×

ঢাকা

দখল-ভরাটে অস্তিত্ব সংকটে কেরানীগঞ্জের সিরাজনগর বিল

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৬, ০৯:২৭ পিএম

দখল-ভরাটে অস্তিত্ব সংকটে কেরানীগঞ্জের সিরাজনগর বিল

ছবি : সংগৃহীত

ঢাকার কেরানীগঞ্জের তারানগর ইউনিয়নের সিরাজনগর বিল প্রকৃতির এক অনন্য জলাভূমি। বর্ষা মৌসুমে বিস্তীর্ণ এই বিল অতিরিক্ত পানি ধারণ করে জলাধারে পরিণত হয়, আর শুষ্ক মৌসুমে পানি নেমে গেলে সেখানে চলে কৃষিকাজ। শীত এলে বিভিন্ন প্রজাতির স্থানীয় ও পরিযায়ী পাখির কলকাকলিতে মুখর হয়ে ওঠে বিলটি। তবে অবৈধ দখল, বালু ফেলে ভরাট, মাছের ঘের ও অপরিকল্পিত স্থাপনা নির্মাণের অভিযোগে এখন অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে গুরুত্বপূর্ণ এই জলাভূমি।

সংশ্লিষ্টদের তৈরি সংরক্ষণবিষয়ক অ্যাকশন কিট অনুযায়ী, সিরাজনগর বিল রাজউকের ডিটেইলড এরিয়া প্ল্যানে (ড্যাপ) ‘ফ্লাড ফ্লো জোন’ ও ‘ওয়াটার রিটেনশন এরিয়া’ হিসেবে চিহ্নিত। বর্ষাকালে ধলেশ্বরী নদী ও আশপাশের এলাকার অতিরিক্ত পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে বিলটি। প্রাকৃতিক খাল ও নালার মাধ্যমে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে এর সংযোগ রয়েছে।

তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বিলের প্রাকৃতিক পানি প্রবাহের পথ সংকুচিত হয়ে পড়ছে। বিভিন্ন স্থানে ড্রেজার দিয়ে বালু ফেলে জলাভূমি ভরাট করা হচ্ছে। কোথাও কোথাও মাটির রাস্তা নির্মাণের কারণে খাল ও নালার স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।

এর ফলে বর্ষা মৌসুমে আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়ার পাশাপাশি স্থানীয় কৃষি ও মাছের প্রজননেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শীত মৌসুমে সিরাজনগর বিল বিভিন্ন প্রজাতির পরিযায়ী ও স্থানীয় জলচর পাখির অন্যতম আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত। স্থানীয়দের ভাষ্য, একসময় শীত এলেই বিল ও আশপাশের এলাকায় বিপুল সংখ্যক পাখির আনাগোনা দেখা গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে তাদের উপস্থিতি কমে গেছে।

সংরক্ষণবিষয়ক নথিতে বিল ও আশপাশের নিম্নাঞ্চলকে প্রায় ২০০ প্রজাতির পাখির বিচরণক্ষেত্র হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এর মধ্যে ছোট সরালি, পিয়ং হাঁস, গিরিয়া হাঁস, কানি বক, নিশি বক, ডাহুক ও মাছরাঙাসহ বিভিন্ন প্রজাতির পাখির উপস্থিতির কথা বলা হয়েছে।

তবে অবৈধ বালুভরাট, পানির পরিমাণ কমে যাওয়া, মাছ চাষের ধরনে পরিবর্তন, যান্ত্রিক নৌযানের শব্দ এবং পর্যটকদের ফেলে যাওয়া বর্জ্য পাখির স্বাভাবিক আবাসস্থলের জন্য হুমকি হয়ে উঠছে বলে নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।

সিরাজনগর বিলের সংকটকে শুধু একটি স্থানীয় জলাভূমির অস্তিত্ব রক্ষার বিষয় হিসেবে দেখছেন না সংশ্লিষ্টরা। কারণ বর্ষা মৌসুমে বিপুল পরিমাণ পানি ধারণের মাধ্যমে বিলটি আশপাশের এলাকায় জলাবদ্ধতা কমাতে ভূমিকা রাখে।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, বিলটির পানি ধারণক্ষমতা কমে গেলে বর্ষার অতিরিক্ত পানি নিষ্কাশনের স্বাভাবিক পথ বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এতে বসিলা, তারানগরসহ দক্ষিণ-পশ্চিম ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার ঝুঁকি বাড়তে পারে।

আরও পড়ুন: ডিবি পরিচয়ে জামায়াত নেতাকে অপহরণ

অ্যাকশন কিটে বলা হয়েছে, অপরিকল্পিতভাবে বিল ভরাট অব্যাহত থাকলে এর প্রভাব শুধু পরিবেশের ওপরই নয়, নগর ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় জনজীবনের ওপরও পড়তে পারে।

সিরাজনগর বিলের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো এর মৌসুমি রূপ। বর্ষায় জলাভূমি থাকলেও শুষ্ক মৌসুমে পানি নেমে যাওয়ার পর পলিযুক্ত জমিতে স্থানীয় কৃষকেরা ধান ও বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি চাষ করেন।

এ ছাড়া বিলটি দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছের আবাস ও প্রজননক্ষেত্র হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ধলেশ্বরী নদীর সঙ্গে বিলের প্রাকৃতিক সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলে মাছের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

স্থানীয়দের মতে, জলাভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হলে কৃষি, মৎস্যসম্পদ ও জীববৈচিত্র্য—সব ক্ষেত্রেই দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।

সিরাজনগর বিল রক্ষায় অবৈধ দখল ও ভরাট বন্ধে দ্রুত প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি উঠেছে। এ বিষয়ে জেলা প্রশাসন, কেরানীগঞ্জ উপজেলা প্রশাসন, পরিবেশ অধিদপ্তর ও রাজউকের কাছে অভিযোগ দেওয়ার প্রস্তাব রয়েছে।

একই সঙ্গে অবৈধ ভরাটের ছবি ও ভিডিও, জিওট্যাগড তথ্য, জমির দাগ-খতিয়ান, পুরোনো স্যাটেলাইট ছবি এবং ড্যাপের নথি সংগ্রহের মাধ্যমে বিলটির বর্তমান অবস্থা নথিভুক্ত করার কথাও বলা হয়েছে।

প্রয়োজনে পরিবেশবাদী সংগঠনের মাধ্যমে আইনি নোটিশ দেওয়া এবং জনস্বার্থে উচ্চ আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে।

সিরাজনগর বিল এখন শুধু একটি জলাভূমির গল্প নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জলাবদ্ধতা নিয়ন্ত্রণ, কৃষি, মৎস্যসম্পদ, জীববৈচিত্র্য ও পরিযায়ী পাখির আবাস রক্ষার বিষয়টি। বর্ষায় যে বিল অতিরিক্ত পানি ধারণ করে আশপাশের জনপদকে সুরক্ষা দেয়, শীতে সেই বিলই হয়ে ওঠে পাখির নিরাপদ আশ্রয়।

তাই প্রকৃতির এই গুরুত্বপূর্ণ জলাধার রক্ষায় দ্রুত ও কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া না হলে ক্ষতি শুধু সিরাজনগর বিলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; এর প্রভাব পড়তে পারে আশপাশের মানুষের জীবন, জীববৈচিত্র্য এবং বৃহত্তর ঢাকার পরিবেশেও।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

রাশেদ খানকে ডাকসুর জিএস ঘোষণা

রাশেদ খানকে ডাকসুর জিএস ঘোষণা

জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা মেসির

জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা মেসির

একযোগে ১১ পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি

একযোগে ১১ পুলিশ কর্মকর্তাকে বদলি

দখল-ভরাটে অস্তিত্ব সংকটে কেরানীগঞ্জের সিরাজনগর বিল

দখল-ভরাটে অস্তিত্ব সংকটে কেরানীগঞ্জের সিরাজনগর বিল

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App