‘ভোট এলে মেলে প্রতিশ্রুতি, বর্ষায় ফেরে আতঙ্ক’
পদ্মার গ্রাসে বিলীন রাজবাড়ীর ফসলি জমি, বসতবাড়ি
রাজবাড়ী প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২০ জুলাই ২০২৬, ০৪:২৮ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
পদ্মা নদীর পানি বৃদ্ধি, উজান থেকে নেমে আসা ঢল এবং টানা বৃষ্টির প্রভাবে রাজবাড়ী জেলার প্রায় ৮৫ কিলোমিটার পদ্মা তীরবর্তী এলাকায় নতুন করে ভয়াবহ নদীভাঙন শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। প্রতিদিনই একটু একটু করে নদী গিলে খাচ্ছে মানুষের স্বপ্ন, স্মৃতি আর জীবনজীবিকা।
ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে দৌলতদিয়া লঞ্চঘাট, ফেরিঘাট, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় উপাসনালয়, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, শত শত বসতবাড়ি, সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা। প্রতিদিন ভাঙনের শব্দ শুনে ঘুম ভাঙে মানুষের। কখন নিজের ঘরটুকুও নদীতে মিলিয়ে যাবে এই আতঙ্ক নিয়েই দিন কাটছে হাজারো পরিবারের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, গত কয়েক দশক ধরে পদ্মার ভয়াল ভাঙনে দৌলতদিয়া ও দেবগ্রাম ইউনিয়নের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙনের কারণে বহু আগেই বন্ধ হয়ে গেছে দৌলতদিয়ার ১ ও ২ নম্বর ফেরিঘাট। তবুও স্থায়ী নদীশাসনের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় প্রতি বর্ষায় একই আতঙ্ক ফিরে আসে।

তাদের অভিযোগ, নির্বাচন এলেই জনপ্রতিনিধিদের কাছে নদীভাঙনের বিষয়টি গুরুত্ব পায়। তখন স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ, নদীশাসন ও পুনর্বাসনের নানা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়। কিন্তু নির্বাচন শেষ হলেই সেই প্রতিশ্রুতি কাগজেই সীমাবদ্ধ থাকে। বছরের পর বছর ধরে একই দুর্ভোগে দিন কাটালেও স্থায়ী সমাধান মেলেনি।
পদ্মাপাড়ের আরেক বাসিন্দা কহিনুর বেগম কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ভোটের সময় অইলে আমাগের কদর বাড়ে। তখন সবাই আসে, অনেক কথা কয়। কিন্তু ভোট চইলা গেলে কেও আর আমাগের খোঁজ নেয় না। এই বাড়িটাও যদি ভাইঙ্গা যায়, আমাগের যাওয়ার আর কোনো জায়গা নাই।”
স্থানীয় যুবক মো. অনিক শেখ বলেন, “গত ১৭-১৮ বছর ধরে শুধু আশ্বাসই শুনে আসছি। সবাই বলে নদীশাসন হবে, বাঁধ হবে। কিন্তু আজও কিছুই হয়নি। নতুন সরকারও আমাদের আশ্বস্ত করেছিল। অথচ আবার ভাঙন শুরু হয়েছে, এখন পর্যন্ত কেউ এসে খোঁজও নেয়নি।”
মেহের আলী মোল্লা বলেন, “নির্বাচনের সময় আমাদের প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম নদীশাসনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। আমরা এখনো সেই আশাতেই বসে আছি। যদি দ্রুত কাজ শুরু না হয়, তাহলে পুরো এলাকা নদীতে চলে যাবে।”
দলু মণ্ডল বলেন, “শুষ্ক মৌসুমে যদি পরিকল্পিতভাবে জিওব্যাগ ফেলে নদীশাসনের কাজ করা হতো, তাহলে আজ এই দুর্ভোগে পড়তে হতো না। কিন্তু বর্ষা শুরু হওয়ার পর তড়িঘড়ি করে জিওব্যাগ ফেলা হয়। এতে সরকারের কোটি কোটি টাকা খরচ হয়, কিন্তু স্থায়ী সমাধান হয় না। লাভবান হয় কিছু দপ্তর, আর আমরা সর্বস্ব হারাই।”
এ বিষয়ে রাজবাড়ী পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. তাজমিনুর রহমান বলেন, রাজবাড়ী সদর ও গোয়ালন্দ উপজেলায় জরিপ অনুযায়ী প্রায় ১৪ দশমিক ৫ কিলোমিটার এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে দৌলতদিয়ার প্রায় ৬০০ মিটার এলাকা অতিঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় সেখানে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে প্রায় ২০০ মিটার এলাকায় কাজ শেষ পর্যায়ে রয়েছে এবং অনুমোদন সাপেক্ষে বাকি অংশেও দ্রুত কাজ শুরু হবে।
তিনি জানান, দেবগ্রামে প্রায় সাড়ে তিন কিলোমিটার এলাকা ঝুঁকিপূর্ণ হলেও সেখানে বসতবাড়ি কম থাকায় আপাতত দৌলতদিয়ার জনবসতিপূর্ণ এলাকাকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া রাজবাড়ী সদরের কালীতলা, মহাদেবপুর ও শহর রক্ষা প্রকল্পের আওতায় প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকা নদীভাঙন রোধে পৃথক প্রকল্প প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।কালুখালী, বালিয়াকান্দি ও পাংশা উপজেলার ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলোর জন্যও প্রকল্প প্রস্তুত করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “বর্ষা যত বাড়বে, আমরা কাজের তীব্রতাও তত বাড়াবো। কোথাও নতুন ভাঙন দেখা দিলেই দ্রুত অনুমোদন নিয়ে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ডাম্পিংয়ের কাজ শুরু করা হবে।”
তবে পদ্মাপাড়ের মানুষের দাবি একটাই, তারা আর সাময়িক ত্রাণ, স্লিপ কিংবা আশ্বাস চান না। তারা চান একটি স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প, যাতে বছরের পর বছর ধরে ঘরবাড়ি হারানোর ভয় নিয়ে বেঁচে থাকতে না হয়। পদ্মার উত্তাল ঢেউয়ের দিকে তাকিয়ে সীমা বেগমের শেষ কথাগুলো যেন পুরো এলাকার মানুষের মনের ভাষা হয়ে ওঠে “আমরা ভিক্ষা চাই না। শুধু একটা শক্ত বাঁধ চাই। বাঁধটা হইলে আমাগো ঘর বাঁচবো, জীবন বাঁচবো, আমরাও সম্মান লইয়া বাঁচতে পারমু।”
