ঝালকাঠিজুড়ে ক্ষোভ
‘আ.লীগ-জাতীয় পার্টি’র লোকজন নিয়ে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী
ঝালকাঠি প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৬ পিএম
মিছিলের সামনে পাঞ্জাবি পড়া আওয়ামী লীগের সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের একান্ত সচিব আতিকুর রহমান রুবেল। ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রাম, মামলা-হামলা, গ্রেপ্তার ও নির্যাতনের পর বিএনপি রাষ্ট্রক্ষমতায় এলেও ঝালকাঠিতে দলের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতাকর্মীরা মূল্যায়িত হচ্ছেন না—এমন অভিযোগ উঠেছে দলটির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর আলোচনা সভায়। বরং আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীদের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে পুনর্বাসন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীরা।
এ নিয়ে দলের তৃণমূল পর্যায়ে ক্ষোভ ও অসন্তোষ ক্রমেই বাড়ছে। বিশেষ করে সম্প্রতি ঝালকাঠি জেলা জজ আদালতে সরকারি আইন কর্মকর্তা নিয়োগকে কেন্দ্র করে দলের তৃণমূল নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে বলে সভায় বক্তারা জানান। তাদের অভিযোগ, দলের দুঃসময়ে যারা রাজপথে ছিলেন, মামলা-মোকদ্দমা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং বছরের পর বছর দলের জন্য কাজ করেছেন, গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদেরই এখন উপেক্ষা করা হচ্ছে।
আরও পড়ুন: অসুস্থতায় জন্য মিড সেমিস্টার পরীক্ষা না দিলে শিক্ষার্থীকে গুণতে হবে জরিমানা
মঙ্গলবার (২ সেপ্টেম্বর) ঝালকাঠি শিল্পকলা একাডেমির মিলনায়তনে বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত আলোচনা সভায় দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরা এসব অভিযোগ ও ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

সভায় বক্তারা বলেন, দীর্ঘদিন যারা দলের দুর্দিনে মাঠে ছিলেন, আন্দোলন-সংগ্রাম করেছেন, হামলা-মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, এখন বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদ ও দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। বিপরীতে অতীতে আওয়ামী লীগ কিংবা জাতীয় পার্টির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন—এমন অনেকেই প্রভাবশালী হয়ে উঠছেন বলে অভিযোগ করেন তারা।
জেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট সৈয়দ হোসেনের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর স্বাস্থ্য বিষয়ক বিশেষ সরকারি সহকারী ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার। বিশেষ অতিথি ছিলেন ঝালকাঠি-২ আসনের সংসদ সদস্য ইশরাত সুলতানা ইলেন ভুট্টো। জেলা বিএনপির সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট শাহাদাত হোসেনের সঞ্চালনায় সভায় ক্ষোভ প্রকাশ করে বক্তব্য দেন ঝালকাঠি সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি এজাজ আহমেদ, সাধারণ সম্পাদক খোকন মল্লিক, পৌর বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল হাসান, জেলা বিএনপির সদস্য অ্যাডভোকেট শামীম আলম ও অ্যাডভোকেট মিজানুর রহমান মুবিনসহ আরও অনেকে। দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীরাও বক্তব্য রাখেন। বক্তারা মূলত দলের বর্তমান নেতৃত্বের উদ্দেশে তাদের ক্ষোভ ও অসন্তোষ তুলে ধরেন।
‘আওয়ামী লীগ-জাতীয় পার্টি পুনর্বাসিত, বঞ্চিত বিএনপির ত্যাগীরা’
সভায় বক্তব্য দিতে গিয়ে সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয়তাবাদী মহিলা দলের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি জীবা আমীনা আল গাজী বলেন, “আপনারা নির্যাতিত ছিলেন, আমিও নির্যাতিত হয়েছি। ১৮ বছর আমরা সবাই নির্যাতিত হয়েছি। যা শুনছি এবং দেখছি, আসলে এটা দুঃখের বিষয়।” তিনি বলেন, “আওয়ামী লীগ পুনর্বাসন হচ্ছে, জাতীয় পার্টি পুনর্বাসন হচ্ছে, কিন্তু বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা কোথাও ঠাঁই পাচ্ছেন না। দল ক্ষমতায় এসেছে, কিন্তু সুবিধা ভোগ করছে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টির নেতাকর্মীরা—এটা হতে দেওয়া যায় না।”
ঝালকাঠিতে বিএনপির নেতাকর্মীরা অবহেলিত হচ্ছেন উল্লেখ করে তিনি দলের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বে থাকা নেতাদের তৃণমূলের নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের আহ্বান জানান। বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দলের জাতীয় কমিটির সভায় নেতাকর্মীদের মূল্যায়নের বিষয়ে নির্দেশনা দিয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি। জীবা আমীনা আল গাজী আরও বলেন, দলের তৃণমূলের নেতাকর্মীরা অভিযোগ করছেন, আওয়ামী লীগের ঠিকাদারদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে তাদের কাজ দেওয়া হচ্ছে, অথচ বিএনপির কাউকে মূল্যায়ন করা হচ্ছে না।
রাজাপুরেও ‘বঞ্চিত’ ত্যাগীরা, উঠেছে ‘১১ খলিফা’র অভিযোগ
অপরদিকে রাজাপুর ও কাঁঠালিয়া উপজেলাতেও একই চিত্র বলে অভিযোগ করেছেন বিএনপির তৃণমূলের নেতাকর্মীরা। অভিযোগ রয়েছে, ঝালকাঠি-১ আসনের এমপি রফিকুল ইসলাম জামালের ‘১১ খলিফা’ খেতাব পাওয়া যুবদলের লোকজনই সবকিছু করে বেড়াচ্ছেন। অন্য কাউকে কোনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
রাজাপুর উপজেলায় বিএনপির ৪৮তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে প্রস্তুতি আলোচনা সভায় শুধু উপজেলা বিএনপির সিনিয়র সহ-সভাপতি আব্দুল হক নান্টু এবং উপজেলা যুবদলের নেতাকর্মীদের নিয়ে কর্মসূচি করা হয় বলে অভিযোগ উঠেছে। এরপর বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মূল অনুষ্ঠানেও উপজেলা বিএনপির পদধারী কাউকে দাওয়াত দেওয়া হয়নি। এমনকি অনুষ্ঠানের ব্যানারেও কারও নাম রাখা হয়নি বলে অভিযোগ করেন উপজেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক সুমন হক জুয়েল।
তিনি বলেন, দলের দুর্দিনে যারা ছিল, তাদের কোনো মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। যারা আওয়ামী লীগের আমলে বিএনপি ছেড়ে শাহজাহান ওমরের সঙ্গে নৌকার নির্বাচন করেছে, আওয়ামী লীগ করেছে—এখন সেই সব বহিষ্কৃত নেতাকর্মী এবং আওয়ামী লীগের লোকজন নিয়ে প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী পালন করা হচ্ছে। অথচ দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের জানানো হয় না।

‘অসাংগঠনিক কার্যক্রমের’ প্রতিবাদে যুবদল নেতার রাজনীতি থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা
এদিকে রাজাপুর উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক ওমর ফারুক সুমন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে দেওয়া এক পোস্টে বর্তমান উপজেলা বিএনপি ও যুবদলের রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
পোস্টে তিনি লেখেন, “নিজের ব্যক্তিত্ব ও সম্মানের কথা বিবেচনা করে এবং অসাংগঠনিক কার্যক্রমের প্রতি তীব্র নিন্দা ও ঘৃণা ব্যক্ত করে বর্তমান উপজেলা বিএনপি এবং যুবদলের সকল রাজনীতি থেকে নিজেকে সরিয়ে নিলাম। ভবিষ্যতে যদি কখনো সাংগঠনিক রাজনীতি চর্চা শুরু হয় তখন আবার ফিরবো ইনশাআল্লাহ!” তার এমন ঘোষণাকে কেন্দ্র করেও দলের তৃণমূল পর্যায়ে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে।
কাঁঠালিয়াতেও আওয়ামী লীগ নেতাকে বিএনপির পদ দেওয়ার অভিযোগ
অপরদিকে কাঁঠালিয়া উপজেলাতেও একই ধরনের অভিযোগ উঠেছে। বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মীদের অভিযোগ, ঝালকাঠি জেলা ওলামা লীগের সদস্য সচিব ক্বারি নেয়ামত উল্লাহকে ৫ আগস্টের পরে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির ধর্ম বিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল এমপি বিএনপিতে এনে কাঁঠালিয়া উপজেলা ওলামা দলের আহ্বায়ক বানান। এছাড়া আওয়ামী লীগের সাবেক প্রাথমিক ও গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রী জাকির হোসেনের একান্ত সচিব আতিকুর রহমান রুবেলকেও বিএনপিতে এনে রফিকুল ইসলাম জামাল বিভিন্ন সময় প্রোগ্রাম করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আতিকুর রহমান রুবেলের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের আমলে নৌকার মিছিলের ব্যানার এবং বিএনপির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মিছিলে ব্যানারের সামনে একই রঙের পাঞ্জাবি পরা ছবি বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে তাদের ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
‘নির্যাতিতদের পুনর্বাসন করা হবে’—ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার
তবে অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডা. জিয়াউদ্দিন হায়দার বলেন, নির্যাতিত নেতা-কর্মীদের তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। তালিকা অনুযায়ী নেতা-কর্মীদের সরকারি-বেসরকারি চাকরিসহ পুনর্বাসন করা হবে।
তিনি বলেন, “আমাদের মধ্যে বিভেদ ভুলে যেতে হবে। দলের সকল পর্যায়ের নেতা-কর্মী পর্যায়ক্রমে মূল্যায়ন করা হবে। জেলাকে ঢেলে সাজানো হবে।”
দলের ভেতরে তৃণমূলের অভিযোগ, ত্যাগীদের বঞ্চিত করা এবং অন্য দল থেকে আসা নেতাকর্মীদের পুনর্বাসনের যে অভিযোগ উঠেছে, তা এখন ঝালকাঠির বিএনপির রাজনীতিতে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে।প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীর মতো দলীয় ঐক্যের কর্মসূচিতেই প্রকাশ্যে এমন ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকে সাংগঠনিক নেতৃত্বের জন্য গুরুত্বপূর্ণ বার্তা হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
