লোডশেডিং ও ‘ভুতুড়ে’ বিদ্যুৎ বিলে অতিষ্ঠ মেহেন্দিগঞ্জবাসী
মেহেন্দিগঞ্জ (বরিশাল) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৩ পিএম
ছবি : ভোরের কাগজ
তীব্র লোডশেডিংয়ের কবলে বিপর্যস্ত মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার জনজীবন। ২৪ ঘণ্টার মধ্যে গড়ে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকলেও বাকি সময় বিদ্যুৎ ছাড়াই চলতে হচ্ছে এ জনপদের সাধারণ মানুষকে। উপজেলায় প্রায় ৫ লাখ মানুষের বসবাস এবং বিদ্যুতের গ্রাহকসংখ্যা প্রায় ৫৫ হাজার।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শীতকাল ছাড়া বছরের অন্য সময় কখনোই নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সেবা দেখেনি এ অঞ্চলের মানুষ। সামান্য বৃষ্টি হলেই বিদ্যুৎ চলে যায়। আর ঝড় বা বন্যা হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে দুই থেকে তিন দিন, কখনো তারও বেশি সময় লাগে। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ব্যবসা-বাণিজ্য, শিক্ষা কার্যক্রম ও কৃষি উৎপাদন। বিদ্যুতের অভাবে পৌরসভার পানি সরবরাহও বন্ধ থাকায় বিশুদ্ধ পানির সংকট দেখা দিয়েছে।
উপজেলায় যাতায়াতের প্রধান বাহন অটোরিকশা, যা পুরোপুরি বিদ্যুৎনির্ভর। কিন্তু বিদ্যুৎ সংকটের কারণে সড়কে অটোরিকশার সংখ্যা কমে গেছে। ফলে বিকল্প যানবাহন ব্যবহার করতে গিয়ে যাত্রীদের গুনতে হচ্ছে অতিরিক্ত ভাড়া।
ঘন ঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটের পাশাপাশি বাড়তি বিদ্যুৎ বিল নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে গ্রাহকদের মধ্যে। তাদের অভিযোগ, আগের তুলনায় বিদ্যুৎ ব্যবহার কম হলেও বিল আসছে দ্বিগুণ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে তিনগুণ পর্যন্ত।
স্থানীয় বাসিন্দা জাহিদ হাসান জানান, জুন মাসে তার বিদ্যুৎ বিল ছিল ৫৫৮ টাকা। কিন্তু জুলাই মাসে বিল আসে ২ হাজার ২৭৭ টাকা। পরে মিটারের রিডিং মিলিয়ে অফিসে গেলে জানা যায়, ১০০ ইউনিট বেশি লেখা হয়েছিল। বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে আনার পর বিল সংশোধন করা হয়।
অটোরিকশাচালক উজ্জ্বল বলেন, ‘আমাদের অটোরিকশা পুরোপুরি বিদ্যুৎনির্ভর। একটানা ৪ থেকে ৬ ঘণ্টা চার্জ দিতে পারলে পরদিন রাস্তায় নামতে পারি। কিন্তু রাতেও টানা দুই ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকে না। চার্জ সম্পূর্ণ না হওয়ায় গাড়ি চালাতে পারছি না। ফলে পরিবারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে।’
শিক্ষার্থী বর্ণা বলেন, ‘অনার্স প্রথম বর্ষ ও এইচএসসি পরীক্ষা চলমান। এমন সময়ে ধারাবাহিক লোডশেডিংয়ের কারণে পড়াশোনায় মারাত্মক ব্যাঘাত ঘটছে। পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়াও কঠিন হয়ে পড়েছে।’
স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী মাহিন বাপ্পী বলেন, ‘রেস্টুরেন্টের বেশিরভাগ যন্ত্রপাতি বিদ্যুৎচালিত। বিদ্যুৎ না থাকলে সেগুলো চালানো যায় না। গত এক সপ্তাহে খাবার বিক্রি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। এতে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছি।’
মেহেন্দিগঞ্জ কম্পিউটার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি মুরাদ চৌধুরী বলেন, ‘আমাদের সব কাজই বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেটনির্ভর। বিদ্যুৎ না থাকায় ব্যবসায় বড় ধরনের ক্ষতি হচ্ছে। অনেকটা অলস সময় কাটাতে হচ্ছে।’
ফার্মেসি মালিক শরীফ হাসান বলেন, ‘এখন আর বিদ্যুৎ যায় না, মাঝেমধ্যে আসে। ১০ মিনিট বিদ্যুৎ থাকলে আবার দুই ঘণ্টা লোডশেডিং থাকে। অসুস্থ মানুষ চিকিৎসা নিতে এলেও বিদ্যুতের অভাবে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা যায় না। সব মিলিয়ে চরম দুর্ভোগ তৈরি হয়েছে।’
এ বিষয়ে মেহেন্দিগঞ্জ আঞ্চলিক বিদ্যুৎ অফিসের ডেপুটি জেনারেল ম্যানেজার মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘৫৫ হাজার গ্রাহকের জন্য বিদ্যুতের চাহিদা ১১ মেগাওয়াট। কিন্তু আমরা পাচ্ছি মাত্র ৫ মেগাওয়াট। এ কারণেই লোডশেডিং হচ্ছে।’
অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিলের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘সরকার নির্ধারিত বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির কারণে বিল কিছুটা বেড়েছে। তবে কারও যদি মনে হয় তার বিল অস্বাভাবিক এসেছে, তাহলে অফিসে যোগাযোগ করলে আমরা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।’
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রায় ৫৭ কিলোমিটার দূর থেকে তিনটি নদীর তলদেশ দিয়ে মেহেন্দিগঞ্জে বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হয়। ফলে যেকোনো একটি স্থানে সমস্যা হলে পুরো উপজেলার বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কাজিরহাট এলাকায় একটি বিদ্যুৎ গ্রিড নির্মাণ করা গেলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব।’
