন। গত সেপ্টেম্বরে এএফপিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির পরিস্থিতি আগের মতো থাকবে না।
তবে কমলা হ্যারিসের মতো নিউসমকেও ডেমোক্র্যাট দলের পুরোনো নেতৃত্বের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে। দলটির ভেতরে নতুন প্রজন্মের নেতাদের সামনে আনার চাপও রয়েছে।
সম্ভাব্য প্রার্থীদের মধ্যে আরও রয়েছেন নিউইয়র্কের বামপন্থী কংগ্রেস সদস্য আলেকজান্দ্রিয়া ওকাসিও-কর্টেজ। ৩৭ বছর বয়সী এই নেত্রী সেপ্টেম্বরে প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করছেন বলে জানিয়েছিলেন। যুক্তরাষ্ট্রে ২০১৬ ও ২০২৪ সালের নির্বাচনে নারী প্রার্থীদের পরাজয়ের পর একজন লাতিনা নারী প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে জয়ী হতে পারবেন কি না, সে প্রশ্নও তুলেছিলেন তিনি।
এ ছাড়া সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় রয়েছেন শিকাগোর সাবেক মেয়র রাহম ইমানুয়েল, ইলিনয়ের গভর্নর জেবি প্রিটজকার, কেনটাকির গভর্নর অ্যান্ডি বেসিয়ার এবং অ্যারিজোনার সিনেটর ও সাবেক মহাকাশচারী মার্ক কেলি।
মঙ্গলবারের নির্বাচনে তৃতীয় মেয়াদে জয়ী হওয়ার পর জেবি প্রিটজকার যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বিস্তৃত জাতীয় কর্মপরিকল্পনাও তুলে ধরেছেন।
সব মিলিয়ে মধ্যবর্তী নির্বাচনের ফল ২০২৮ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন ঘিরে রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—উভয় শিবিরেই নতুন হিসাব-নিকাশের জন্ম দিয়েছে। তবে দলীয় মনোনয়ন ও চূড়ান্ত প্রার্থী নির্ধারণে এখনো অনেক পথ বাকি।
তথ্যসূত্র: এএফপি
