পদত্যাগ পত্রে যা লিখলেন সামান্তা শারমিন
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ০৭:৩৫ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক পদ থেকে পদত্যাগ করেছেন সামান্তা শারমিন। দলটির রাজনৈতিক অবস্থান, জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোট, নির্বাচনী কৌশল, রাজনীতিতে নারীর অধিকার এবং অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে মতপার্থক্যের কারণে তিনি এ সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে নিজেই পদত্যাগের বিষয়টি জানান সামান্তা শারমিন। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রে এনসিপির রাজনৈতিক অবস্থান ও সাংগঠনিক কার্যক্রম নিয়ে নিজের অসন্তোষের কারণগুলো তুলে ধরেন তিনি।
পদত্যাগপত্রে সামান্তা শারমিন জানান, প্রায় এক বছর আগে থেকেই এনসিপির জোট গঠনের প্রশ্নে তিনি ভিন্ন অবস্থান নিয়েছিলেন। তাঁর মতে, জামায়াতে ইসলামী নীতিগত ও কৌশলগত কোনো দিক থেকেই সংস্কারের উপযুক্ত অংশীদার নয়। দলটির সঙ্গে জোট করলে এনসিপিকে বড় রাজনৈতিক মূল্য দিতে হবে বলেও তিনি সতর্ক করেছিলেন।
তিনি আরও জানান, গত ১১ মাসে দলের অতীত কর্মকাণ্ড ও ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লিখিত অভিযোগ ও প্রস্তাব দিয়েছেন। পাশাপাশি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা ও বিতর্কের মাধ্যমে এনসিপিকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করেছেন। তবে তাঁর এসব প্রচেষ্টা সফল হয়নি।
পদত্যাগপত্রে সামান্তা শারমিন মূলত চারটি বিষয়ে নিজের আপত্তি ও অসন্তোষের কথা তুলে ধরেছেন।
জামায়াতের সঙ্গে জোট নিয়ে আপত্তি
সামান্তা শারমিনের অভিযোগ, এনসিপি সংস্কারের রাজনীতি থেকে সরে এসে জামায়াতে ইসলামীর সঙ্গে জোটের পথে এগোচ্ছে। তাঁর মতে, জামায়াত সাংবিধানিক, আইনি ও রাজনৈতিক সংস্কারের প্রকৃত রাজনীতি ধারণ করে না। বরং দলটির সঙ্গে জোটের কারণে এনসিপির নিজস্ব রাজনৈতিক পরিচয় ও অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ছে।
নির্বাচনী কৌশল নিয়ে অসন্তোষ
২০২৬ সালের নির্বাচনকে কেবল ক্ষমতা পরিবর্তনের নির্বাচন হিসেবে না দেখে রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ হিসেবে বিবেচনা করার পক্ষে ছিলেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, পুরোনো রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জোট না করে এককভাবে নির্বাচনে অংশ নেওয়া কিংবা বিকল্প রাজনৈতিক কৌশল গ্রহণ করলে এনসিপি আরও বেশি রাজনৈতিক প্রভাব তৈরি করতে পারত। কিন্তু বড় রাজনৈতিক দলের সঙ্গে জোট করে দলটি নিজস্ব রাজনীতির সম্ভাবনা নষ্ট করেছে।
এ প্রসঙ্গে শহীদ ওসমান হাদির মৃত্যুর ঘটনাকে বড় দলের সঙ্গে জোট করার কারণ হিসেবে ব্যবহারেরও সমালোচনা করেন তিনি। তাঁর দাবি, হাদি ঢাকার একটি ঝুঁকিপূর্ণ আসনে এককভাবে নির্বাচনী প্রচারণা চালিয়েছিলেন। অথচ তাঁর মৃত্যুর ঘটনাকে জোটের পক্ষে যুক্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে, যা অযৌক্তিক ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।
রাজনীতিতে নারীর অধিকার ও অংশগ্রহণ
২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানে নারীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা তুলে ধরে সামান্তা শারমিন বলেন, আন্দোলনে নারীরা সম্মুখসারির যোদ্ধা ও রক্ষাকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও বিজয়ের পর তাঁদের রাজনৈতিক অধিকার, মর্যাদা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা উপেক্ষা করা হয়েছে।
তাঁর অভিযোগ, এনসিপি নারীর নেতৃত্ব ও রাজনৈতিক অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার পরিবর্তে রক্ষণশীল রাজনৈতিক প্রবণতার সঙ্গে আপস করেছে। এতে গণ-অভ্যুত্থানের বৈষম্যবিরোধী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক চেতনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কাউন্সিল ছাড়াই দল পুনর্গঠন
এনসিপির অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন সামান্তা শারমিন। তাঁর মতে, কাউন্সিল আয়োজন না করে পুনরায় আহ্বায়ক কমিটি পুনর্গঠন দলের গণতান্ত্রিক চর্চা ও জবাবদিহিকে দুর্বল করেছে। নেতৃত্ব নির্বাচনের আগে এ ধরনের বড় সাংগঠনিক পরিবর্তন দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।
তিনি প্রশ্ন তোলেন, যে দল নিজেদের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক নেতৃত্ব নির্বাচন নিশ্চিত করতে পারে না, সেই দলের পক্ষে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে গণতন্ত্র ও নিরপেক্ষতার দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য?
পদত্যাগপত্রের শেষ অংশে সামান্তা শারমিন জানান, এসব বিষয়ে বারবার পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানালেও এনসিপি নিজেদের রাজনৈতিক গতিপথ পরিবর্তনে আগ্রহ দেখায়নি। এ কারণে প্রায় এক বছরের অভ্যন্তরীণ মতাদর্শিক লড়াইয়ের ইতি টেনে দল থেকে পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
