দুই মাসেই শেষ স্পেনযাত্রা
বিদেশে যাওয়া ছেলেটি ফিরল কফিনে
কালীগঞ্জ (গাজীপুর) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বিমানবন্দরে তখন অপেক্ষায় স্বজনেরা। অপেক্ষার অবসান হলো সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে। কিন্তু প্রিয় মানুষটির দেখা মিলল কফিনের ভেতর। স্পেনের মাদ্রিদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ নিয়ে বিমানটি ঢাকায় নামতেই কান্নায় ভেঙে পড়েন স্বজনরা।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কফিন পৌঁছায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁও গ্রামের বাড়িতে। সেখানে বাদ জুমা উত্তরগাঁও উত্তরপাড়া জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ২৫ বছর বয়সী এই তরুণকে।
এভাবেই মাত্র দুই মাসের প্রবাসজীবনের সমাপ্তি ঘটল আলিফের। যে বাড়ি থেকে ভবিষ্যৎ বদলের স্বপ্ন নিয়ে স্পেনে গিয়েছিলেন, শেষ পর্যন্ত সেই বাড়িতেই ফিরলেন নিথর হয়ে। গাজীপুরের কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির ছেলে ইউসুফ হাসান আলিফ। বয়স ২৫ বছর।
আরও পড়ুন: পে স্কেলের গেজেট আটকে কোথায়, কর্মকর্তারা জানালেন কার
পরিবারের ভাগ্য বদলানোর স্বপ্ন নিয়ে মাত্র দুই মাস আগে স্পেনে যান তিনি। মাদ্রিদে ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ শুরু করেছিলেন। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে পান কাজের অনুমতিও।
অর্থাৎ যে সময়ে নতুন কাজের অনুমতি পাওয়ার আনন্দে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কথা, ঠিক সেই সময়ই তার জীবনে নেমে আসে মৃত্যুর ছায়া।গত ৩০ আগস্ট (রোববার) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিট। মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা এলাকার পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে কানারিয়াস সড়কের একটি সাইকেল গ্যারেজে আগুন লাগে।
গ্যারেজের ভেতরে তখন আটকা পড়েন আলিফ। আগুনের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে বিষাক্ত ধোঁয়া। শ্বাস নিতে না পেরে সহকর্মীদের সঙ্গে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে সাহায্যের আকুতি জানান তিনি। তার সেই বার্তাটি ছিল-“আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।” এরপর আর কোনো বার্তা আসেনি।
খবর পেয়ে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে যায়। দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়। আগুন যাতে পুনরায় ছড়িয়ে না পড়ে, সে জন্য সেখানে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলও বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়।
কিন্তু ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে গেছে। ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন। পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্র অনুযায়ী, বিষাক্ত ধোঁয়া ও শ্বাসনালিতে মারাত্মক দাহ্য ক্ষতের কারণে তার মৃত্যু হয়।
আলিফের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়তেই স্পেনপ্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে শোক নেমে আসে। গত ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন প্রবাসী বাংলাদেশিরা কাঁধে করে বহন করেন আলিফের নিথর দেহ। চোখের জলে জানান বিদায়। এরপর শুরু হয় মরদেহ দেশে পাঠানোর আনুষ্ঠানিকতা।
আইনি সব প্রক্রিয়া ও প্রয়োজনীয় আনুষ্ঠানিকতা শেষে ১০ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইন্সের টিকে-১৩৬০ ফ্লাইটে আলিফের কফিনবন্দী মরদেহ ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হয়।
সেখান থেকে টিকে-৭৪২ ফ্লাইটে করে মরদেহ আসে বাংলাদেশের পথে। শুক্রবার সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বিমানটি অবতরণ করে। নির্ধারিত সময়ের ২৩ মিনিট বিলম্বে বিমানটি ঢাকায় পৌঁছায়। তারপর ঢাকা থেকে কালীগঞ্জ। আর কালীগঞ্জ থেকে উত্তরগাঁওয়ের পারিবারিক কবরস্থান-সেখানেই শেষ হলো আলিফের পথচলা।
মরদেহ বাড়িতে পৌঁছানোর পর উত্তরগাঁও এলাকায় নেমে আসে শোকের আবহ। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশী ও পরিচিতজনেরা ছুটে আসেন শেষবারের মতো আলিফকে দেখতে।
কয়েক মাস আগেও এই বাড়ি থেকেই হাসিমুখে বিদেশের পথে যাত্রা করেছিলেন তিনি। পরিবারের চোখে তখন ছিল স্বপ্ন-ছেলে বিদেশে গিয়ে কাজ করবে, নিজের ভবিষ্যৎ গড়বে, পরিবারের অবস্থার পরিবর্তন করবে। সেই স্বপ্ন আর পূরণ হলো না।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, সকালে প্রবাসী বাংলাদেশি ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ বাড়িতে এসে পৌঁছেছে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
