প্রকল্প আছে সংস্কার নেই; সিংগাইরের চার সড়কে দুর্ভোগ!
মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০২৬, ১১:১৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সংস্কারের অভাবে মানিকগঞ্জের সিংগাইর উপজেলার চারটি গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এখন জনদুর্ভোগের বড় কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দীর্ঘদিন সংস্কার না হওয়ায় কোথাও পিচ উঠে সৃষ্টি হয়েছে অসংখ্য গর্ত, কোথাও জমছে হাঁটুপানি ও কাদা। আবার কোথাও সংস্কারকাজ শুরু হলেও অভিযোগের মুখে দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ রয়েছে প্রকল্প। এতে প্রতিদিন ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করছেন শিক্ষার্থী, কৃষক, রোগী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সড়কগুলোর বেহাল অবস্থার কারণে বেড়েছে যাতায়াতের সময় ও ব্যয়। কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে কৃষকদের অতিরিক্ত পরিবহন খরচ গুনতে হচ্ছে। জরুরি প্রয়োজনে রোগী নিয়ে হাসপাতালে যেতেও চরম ভোগান্তিতে পড়ছেন স্বজনরা। বর্ষা এলে পরিস্থিতি আরও নাজুক হয়ে পড়ে।
খানাখন্দে ভরা এসব সড়কের মধ্যে অন্যতম জামশা ইউনিয়নের বাংগালা বাজার-মাটিকাটা সড়ক। প্রায় চার কিলোমিটার সড়কটির সংস্কারকাজ শুরু হওয়ার পর অভিযোগের মুখে বন্ধ হয়ে যায়। এলজিইডির গ্রামীণ সড়ক মেরামত ও সংরক্ষণ প্রকল্পের আওতায় প্রায় ৩ কোটি ১৩ লাখ টাকা ব্যয়ে ২০২৩ সালের নভেম্বরে কাজটি পায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স নির্মাণ প্রকৌশলী। চুক্তি অনুযায়ী ২০২৪ সালের এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
কাজ শুরুর পর সড়কের দুই পাশের এজিংয়ে পুরোনো ইটের সঙ্গে নতুন ইট ব্যবহার করে ব্রিক স্যালভেজ করার অভিযোগ ওঠে। পরে বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) গেলে সংস্কারকাজ বন্ধ হয়ে যায়। এরপর দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কাজ আর শুরু হয়নি। ফলে সড়কটির বিভিন্ন অংশে সৃষ্টি হয়েছে বড় বড় গর্ত। বর্ষায় এসব গর্তে পানি জমে দুর্ভোগ আরও বাড়ছে।
সিংগাইর-মানিকনগর-সিরাজপুর সড়কের মানিকনগর থেকে সিরাজপুর অংশের প্রায় ১১ কিলোমিটারও বেহাল। অধিকাংশ জায়গায় পিচ, ইট, বালু ও সুরকি উঠে গিয়ে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে। উপজেলা এলজিইডি সূত্রে জানা গেছে, ২০২২-২৩ অর্থবছরে সিংগাইর থেকে সিরাজপুর হাট পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার সড়কের মধ্যে মানিকনগর পর্যন্ত প্রায় নয় কিলোমিটার অংশের পাকাকরণ ও সংস্কারকাজ করা হয়। তবে মানিকনগর থেকে সিরাজপুর বাজার পর্যন্ত অংশের সংস্কারকাজ দীর্ঘদিন ধরে অসম্পূর্ণ।
এদিকে সিংগাইর সদর থেকে সাভারে যাতায়াতের বিকল্প ও বাইপাস সড়ক হিসেবে ব্যবহৃত ধল্লা ইউনিয়নের ভূমদক্ষিণ-খাসেরচর-ভাটিরচর সড়কটিও কয়েক বছর ধরে সংস্কারের অভাবে বেহাল। প্রায় সাত কিলোমিটার সড়কের বিভিন্ন স্থানে অসংখ্য খানাখন্দ ও বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে। বিশেষ করে খাসেরচর বাজার থেকে ভাটিরচর পর্যন্ত অংশটি প্রায় চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। কাদা-পানির কারণে এ সড়কে রোগী ও পণ্যবাহী যান চলাচলেও চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
অন্যদিকে, দীর্ঘদিন অবহেলায় পড়ে থাকা সাহরাইল-শোল্লা সড়কের সংস্কারকাজ শুরু হলেও তা দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। প্রায় চার কিলোমিটার দীর্ঘ এ সড়কটি সায়েস্তা ইউনিয়নের সাহরাইল মোল্লাবাড়ি থেকে শোল্লার খতিয়া ব্রিজ পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। সড়কের বেহাল অবস্থায় কৃষকদের ফসল বাজারজাত করতে অতিরিক্ত পরিবহন ব্যয় হচ্ছে। ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে শিক্ষার্থীদেরও।
সড়কটির নিয়মিত ব্যবহারকারী মোস্তফা কামাল ফখরুল, ইসমত আরা ও সোলাইমান দেওয়ান বিকাশ বলেন, “এটি পার্শ্ববর্তী নবাবগঞ্জ উপজেলার সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষার অন্যতম একটি সড়ক। অথচ সড়কের বেহাল দশার কারণে আমরা মারাত্মক সমস্যায় ভুগছি।”
সিংগাইর উপজেলা প্রকৌশলী মো. গোলাম সামদানী বলেন, ঠিকাদারের গাফিলতির কারণে যেসব কাজ বন্ধ রয়েছে, সেগুলো দ্রুত শেষ করতে ঠিকাদারদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না করলে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের টেন্ডার ও চুক্তি বাতিলের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বন্ধ থাকা প্রকল্পগুলো পুনরায় টেন্ডারের মাধ্যমে বাস্তবায়নেরও উদ্যোগ নেওয়া হবে।
মানিকগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. জামাল উদ্দিন বলেন, জেলায় অনেক সড়ক সংস্কারের প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। বর্ষায় ক্ষয়ক্ষতি আরও বেড়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়কগুলো পর্যায়ক্রমে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
এ ব্যাপারে মানিকগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য ইঞ্জি. মঈনুল ইসলাম খান শান্ত বলেন, “জনগণের ভোগান্তি লাঘবে গুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো দ্রুত সংস্কারের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তবে এলাকাবাসীর দাবি, শুধু আশ্বাস নয়, গুরুত্বপূর্ণ এসব সড়ককে অগ্রাধিকার দিয়ে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কারকাজ শেষ করতে হবে। পাশাপাশি কাজের মান নিশ্চিত করতে কঠোর নজরদারি প্রয়োজন। অন্যথায় সরকারি অর্থ ব্যয় হলেও জনদুর্ভোগের অবসান হবে না।
