তাজমীন হত্যাকাণ্ড: সিসিটিভি ফুটেজে যা দেখা গেল
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:৩১ এএম
ছবি : সংগৃহীত
কুমিল্লায় ১৩ বছর বয়সী জান্নাতুল তাজমীন হত্যাকাণ্ডের তদন্তে সিসিটিভি ফুটেজ, প্রত্যক্ষদর্শীদের বর্ণনা ও বিভিন্ন আলামত খতিয়ে দেখছে পুলিশ। দূরপাল্লার বাস থেকে নামার পর ওই কিশোরীর চলাফেরা, অটোরিকশায় ওঠা এবং পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহ নিয়ে তদন্তসংশ্লিষ্টদের মধ্যে নানা প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
এ ঘটনায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়াকে গ্রেপ্তার করেছে গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদ করে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আকরাম হোসেন জানান, সড়কের পাশে ধানখেতের মধ্যে একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশা দেখতে পান তিনি। সেটির কাছাকাছি একটি ভ্যানিটি ব্যাগ পড়ে ছিল। ধানখেতে ধস্তাধস্তির চিহ্ন অনুসরণ করে এগিয়ে গেলে কাদার মধ্যে কিশোরীর মরদেহ দেখতে পান। পরে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করে পুলিশকে খবর দেন তিনি।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা মো. মুহিন বলেন, ধানখেতের অবস্থা দেখে তাঁর মনে হয়েছে, কিশোরীকে হত্যার আগে সেখানে ধস্তাধস্তি হয়েছিল। তবে ধর্ষণ বা যৌন নির্যাতনের বিষয়ে পুলিশ এখনো চূড়ান্ত কোনো তথ্য জানায়নি। এ বিষয়ে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও তদন্তের ফল গুরুত্বপূর্ণ হবে।
সিসিটিভি ফুটেজে কী দেখা গেছে
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি সিসিটিভি ফুটেজে তাজমীনকে ঘিরে কয়েকজন যুবকের চলাফেরা করতে দেখা গেছে বলে বিভিন্ন সূত্রে দাবি করা হয়েছে। এ ফুটেজের সত্যতা, সময় এবং ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা যাচাই করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
বিভিন্নজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, বান্ধবীদের সঙ্গে কক্সবাজারে বেড়ানো শেষে সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী তাজমীন বুধবার রাত পৌনে ১২টার দিকে ‘আইকনিক এক্সপ্রেস’ নামের একটি দূরপাল্লার বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ার বাজার এলাকার নুরজাহান হোটেলের সামনে নামে।
সিসিটিভি ফুটেজে তাকে বাস থেকে একা নামতে দেখা যায়। এরপর শহরের বাসায় ফেরার জন্য রাস্তায় দাঁড়িয়ে অটোরিকশার অপেক্ষা করতে দেখা যায় তাকে। শহরগামী অটোরিকশা না পেয়ে কিছুক্ষণ হোটেলে বসে থাকার পর আবারও রাস্তায় অপেক্ষা করে সে।
পরে রাত সোয়া ১২টার দিকে হেঁটে কিছুটা সামনে গিয়ে একটি অটোরিকশায় ওঠে তাজমীন। এরপর তার গতিবিধি সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়ার মতো ফুটেজ পাওয়া গেছে কি না, তা খতিয়ে দেখছেন তদন্তকারীরা।
বাবাকে ফোন করে উদ্ধারের আকুতি
পরিবারের দাবি, ঘটনার রাতে তাজমীন তার বাবাকে মোবাইল ফোনে বলেছিল, ‘বাবা, আমাকে ওরা আটকে রেখেছে, নিয়ে যাও।’ সে সময় বাবার কাছে নিজের লাইভ লোকেশনও পাঠিয়েছিল বলে জানিয়েছে পরিবার।
তবে ওই লোকেশন থেকে তার অবস্থান নিশ্চিত হতে পারেননি স্বজনেরা। একাধিকবার ফোন করেও তার সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তার সন্ধান পাননি তাঁরা।
একমাত্র সন্তানকে হারিয়ে শোকে ভেঙে পড়েছেন তাজমীনের মা-বাবা। মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটন এবং জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
তাজমীনের মা অভিযোগ করেন, মেয়েটি যে বান্ধবীর সঙ্গে কক্সবাজারে গিয়েছিল, তার ভূমিকা তদন্ত করা প্রয়োজন। তবে ওই বান্ধবীর সংশ্লিষ্টতা সম্পর্কে পুলিশের কোনো চূড়ান্ত বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
যেভাবে উদ্ধার হয় মরদেহ
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার পেরুল উত্তর ইউনিয়নের জগৎপুর গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তাজমীনের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। মরদেহের কাছ থেকে একটি পরিত্যক্ত সিএনজিচালিত অটোরিকশাও জব্দ করা হয়।
অটোরিকশাটির নিবন্ধনসংক্রান্ত তথ্য যাচাই করে এর মালিক হিসেবে আবুল হাসেমকে শনাক্ত করে পুলিশ। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদের পর চালক সুমন মিয়ার বিষয়ে তথ্য পাওয়া যায়।
পরে শুক্রবার চট্টগ্রামে অভিযান চালিয়ে সুমনকে গ্রেপ্তার করে গোয়েন্দা পুলিশ। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তাঁর বাড়ি চাঁদপুরের কচুয়া উপজেলায়। তিনি কুমিল্লার বাগমারা দক্ষিণের জয়নগর গ্রামে শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করতেন।
কুমিল্লা সদর দক্ষিণ সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার মোস্তাইন বিল্লাহ ফেরদৌস জানান, গ্রেপ্তার সুমনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে অন্য কেউ জড়িত কি না, তা-ও খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
তদন্তে যা বলছে পুলিশ
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, এ ঘটনায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে তাজমীনের বাবা হত্যা মামলা করেছেন।
কুমিল্লার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার লুৎফর রহমান বলেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে অটোরিকশাচালক সুমনকে গুরুত্ব দিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে। হত্যার আগে তাজমীন ধর্ষণ বা অন্য কোনো নির্যাতনের শিকার হয়েছিল কি না, তা ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন ও জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে জানার চেষ্টা চলছে।
কুমিল্লার পুলিশ সুপার আনিসুজ্জামান জানান, ঘটনাস্থলের অন্তত পাঁচটি ধানখেতে ছোটাছুটি ও ধস্তাধস্তির চিহ্ন পাওয়া গেছে। এতে কিশোরীটি হামলাকারীদের কাছ থেকে বাঁচতে পালানোর চেষ্টা করে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
তাজমীনের মরদেহ শুক্রবার সকালে পারিবারিক কবরস্থানে তার দাদার কবরের পাশে দাফন করা হয়েছে। এ ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, হত্যার উদ্দেশ্য নির্ধারণ এবং সিসিটিভি ফুটেজসহ সব আলামত বিশ্লেষণের মাধ্যমে তদন্ত এগিয়ে নিচ্ছে পুলিশ।
