অবশেষে চলাচল শুরু
৮০০ যাত্রী নিয়ে সেন্টমার্টিনের পথে মৌসুমের প্রথম জাহাজ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০২৬, ১০:৪০ এএম
ছবি: সংগৃহীত
দীর্ঘ অপেক্ষা, অনিশ্চয়তা ও নানা জটিলতার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে শুরু হয়েছে কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল। মৌসুমের প্রথম দিনেই ৮০০ জনের বেশি পর্যটক নিয়ে দ্বীপের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে জাহাজ। বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে কক্সবাজারের বিআইডব্লিউটিএ জেটিঘাট থেকে জাহাজটি যাত্রা শুরু করে।
বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) এমভি বার আউলিয়া, এমভি কর্ণফুলী ও এমভি টেকনাফ নামের তিনটি জাহাজকে চলাচলের অনুমতি দিয়েছে। জাহাজ তিনটিতে একসঙ্গে মোট ২ হাজার ২৯৮ জন যাত্রী যাতায়াত করতে পারবেন।
বুধবার (৪ নভেম্বর) দুপুরে বিআইডব্লিউটিএর নৌ নিরাপত্তা ও ট্রাফিক শাখার উপপরিচালক সালমা আফরোজ স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে এ অনুমতির বিষয়টি জানানো হয়।
মৌসুমের প্রথম যাত্রাকে ঘিরে বৃহস্পতিবার ভোর থেকেই ঘাটে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। পরিবার-পরিজন, বন্ধু-বান্ধব এবং বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভ্রমণ দলের সদস্যদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে জেটিঘাট। শীতের মৃদু বাতাস, সমুদ্রের ঢেউ আর পর্যটকদের উচ্ছ্বাসে প্রাণবন্ত হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের নিযুক্ত প্রতিনিধি ও কক্সবাজার সদর উপজেলার ভূমি কমিশনার মশিয়ুর রহমান জানান, নির্ধারিত সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটেই মৌসুমের প্রথম জাহাজটি যাত্রা শুরু করেছে। যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলা প্রশাসন, কোস্টগার্ড, নৌ-পুলিশ, ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে। নিরাপদ ও নির্বিঘ্ন ভ্রমণ নিশ্চিত করাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
সি ক্রুজ অপারেটরস ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক হোসাইন ইসলাম বাহাদুর বলেন, দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর নতুন মৌসুমের প্রথম দিনেই ৮ শতাধিক পর্যটকের উপস্থিতি আশাব্যঞ্জক। এতে সেন্টমার্টিন ভ্রমণের প্রতি মানুষের আগ্রহের বিষয়টি আবারও স্পষ্ট হয়েছে। বর্তমান সরকারের সদিচ্ছা এবং দ্বীপের মানুষের স্বার্থ বিবেচনায় পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচলের অনুমতি দেওয়া হয়েছে।
আরও পড়ুন: ইকবাল সোবহান জুলাইয়ের হত্যা মামলায় গ্রেপ্তার, ছাড়া পেলেন রাজীব ঘোষ
তিনি আরও বলেন, পর্যটকদের আস্থা বাড়াতে নিরাপত্তা, সময়নিষ্ঠা, পরিবেশ সংরক্ষণ ও উন্নত সেবা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে জাহাজ ও দ্বীপের পরিবেশ দূষণ রোধে পর্যটকদের সতর্ক করা হয়েছে। বিশেষ করে প্লাস্টিকের বোতলসহ পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর বর্জ্য যেখানে-সেখানে না ফেলার বিষয়ে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
মৌসুমের প্রথম যাত্রায় অংশ নেওয়া পর্যটকদের মধ্যেও ছিল ব্যাপক উচ্ছ্বাস। পরিবার নিয়ে ঢাকা থেকে আসা সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, অনেক দিন ধরেই সেন্টমার্টিন ভ্রমণের পরিকল্পনা করছিলেন। মৌসুমের প্রথম জাহাজে যাওয়ার সুযোগ পেয়ে তিনি আনন্দিত। সকালে সমুদ্রের সৌন্দর্য উপভোগ করতে করতে তাঁর মনে হচ্ছে, যাত্রাটিই যেন ভ্রমণের অর্ধেক আনন্দ।
চট্টগ্রাম থেকে বন্ধুদের সঙ্গে আসা বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী মেহেদী হাসান জানান, এর আগে একবার সেন্টমার্টিন গেলেও এবার মৌসুমের শুরুতেই যাওয়ার সুযোগ হয়েছে। দ্বীপের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগের পাশাপাশি পরিবেশ রক্ষায় সবাই সচেতন থাকবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
রাজশাহী থেকে আসা পর্যটক রুবেল আহমেদ বলেন, দেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপটি কাছ থেকে দেখার ইচ্ছা তাঁর অনেক দিনের। জাহাজে ওঠার পর থেকেই অন্যরকম অনুভূতি কাজ করছে। পরিবারের সবাই আনন্দিত। নিরাপদে ভ্রমণ শেষে সুন্দর স্মৃতি নিয়ে ফিরতে চান তাঁরা।
বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্টমার্টিন স্বচ্ছ নীল জলরাশি, প্রবাল, নারিকেলগাছ ও মনোরম সৈকতের জন্য পর্যটকদের কাছে বিশেষ আকর্ষণীয়। প্রতিবছর শীত মৌসুমে দ্বীপটিতে পর্যটকদের ব্যাপক সমাগম ঘটে। তবে পরিবেশ সংরক্ষণ এবং সমুদ্রের বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নির্ধারিত সময় ও নিয়ম মেনেই নৌযান চলাচল নিয়ন্ত্রণ করা হয়।
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের মতে, কক্সবাজার-সেন্টমার্টিন নৌপথ চালু হওয়ায় দ্বীপের হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসায় আবারও কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে। স্থানীয় মানুষের আয়ের অন্যতম প্রধান উৎস পর্যটন হওয়ায় নতুন মৌসুমের সূচনা তাঁদের মধ্যেও আশার সঞ্চার করেছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে পর্যটনের বিকাশের পাশাপাশি সেন্টমার্টিনের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় সবাইকে দায়িত্বশীল আচরণের আহ্বান জানানো হয়েছে। প্লাস্টিক বর্জ্য কমানো, নির্ধারিত নিয়ম মেনে চলা এবং প্রবালসহ দ্বীপের প্রাকৃতিক সম্পদের ক্ষতি হয়—এমন কর্মকাণ্ড থেকে বিরত থাকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
সব মিলিয়ে ৮ শতাধিক পর্যটকের অংশগ্রহণ, প্রশাসনের নিরাপত্তা প্রস্তুতি এবং পর্যটন ব্যবসায়ীদের আশাবাদ নিয়ে শুরু হয়েছে নতুন পর্যটন মৌসুম। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে আগামী দিনগুলোতে এই নৌপথে পর্যটকের সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এতে দ্বীপের পর্যটননির্ভর অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
