×

চট্টগ্রাম

১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ডিসির সিদ্ধান্ত, বলির শিকার চার সন্তানের জননী

Icon

মেঘনা (কুমিল্লা) প্রতিনিধি

প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:২৯ পিএম

১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি ডিসির সিদ্ধান্ত, বলির শিকার চার সন্তানের জননী

ফাইল ছবি

দীর্ঘ ১৮ বছরেও বাস্তবায়ন হয়নি কুমিল্লার তৎকালীন জেলা প্রশাসকের দেওয়া সিদ্ধান্ত। মেঘনা ও পাশ্ববর্তী তিতাস উপজেলার কয়েকটি মৌজার সীমানা বিরোধ নিরসনে ২০০৮ সালে জেলা প্রশাসনের সমন্বয় সভায় পুনঃজরিপ, সীমানা পিলার স্থাপনসহ একাধিক সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও দীর্ঘ সময়েও তা বাস্তবায়িত হয়নি।

জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের এসএ শাখার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৮ সালের স্মারক ও সভার কার্যবিবরণী পর্যালোচনায় দেখা যায়, মেঘনা উপজেলার ১৪৬ নম্বর ব্রাহ্মণচর এবং তিতাস উপজেলার ২০৭ নম্বর মোহনপুর ও ১৫০ নম্বর দক্ষিণ সাতানি মৌজার সীমানা নিয়ে দীর্ঘদিনের জটিলতা নিরসনে এসব সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। সভায় সিএস ম্যাপের ভিত্তিতে পুনঃজরিপ, প্রয়োজন অনুযায়ী বিএস জরিপ বাতিল বা সংশোধন এবং সীমানা পিলার স্থাপনের সুপারিশ করা হয়।

তবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পরও সমস্যার স্থায়ী সমাধান হয়নি। বরং ২০০৮ সালের পরের নথিতেও সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম সম্পন্ন না হওয়ার বিষয়টি উঠে এসেছে। জোনাল সেটেলমেন্ট অফিস, কুমিল্লা জোনের এক চিঠিতে জেলা প্রশাসকের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট মৌজাগুলোর সীমানা নির্ধারণের কার্যক্রম না হওয়ার কথা উল্লেখ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হয়। ২০১০ সালের ১৪ ডিসেম্বর তিতাস উপজেলা ভূমি অফিস থেকেও জানানো হয়, তিতাস উপজেলার চরকাঠালিয়া প্রকাশ্য চরবাটেরা গ্রামের বাসিন্দাদের বন্দোবস্তকৃত ভূমি মেঘনা উপজেলায় হওয়ায় দখল বুঝিয়ে দেওয়ার কার্যক্রমে জটিলতা রয়েছে।


এই দীর্ঘদিনের অমীমাংসিত বিরোধ নিয়ে স্থানীয় একাধিক বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে মেঘনা ও তিতাস উপজেলার মানুষের মধ্যে জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ চলে আসছে। প্রশাসনের একাধিক দপ্তরের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব এবং সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই বিরোধটি বছরের পর বছর ধরে জিইয়ে আছে। এই বিরোধের জেরেই দুই উপজেলার বাসিন্দাদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনাও ঘটছে।

গত ১৬ জুন দুই পক্ষের সংঘর্ষে দুই উপজেলার অন্তত ৪০ জন আহত হন। এরপর ২৬ জুলাই মেঘনা উপজেলার চর বিনোদপুর এলাকায় হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনায় ৩৮ বয়সী কুহিনূর আক্তার নামে এক নারী নিহত হন। তিনি ছিলেন চর বিনোদপুর গ্রামের কাবিল মিয়ার স্ত্রী ও চার সন্তানের জননী। ওই ঘটনায় আরও অন্তত ৩০ জন আহত হন। তিতাস উপজেলার চরকাঠালিয়া, প্রকাশ্য চরবাটেরা ও আশপাশের কয়েকটি গ্রামের লোকজনের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। তাঁদের প্রশ্ন, ২০০৮ সালে জেলা প্রশাসনের নেওয়া সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সীমানা নির্ধারণ ও পিলার স্থাপন করা হলে হয়তো বিরোধটি এতটা ভয়াবহ রূপ নিত না। প্রশাসনের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে ১৮ বছরের এই দীর্ঘসূত্রতার দায় কে নেবে, সেই প্রশ্নও তুলছেন তাঁরা।

স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগের সঙ্গে একমত পোষণ করে সাবেক ইউপি সদস্য জালাল উদ্দীন ও এলাকার আলী আকবর বলেন, জমির সীমানা নিয়ে বিরোধ কোনো নতুন বিষয় নয়। বিষয়টি প্রশাসনের নথিতে বহু বছর ধরেই ছিল এবং তা সমাধানের জন্য জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে সভা করে সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছিল। এরপর সংশ্লিষ্ট উপজেলা প্রশাসন, ভূমি অফিস ও সেটেলমেন্ট দপ্তরকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে বলা হলেও বাস্তবে স্থায়ী সমাধান হয়নি। প্রশাসন সময়মতো সীমানা নির্ধারণ করে পিলার স্থাপন করলে দুই উপজেলার মানুষের মধ্যে বিরোধের সুযোগ কমত এবং সংঘর্ষের মতো ঘটনা এড়ানো সম্ভব হতো। একটি প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে দীর্ঘ ১৮ বছর সময় লেগে যাওয়া এবং এর মধ্যে একজন নারী নিহত ও বহু মানুষ আহত হওয়ার ঘটনায় সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ভূমিকা নিয়েও তাঁরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

নিহত কুহিনূরের স্বামী কাবিল মিয়া ফোনে বলেন, ‘স্যার, আমি গরিব মানুষ। আমার মনে হয়, আমি বিচার পাইতাম না। মামলা করার দিন চারজন ও পরদিন আরও একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। এরপর আর কাউকে গ্রেপ্তার করা হয়নি। শুনেছি, ৪১ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে জামিন নিয়ে বের হয়ে গেছে। আসামিদের টাকা-পয়সা আছে, তাই তারা সহজেই জামিন পেয়ে যায়। আপনারা আমার জন্য একটু দয়া করেন স্যার।’ এ কথা বলার পর কান্নায় ভেঙে পড়ে ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন তিনি।

কুহিনূর হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই সাঈদ সানাউল্লাহ বলেন, কুহিনূর আক্তার হত্যা মামলার এজাহারভুক্ত ৬১ আসামির মধ্যে আটজন এখনো গ্রেপ্তার হননি। তাঁদের গ্রেপ্তারে পুলিশ নিয়মিত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। গত ২৫ আগস্ট ৪১ জন আসামি হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়েছেন। এ ছাড়া পাঁচজন কারাগারে এবং আরও সাতজন জামিনে মুক্ত রয়েছেন। ‘সেদিন আমি হাইকোর্টে যাওয়ার আগেই আসামিরা সেখানে চলে যান। এ কারণে তাঁদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়নি। পরে জানতে পেরেছি, হাইকোর্ট তাঁদের ছয় সপ্তাহের আগাম জামিন দিয়েছেন।’

মেঘনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শহীদুল ইসলাম বলেন, আসামিদের বাড়ি বিভিন্ন এলাকায় হওয়ায় তাঁদের গ্রেপ্তারে সংশ্লিষ্ট থানার সহযোগিতা নিতে হচ্ছে। নদী পার হয়ে ওই এলাকায় যেতে হয়। এরপরও আসামিদের গ্রেপ্তারে সর্বোচ্চ চেষ্টা চলছে। জামিনে থাকা আসামিরাও সাময়িক সময়ের জন্য জামিনে থাকলেও তাদের আইনের আওতায় আনা হবে।

মেঘনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মৌসুমী আক্তার বলেন, বিষয়টি দীর্ঘদিনের এবং এর সঙ্গে ভূমি জরিপ, মৌজা সীমানা নির্ধারণ ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর কার্যক্রম জড়িত। ২০০৮ সালে সীমানা সংক্রান্ত বিরোধ নিষ্পত্তির বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও তা এখন পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এ অবস্থায় বিষয়টি নতুন করে সভায় উপস্থাপনের মাধ্যমে দ্রুত বিরোধ নিষ্পত্তি করা জরুরি। এ জন্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যাচাই করে তিতাস উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) এর সঙ্গে সমন্বয় এবং সরেজমিনে পরিস্থিতি পরিদর্শনের পর পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। বিষয়টি নিষ্পত্তিতে কিছুটা সময় লাগতে পারে। একই সঙ্গে এ বিষয়ে উভয় উপজেলার মাননীয় সংসদ সদস্যদের হস্তক্ষেপও বিশেষভাবে জরুরি বলে মনে করি। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করে সীমানা বিরোধের স্থায়ী সমাধানে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। পাশাপাশি এলাকায় যাতে এ ধরনের বিরোধকে কেন্দ্র করে আর কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা না ঘটে, সে বিষয়েও প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

কেরানীগঞ্জে কিশোর গ্যাং সদস্যকে কুপিয়ে-গুলি করে হত্যা

কেরানীগঞ্জে কিশোর গ্যাং সদস্যকে কুপিয়ে-গুলি করে হত্যা

আদালতের রায়ে কাশিমপুর থেকে মুক্তি পেলেন ৮ জন

নুসরাত হত্যা মামলা আদালতের রায়ে কাশিমপুর থেকে মুক্তি পেলেন ৮ জন

দল-মত নির্বিশেষে দেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

দল-মত নির্বিশেষে দেশ গড়ার আহ্বান রাষ্ট্রপতির

মস্তিষ্কের অদ্ভুত খেলা: কেউ সংখ্যায় পান স্বাদ, কেউ সুরে দেখেন রং

মস্তিষ্কের অদ্ভুত খেলা: কেউ সংখ্যায় পান স্বাদ, কেউ সুরে দেখেন রং

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App