×

জাতীয়

টিআইবির গবেষণা

রাজনৈতিক দলের এত টাকা আসে কোথা থেকে?

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০১ নভেম্বর ২০২৬, ১১:২৬ পিএম

রাজনৈতিক দলের এত টাকা আসে কোথা থেকে?

ছবি : সংগৃহীত

দেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় বছরে কয়েকশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে। ইউনিয়ন পর্যায় পর্যন্ত পূর্ণাঙ্গ সাংগঠনিক কাঠামো থাকলে একটি দলের সম্ভাব্য বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত শাখা বিস্তৃত হলে এই ব্যয় বেড়ে এক হাজার ৫৩২ থেকে দুই হাজার ১৮৮ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

অথচ সদস্যদের কাছ থেকে চাঁদা সংগ্রহ করে এই বিপুল ব্যয়ের সামান্য অংশই মেটানো সম্ভব। অন্যদিকে, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রকাশিত আয়-ব্যয়ের হিসাবের সঙ্গে সম্ভাব্য ব্যয়ের বড় ধরনের ব্যবধান রয়েছে। ফলে দলগুলোর অর্থের উৎস ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) প্রকাশিত এক গবেষণা প্রতিবেদনে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়নের এমন চিত্র উঠে এসেছে।

রোববার রাজধানীর ধানমন্ডিতে টিআইবির কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলের প্রাতিষ্ঠানিক সুশাসন’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়। এতে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থায়ন, অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র, নেতৃত্ব নির্বাচন, প্রার্থী মনোনয়ন এবং অনিয়ম-দুর্নীতি প্রতিরোধের বিভিন্ন দিক তুলে ধরা হয়েছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্যের কারণে দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। এর ফলে রাজনীতিতে ব্যক্তি ও পরিবারকেন্দ্রিক প্রবণতা বাড়ছে। পাশাপাশি দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি, গণতান্ত্রিক চর্চা ও অন্তর্ভুক্তির ঘাটতি রয়েছে।

সাংগঠনিক ব্যয় ছাড়াতে পারে দুই হাজার কোটি টাকা

গবেষণায় রাজনৈতিক দলগুলোর কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে সাংগঠনিক কাঠামো পরিচালনার সম্ভাব্য ব্যয় নিরূপণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, নির্বাচন কমিশনের নিবন্ধনের শর্ত পূরণ করে ন্যূনতম ২২টি জেলা ও ১০১টি উপজেলায় কার্যালয় ও কার্যক্রম পরিচালনা করতে একটি দলের বছরে প্রায় ১৪ থেকে ২০ কোটি টাকা ব্যয় হতে পারে।

অন্যদিকে, সব জেলা, মহানগর, উপজেলা, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পর্যায়ে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা করলে বার্ষিক ব্যয় দাঁড়াতে পারে ৩০২ থেকে ৩৯৩ কোটি টাকা। আর ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত শাখা বিস্তৃত হলে সম্ভাব্য ব্যয়ের পরিমাণ বেড়ে এক হাজার ৫৩২ থেকে দুই হাজার ১৮৮ কোটি টাকা হতে পারে।

এত বিপুল ব্যয়ের বিপরীতে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় তুলনামূলকভাবে অনেক কম। গবেষণায় বলা হয়েছে, ওয়ার্ড পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামোর ক্ষেত্রে সদস্যদের চাঁদা থেকে সম্ভাব্য আয় ১১৬ কোটি টাকা। অর্থাৎ শুধু সদস্যদের চাঁদার ওপর নির্ভর করে দলগুলোর সাংগঠনিক ব্যয় নির্বাহ করা সম্ভব নয়। এ পরিস্থিতিতে অর্থের অন্যান্য উৎস এবং সেগুলোর ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরতা

টিআইবির গবেষণায় বলা হয়েছে, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন ও কার্যক্রম পরিচালনার বিদ্যমান ব্যবস্থা দলগুলোর মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পৃষ্ঠপোষকতার প্রবণতা তৈরি করছে। ফলে সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনায় ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে।

প্রতিবেদনে রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিক উৎসের প্রাধান্যকে দলগুলোর অভ্যন্তরীণ সুশাসনের বড় বাধা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর ফলে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অভ্যন্তরীণ কোন্দল বাড়ার সুযোগ তৈরি হচ্ছে।

সংবাদ সম্মেলনে টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন, দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা এবং নির্বাচনে অংশগ্রহণ অতিমাত্রায় অর্থনির্ভর হয়ে পড়ায় দলগুলো ব্যবসায়ী ও বিত্তশালীদের ওপর নির্ভরশীল হচ্ছে।

তিনি বলেন, রাজনৈতিক অর্থায়নে ব্যক্তিনির্ভরতা ও অনানুষ্ঠানিকতার কারণে প্রভাবশালী দলগুলোতে ক্ষমতার অপব্যবহার, কালো টাকার প্রভাব, দুর্বৃত্তায়ন ও অন্তর্দ্বন্দ্ব বিকশিত হচ্ছে। এতে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতাকেন্দ্রিক ‘বিজনেস মডেলে’ পরিণত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে।

আর্থিক নীতিমালা নেই, প্রকাশিত হয় না নিরীক্ষিত হিসাব

গবেষণায় দেখা গেছে, কোনো কোনো রাজনৈতিক দলের নিজস্ব আর্থিক নীতিমালা ও কার্যপ্রণালি বিধি নেই। দলগুলোর গঠনতন্ত্রে সদস্যদের পদভেদে চাঁদার পরিমাণ, অনুদান গ্রহণের শর্ত, মনোনয়ন ফরমের ফি, হিসাব সংরক্ষণ, আর্থিক লেনদেন, ক্রয়, নিরীক্ষা ও আর্থিক জবাবদিহির বিষয়ে নির্দেশনা অস্পষ্ট।

এ ছাড়া দলগুলো নিয়মিত বার্ষিক বাজেট প্রণয়ন করে না। তাদের প্রকৃত বার্ষিক আয়-ব্যয়ের নিরীক্ষিত প্রতিবেদনও দলীয়ভাবে কিংবা নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে প্রকাশ করা হয় না। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর অর্থের প্রকৃত উৎস, অর্থ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং ব্যয়ের খাত সম্পর্কে সাধারণ মানুষের জানার সুযোগ সীমিত থাকছে।

নেতৃত্ব নির্বাচনে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি

রাজনৈতিক দলগুলোর অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র চর্চার ক্ষেত্রেও নানা সীমাবদ্ধতা পেয়েছে টিআইবি। গবেষণায় দেখা গেছে, অধিকাংশ দল জাতীয় কাউন্সিলের মাধ্যমে দলীয় প্রধান নির্বাচন করলেও গোপন ব্যালটের পরিবর্তে কণ্ঠভোটে নেতৃত্ব নির্বাচন করে। দলীয় প্রধান পদে একাধিক প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতার চর্চাও খুব একটা নেই। মাত্র দুটি দলে একাধিক প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী পাওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে।

গবেষণায় অন্তর্ভুক্ত ১০টি রাজনৈতিক দলে পরিবারকেন্দ্রিক নেতৃত্বের নজির রয়েছে। ১২টি দলের প্রধান ১০ বছর বা তার বেশি সময় ধরে একই পদে দায়িত্ব পালন করছেন। অধিকাংশ দলের গঠনতন্ত্রে একজন ব্যক্তি কতবার বা কত মেয়াদে দলীয় প্রধান থাকতে পারবেন, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট কোনো সীমা নেই।

এ ছাড়া তিনটি দলের কেন্দ্রীয় কমিটির মেয়াদ এবং একটি দলের কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া গঠনতন্ত্রে উল্লেখ করা হয়নি। ১৬টি দলের জাতীয় কাউন্সিল অনিয়মিতভাবে অনুষ্ঠিত হয়। এসব কাউন্সিলে অনেক ক্ষেত্রে আগে থেকে নির্ধারিত সিদ্ধান্ত অনুমোদনের প্রবণতা দেখা যায়।

প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ ও প্রভাবের ভূমিকা

নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রেও স্বচ্ছতার ঘাটতি পেয়েছে গবেষক দল। অধিকাংশ রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা ও অযোগ্যতার শর্ত স্পষ্টভাবে উল্লেখ নেই। ছয়টি দলের গঠনতন্ত্রে জনপ্রিয়তা, সততা ও দলের প্রতি আনুগত্যের মতো বিষয় থাকলেও সেগুলোর সুনির্দিষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।

গবেষণায় প্রভাবশালী রাজনৈতিক দলগুলোর প্রার্থী মনোনয়নে অর্থ-প্রতিপত্তি ও ব্যবসায়ীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। তিনটি প্রভাবশালী দলে প্রার্থী বাছাইয়ের ক্ষেত্রে মনোনয়ন-বাণিজ্যের অভিযোগও পাওয়া গেছে। পাশাপাশি বিগত পাঁচটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ব্যবসায়ী প্রার্থী ও ব্যবসায়ী সংসদ সদস্যদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি লক্ষ্য করেছে গবেষক দল।

রাজনৈতিক দলগুলোর সুশাসনে টিআইবির ১২ সুপারিশ

রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন নিশ্চিত করতে গবেষণা প্রতিবেদনে ১২ দফা সুপারিশ করেছে টিআইবি। এর মধ্যে রয়েছে গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও), ১৯৭২ এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা, ২০০৮-এর প্রয়োজনীয় সংশোধন; রাজনৈতিক দলগুলোকে তথ্য অধিকার আইনের আওতায় আনা এবং নির্বাচন কমিশনের মাধ্যমে দলগুলোর আর্থিক হিসাব যাচাই ও সাংগঠনিক কার্যক্রমের তদারকি বাড়ানো।

এ ছাড়া নির্বাচন কমিশনের তালিকাভুক্ত চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্ট ফার্মের মাধ্যমে রাজনৈতিক দলগুলোর আর্থিক লেনদেন নিরীক্ষা, নিয়মিত কাউন্সিল আয়োজন এবং প্রতিটি পর্যায়ের নেতৃত্ব গোপন ভোটে নির্বাচনের সুপারিশ করা হয়েছে। দলীয় প্রধানসহ নেতৃত্বস্থানীয় পদে একই ব্যক্তির দায়িত্ব পালনের মেয়াদ নির্দিষ্ট করার কথাও বলা হয়েছে।

পাশাপাশি দলীয় নেতৃত্ব নির্বাচন ও নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়নের ক্ষেত্রে নারী এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার সুপারিশ করেছে সংস্থাটি।

ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, রাজনৈতিক দলগুলোর প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রমে সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য অভ্যন্তরীণ সংস্কার অপরিহার্য। এ সংস্কারের দায়িত্ব রাজনৈতিক দলগুলোকেই নিতে হবে। গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎ ও জনগণের আস্থা অর্জনে দলগুলোকে নিজেদের মৌলিক সংস্কারের বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।

গবেষণার জন্য মোট ৪২টি রাজনৈতিক দলের সঙ্গে যোগাযোগ করে টিআইবি। এর মধ্যে ৩৭টি নিবন্ধিত এবং পাঁচটি অনিবন্ধিত দল। ৩২টি দল গবেষকদের তথ্য দিয়েছে। গবেষণার তথ্যের সময়সীমা ২০০৮ সালে রাজনৈতিক দলের নিবন্ধন কার্যক্রম শুরুর পর থেকে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ক্ষেত্রবিশেষে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যও ব্যবহার করা হয়েছে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাশেদ খাঁনের সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় ডিআরইউর নিন্দা

রাশেদ খাঁনের সংবাদপত্র ছিঁড়ে ফেলার ঘটনায় ডিআরইউর নিন্দা

প্রাইজবন্ডের ছয় লাখ টাকা জিতল যে নম্বর

প্রাইজবন্ডের ছয় লাখ টাকা জিতল যে নম্বর

রাজনৈতিক দলের এত টাকা আসে কোথা থেকে?

টিআইবির গবেষণা রাজনৈতিক দলের এত টাকা আসে কোথা থেকে?

নারীসহ ভিডিও ভাইরাল, অব্যাহতিপ্রাপ্ত জামায়াত নেতার বাড়ি ভাঙচুর

নারীসহ ভিডিও ভাইরাল, অব্যাহতিপ্রাপ্ত জামায়াত নেতার বাড়ি ভাঙচুর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App