×

ঢাকা

নৌকার বৈঠায় এখনো জেগে ওঠে সিংগাইর

Icon

মাসুম বাদশাহ, সিংগাইর (মানিকগঞ্জ)

প্রকাশ: ০৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৭:২৬ পিএম

নৌকার বৈঠায় এখনো জেগে ওঠে সিংগাইর

ছবি: সংগৃহীত

বর্ষার কালো মেঘে যখন আকাশ ঢেকে যায়, নদী-জলাশয়ের বুক ছুঁয়ে নামে বৃষ্টির ধারা, তখনই যেন নতুন প্রাণ ফিরে পায় গ্রামবাংলা। নদীর বুকে একসঙ্গে শত বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের হুঙ্কার আর হাজারো মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখর হয়ে ওঠে জনপদ। সেই চিরচেনা দৃশ্যের নাম—নৌকা বাইচ।

একসময় বর্ষাকালের অন্যতম প্রধান বিনোদন ছিল নৌকা বাইচ। নদীঘেরা বাংলার মানুষের জীবনের সঙ্গে মিশে থাকা এই লোকজ ক্রীড়া ছিল আনন্দ, উৎসব আর মিলনমেলার এক অনন্য উপলক্ষ। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলে গেছে মানুষের জীবনযাপন। আধুনিক বিনোদনের বিস্তারে কমেছে নৌকা বাইচের আয়োজন। বেড়েছে নৌকা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয়। পাশাপাশি প্রতিযোগিতায় অংশ নেওয়া নৌকার মাঝিমাল্লা ও মালিকপক্ষের মধ্যে নানা ধরনের বিশৃঙ্খলার অভিযোগও রয়েছে। ফলে শত বছরের এই লোকজ ঐতিহ্য এখন হারিয়ে যাওয়ার শঙ্কায়।

তবে সেই হারিয়ে যাওয়া ঐতিহ্যের প্রদীপ এখনো জ্বালিয়ে রেখেছে মানিকগঞ্জের সিংগাইর। জেলার বিভিন্ন নদী ও জলাশয়ে নৌকা বাইচের আয়োজন হলেও সক্রিয় বাইচের নৌকার সংখ্যায় অন্য উপজেলাগুলোর তুলনায় এগিয়ে রয়েছে সিংগাইর। 

ছবি: সংগৃহীত

স্থানীয় নৌকা মালিকদের তথ্য অনুযায়ী, মানিকগঞ্জ জেলায় বর্তমানে সক্রিয় বাইচের নৌকা রয়েছে প্রায় ৩০টি। এর মধ্যে সিংগাইরেই রয়েছে ১২টি, যা জেলার মোট সক্রিয় নৌকার প্রায় অর্ধেক। জেলার অন্য উপজেলাগুলোর মধ্যে হরিরামপুরে রয়েছে ৯টি, সদর উপজেলায় ৩টি, শিবালয়ে ৩টি, সাটুরিয়ায় ২টি এবং ঘিওরে রয়েছে একটি নৌকা। দৌলতপুর উপজেলায় বিভিন্ন সময়ে নৌকা বাইচের আয়োজন হলেও স্থানীয় নৌকা মালিকদের বর্তমান তথ্য অনুযায়ী, সেখানে এখন সক্রিয় বাইচের নৌকা নেই।

সিংগাইরের জামশা এলাকার কালীগঙ্গা নদী, চান্দহর ও ধলেশ্বরী নদীতে প্রায় প্রতিবছরই বসে নৌকা বাইচের আসর। স্থানীয় নৌকার পাশাপাশি এসব আয়োজনে অংশ নেয় দেশের বিভিন্ন এলাকার নৌকা। ফলে বাইচকে কেন্দ্র করে নদীর দুই পাড় পরিণত হয় মানুষের মিলনমেলায়।

মানিকগঞ্জের হরিরামপুরের সাপাই দিয়াবাড়ী বিল ও ইছামতি নদী, সদর উপজেলার বেউথা এলাকার কালীগঙ্গা নদী, দৌলতপুরের সমেতপুর গ্রামের ইছামতি নদী এবং ঘিওরের জাবরা এলাকার ইছামতি নদীতেও বিভিন্ন সময়ে নৌকা বাইচ অনুষ্ঠিত হয়। ঘিওরের হেলাচিয়া গ্রামের ইছামতি নদীতেও দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে এই আয়োজন।

নৌকা বাইচের জন্য সাধারণত সরু, লম্বা ও দ্রুতগতির কাঠের নৌকা ব্যবহার করা হয়। স্থানীয়ভাবে এসব নৌকার আকার ও ধরনেও রয়েছে বৈচিত্র্য। কোনো কোনো নৌকা ৪৫ থেকে ১০০ হাত পর্যন্ত দীর্ঘ। বড় নৌকায় ৭০ থেকে ১০০ জন বা তারও বেশি মাঝি একসঙ্গে বৈঠা চালান। ছোট ও মাঝারি নৌকায় অংশ নেন ২৫ থেকে ৬০ জন মাঝি। মাঝিদের সঙ্গে থাকেন সারেং, হালধর, তালদাতা ও অন্যান্য সহকারী।

বাইচের নৌকাগুলোর রয়েছে নিজস্ব পরিচয় ও নাম। সিংগাইরসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় রয়েছে ‘প্রবাসী বলধারা’, ‘বলধারার ঐতিহ্য’, ‘রাজহংস’, ‘বাইমাইল একতা এক্সপ্রেস’, ‘উরিয়া বাজ’, ‘হাতনি রাজ’, ‘হাজারী তরী’, ‘কালাম সিকদার’, ‘গোবিন্দল কসাই বাড়ি’, ‘মোল্লা বাড়ি’ ও ‘নকিব বাড়ী একতা এক্সপ্রেস’ নামের নৌকা। নৌকা মালিকরা অনেক সময় পারিবারিক ঐতিহ্য, স্থানীয় পরিচিতি কিংবা ব্যক্তিগত পছন্দ থেকে নৌকার নাম দেন। ফলে প্রতিটি নৌকার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে কোনো না কোনো পরিবার, গ্রাম কিংবা মানুষের স্মৃতি।

সাধারণত আষাঢ় থেকে আশ্বিন পর্যন্ত চলে নৌকা বাইচের মৌসুম। বিকেল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত নদীর বুকে চলে তীব্র প্রতিযোগিতা। আর বাইচের দিন নদীর দুই তীরে জড়ো হন বিপুলসংখ্যক মানুষ। কোথাও কোথাও বাইচকে ঘিরে বসে মেলা। এতে স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী ও দোকানিদের বেচাকেনাও বেড়ে যায়।

বাইচ শুরুর আগে মাঝিদের মধ্যে ‘গান’ দেওয়ারও প্রচলন রয়েছে। তালদাতা ও সারেংয়ের নির্দেশে মাঝিরা সমবেত কণ্ঠে ছন্দময় ধ্বনি ও গান পরিবেশন করেন। ‘হাতে লাগে ব্যাথারে, হাল ছাইড়া দে সোনার মাঝিরে’, ‘হেইও হেইও, জোরে বৈঠা মারো’ কিংবা ‘জোরে বৈঠা চালাও, নাও আগে বাড়াও’—এমন ধ্বনিতে মুখর হয়ে ওঠে নদীর দুই পাড়।

এসব গান ও ধ্বনি শুধু মাঝিদের মধ্যে সমন্বয়ই তৈরি করে না, বৈঠা চালানোর গতি ঠিক রাখতেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৈঠার ছন্দ, মাঝিদের কণ্ঠ আর নদীর ঢেউ মিলে তৈরি করে বাংলার এক হারিয়ে যেতে বসা সাংস্কৃতিক দৃশ্য।

একসময় নৌকা বাইচের বিজয়ী দলকে গরু, খাসি, ধান কিংবা ট্রফি দেওয়ার প্রচলন ছিল। সময়ের সঙ্গে বদলেছে পুরস্কারের ধরন। এখন নগদ অর্থের পাশাপাশি দেওয়া হয় মোটরসাইকেল, ফ্রিজ, টেলিভিশন, আলমারি, ক্রেস্টসহ নানা ধরনের পুরস্কার। বড় আয়োজনগুলোতে কয়েক লাখ টাকা পর্যন্ত পুরস্কার ঘোষণা করা হয়। তবে পুরস্কারের আকর্ষণ থাকলেও নৌকা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণের ব্যয় দিন দিন বেড়ে যাওয়ায় অনেক মালিকই আগের মতো নৌকা ধরে রাখতে পারছেন না।

সিংগাইরের ‘উরিয়া বাজ’ নৌকার মালিক আলী আকবর বলেন, “একটি বাইচের নৌকা তৈরি ও রক্ষণাবেক্ষণে প্রতি বছর কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হয়। তারপরও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্য আমরা নৌকা সংরক্ষণ করছি। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহযোগিতা পেলে নতুন প্রজন্মকে আরও বেশি সম্পৃক্ত করা সম্ভব হবে।”

‘হাজারী তরী’ নৌকার মালিক মো. সোহরাব হোসেন বলেন, “আগের তুলনায় বাইচের আয়োজন কমেছে। জেলা প্রশাসন ও ক্রীড়া সংগঠনগুলো নিয়মিত প্রতিযোগিতার আয়োজন করলে এই ঐতিহ্য আরও বিকশিত হবে।”

সিংগাইরের বলধারা গ্রামের নৌকার মাঝি সুরোজ মাঝি বলেন, “নৌকা বাইচ শুধু খেলা নয়, এটি আমাদের শিকড়ের অংশ। একটি বাইচ দেখতে নদীর দুই তীরে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়। এই সংস্কৃতি হারিয়ে গেলে গ্রামের বড় একটি আনন্দও হারিয়ে যাবে।”

সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, ছড়াকার, কবি ও ঔপন্যাসিক মুহাম্মদ কুদ্দুসুর রহমান বলেন, বর্ষায় নৌকা বাইচ এবং শীতে গরু দৌড় বা গরু দাবড়ানো গ্রামবাংলার শত বছরের ঐতিহ্য। বর্ষায় গ্রামের মানুষের ব্যস্ততা তুলনামূলক কম থাকায় এ সময় নৌকা বাইচকে ঘিরে মানুষ আনন্দ-বিনোদনে মেতে ওঠে। তিনি বলেন, আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামবাংলার আনন্দ-বিনোদনের অনেক উৎস হারিয়ে যাচ্ছে। ফলে নৌকা বাইচের আয়োজনও আগের তুলনায় কমেছে। নদী ও মানুষের দীর্ঘদিনের সম্পর্কের এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে নিয়মিত নৌকা বাইচ আয়োজন প্রয়োজন। তিনি আরও বলেন, ঐতিহ্যবাহী নৌকা সংরক্ষণে আর্থিক সহায়তা, দক্ষ মাঝি তৈরির উদ্যোগ এবং নৌকা বাইচকে পর্যটনের সঙ্গে যুক্ত করা গেলে এ ক্রীড়ার পরিধি আরও বাড়ানো সম্ভব।

মানিকগঞ্জের জেলা প্রশাসক নাজমুন আরা সুলতানা বলেন, “নৌকা বাইচ আমাদের লোকজ ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। নিরাপদ ও সুশৃঙ্খল পরিবেশে প্রতিযোগিতা আয়োজন এবং এই ঐতিহ্য সংরক্ষণে জেলা প্রশাসন প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করবে।”

নদী শুকিয়ে গেলে যেমন হারিয়ে যায় বৈঠার শব্দ, তেমনি হারিয়ে যেতে পারে একসময়ের প্রাণবন্ত এই লোকজ ক্রীড়াও। সিংগাইরের নদীতে এখনো যখন একসঙ্গে শত বৈঠা ওঠে-নামে, তখন মনে হয়—বাংলার সেই পুরোনো দিনগুলো বুঝি এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি।

প্রয়োজন শুধু নিয়মিত আয়োজন, পৃষ্ঠপোষকতা ও নতুন প্রজন্মের অংশগ্রহণ। তাহলেই হয়তো নদীর বুক চিরে বহু বছর ধরে আবারও ভেসে আসবে সেই চিরচেনা ধ্বনি—‘হেইও হেইও, জোরে বৈঠা মারো!’

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

স্কুলের বেতন দিতে না পারা সেই সালমানের সম্পদ এখন কত

স্কুলের বেতন দিতে না পারা সেই সালমানের সম্পদ এখন কত

কেন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন কোয়েল মল্লিক

কেন তৃণমূল ছেড়ে বিজেপিতে গেলেন কোয়েল মল্লিক

ইয়েমেনে শতাধিক যুদ্ধবিমান নিয়ে সৌদি জোটের হামলা

ইয়েমেনে শতাধিক যুদ্ধবিমান নিয়ে সৌদি জোটের হামলা

নৌকার বৈঠায় এখনো জেগে ওঠে সিংগাইর

নৌকার বৈঠায় এখনো জেগে ওঠে সিংগাইর

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App