তারা মুখে বলে ‘বন্ধু’: ভারতকে নিয়ে চিফ হুইপ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৬:৫০ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে ভারতের কথা ও কাজের মধ্যে ‘বৈপরীত্য’ রয়েছে বলে মন্তব্য করে দেশটির কঠোর সমালোচনা করেছেন জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি। তিনি জানিয়েছেন, ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের করা ১০১টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) পর্যালোচনা করছে সরকার। এসব পর্যালোচনার ফল ‘অনতিবিলম্বে’ পাওয়া যাবে।
শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশন শেষে জাতীয় সংসদে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এসব কথা বলেন চিফ হুইপ।
ভারতের সঙ্গে সম্পর্কের প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম মনি সীমান্তে কাঁটাতারের বেড়া, ফেলানী হত্যাকাণ্ড, বাংলাদেশের কোস্টগার্ড ও নৌযান আটকে দেওয়াসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরেন।
চিফ হুইপ বলেন, “দেশে দুইদিন পরে আন্দোলন, ঘটনা, ঝামেলা হোক—চাই কি? আচ্ছা, না চাইলে আমরা তো চেষ্টাই করব এই ঘরটা যেন ঠিক থাকে, পানি যাতে না পড়ে, এই ঘরের চাল ঠিক থাকে। এটা আমরা চেষ্টা করব।
“এই চেষ্টা যাতে করতে না পারি, তার জন্য কিছু মানুষ পরিশ্রম করে, তারা আমাদের বন্ধু না, তারা আমাদের শত্রু। সেই বন্ধুরা কাঁটাতারের বেড়া দিছে না? দেবে, কিন্তু পরে মুখে বলে ‘বন্ধু’। সেই বন্ধুরা আমাদের ফেলানির লাশ রাস্তায় ঝুলিয়ে রাখে কাঁটাতারে।”
নুরুল ইসলাম মনি বলেন, “সেই বন্ধুরা আমাদের কোস্টগার্ডকে আটকে দেয়, আমাদের জাহাজ আটকে রাখে... আপনাদের মনে আছে, বাংলাদেশের জাহাজ আর বন্ধুর বাড়ির জাহাজ একসাথে যদি চিটাগাঙে বার্থিং করে, চিটাগাঙে বন্ধুর বাড়ির জাহাজ আগে খালাস হবে মাল, পরে আপনার বাড়ির জাহাজ–সঠিক বলছি?
“রাইট, একদম সঠিক! আপনার মাল বাংলাদেশের পোর্টে এলে আপনাকে বসে ডেমারেজ দিতে হবে, কিন্তু আমার বন্ধুর বাড়ির মাল খালাস হবে আগে। ১০১টা এমওইউ করেছে, ১০১টা এমওইউর মধ্যে নাই কী? আপনারা খুঁইজা দেখেন, এইরকম করেছে আমার দেশে।”
পরে এক সাংবাদিকের প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, “আমরা চুক্তিগুলা, মানে ১০১টা এমওইউ নিয়েই আলোচনা করছি এবং অনতিবিলম্বে তার ফল আপনারা পাবেন।”
আরও পড়ুন: ‘স্থানীয় নির্বাচনে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের অংশগ্রহণের সুযোগ নেই’
আদানি চুক্তি নিয়ে সমালোচনা
দেশের বিদ্যুৎ সংকট প্রসঙ্গে ভারতের আদানি গ্রুপের সমালোচনা করেন নুরুল ইসলাম মনি। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতের সঙ্গে করা বিভিন্ন চুক্তিতে বাংলাদেশের স্বার্থ যথাযথভাবে রক্ষা করা হয়েছে কি না, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভূমি, অবকাঠামো ও অর্থ ব্যবহার করে এমন কোনো প্রকল্প বা চুক্তি গ্রহণযোগ্য নয়, যার সুফল অন্যরা ভোগ করবে অথচ দায়ভার বহন করবে বাংলাদেশ।
চিফ হুইপ বলেন, ‘বাস্তবে আমরা এরকম জায়গা থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি। আমাদের কেউ শত্রু নয়, সবাই আমাদের বন্ধু; কিন্তু আমাদের দেশ আগে।’ এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের ‘সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতির কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
ব্রিকস সম্মেলনের আমন্ত্রণ প্রসঙ্গে
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বিমসটেকের সভাপতি হিসেবে ব্রিকস সম্মেলনে অংশ নেওয়ার জন্য ভারতের আমন্ত্রণ জানানোর বিষয়েও কথা বলেন চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, তারেক রহমান বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এবং বাংলাদেশ একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্র। তাই দ্বিপক্ষীয় সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের প্রতি যথাযথ মর্যাদা প্রত্যাশা করে সরকার।
সম্পত্তি হস্তান্তর বিল নিয়ে জামায়াতের সমালোচনা
সংবাদ সম্মেলনে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনে পাস হওয়া আইন নিয়েও কথা বলেন নুরুল ইসলাম মনি। ‘সম্পত্তি হস্তান্তর বিল, ২০২৬’ নিয়ে জামায়াতে ইসলামীর বিরোধিতার সমালোচনা করেন তিনি।
চিফ হুইপ বলেন, জামায়াতে ইসলামী শরিয়া আইনের দোহাই দিয়ে বিলটির বিরোধিতা করেছে। তবে সরকারের নির্বাচনী ইশতেহারে শরিয়া আইন চালুর কোনো প্রতিশ্রুতি নেই।
আরও পড়ুন: ফিল্ড ফায়ারিংয়ে আহত সেনা কর্মকর্তাকে দেখতে সিএমএইচে প্রধানমন্ত্রী
তিনি বলেন, বৃদ্ধ বাবা-মায়ের শেষ জীবনের নিরাপত্তা এবং নিজেদের সম্পত্তি ভোগের অধিকার নিশ্চিত করতেই আইনটি করা হয়েছে। সন্তানরা বাবা-মায়ের কাছ থেকে সম্পত্তি নিয়ে তাদের অসহায় অবস্থায় ফেলে দেবে—এটি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষিত সন্তানদের হাতেও বাবা-মায়ের নিগৃহীত হওয়ার ঘটনা ঘটছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বাবা-মায়ের জীবনের শেষ সময়ে তাদের নিরাপত্তা ও সম্পত্তির অধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
জামায়াতে ইসলামীর উদ্দেশে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, শরিয়া আইনের কথা বলে বিলটির বিরোধিতা করা হলেও মুসলিম পারিবারিক আইনের বিভিন্ন বিধান তারা অনুসরণ করেন। কাবিননামায় স্বাক্ষরসহ মুসলিম পারিবারিক আইনের বিধান মেনে চলার বিষয়টিও তিনি তুলে ধরেন।
সংসদে বিরোধী দলের সঙ্গে সরকারের মতপার্থক্য বেড়েছে কি না—এক সাংবাদিকের এমন প্রশ্নের জবাবে চিফ হুইপ বলেন, ‘আমাদের মতপার্থক্য হয়নি। মতপার্থক্য বাড়েওনি।’
৩৯টি মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির মধ্যে ২২টিতে বিরোধী দলের তিনজন করে সদস্য রাখা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্য প্রসঙ্গে নুরুল ইসলাম মনি বলেন, বিভিন্ন ঐতিহাসিক ঘটনা তুলে ধরে একটি নির্দিষ্ট ‘ন্যারেটিভ’ তৈরির চেষ্টা করা হচ্ছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, ওই বর্ণনায় ১৯৪৭ সালের দেশভাগ, ভাষা আন্দোলন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ উঠে এলেও জিয়াউর রহমানের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে।
বিরোধী দলের কর্মসূচি প্রসঙ্গে চিফ হুইপ বলেন, তাদের সঙ্গে সরকারের দূরত্ব তৈরি হয়নি; বরং বিভিন্ন বিষয়ে যোগাযোগ আরও ঘনিষ্ঠ হয়েছে। তিনি বলেন, কোনো কর্মসূচির মাধ্যমে সমস্যা সমাধান সম্ভব হলে সরকারও সেই পথ বেছে নিতে দ্বিধা করত না।
আইন প্রণয়নের আগে রাষ্ট্রদূতদের সঙ্গে আলোচনা
গুম প্রতিরোধ ও মানবাধিকার-সংক্রান্ত আইন প্রণয়নের আগে ১৬ জন রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে আলোচনা করার কথাও জানান চিফ হুইপ।
তিনি বলেন, আইন প্রণয়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মতামত ও আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। দেশের স্বার্থ, মানবাধিকার ও আইনের শাসন নিশ্চিত করেই প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করা হবে।
