ডেঙ্গু থেকে শিশুদের সুরক্ষায় ইউনিসেফের জরুরি পরামর্শ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৪ জুলাই ২০২৬, ০৩:০৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
এশিয়াজুড়ে ডেঙ্গুর সংক্রমণ বাড়ছে, আর এতে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। তবে কিছু সহজ সতর্কতা মেনে চললে ডেঙ্গুর ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছে ইউনিসেফ। সংস্থাটি বলছে, মশার কামড় প্রতিরোধ, ডেঙ্গুর লক্ষণ দ্রুত শনাক্ত করা এবং সময়মতো চিকিৎসা নেওয়াই শিশুদের সুরক্ষার সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
ইউনিসেফ জানিয়েছে, কিছু দেশে ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য ডেঙ্গুর টিকা পাওয়া যাচ্ছে। সাধারণত বেসরকারি ক্লিনিকের মাধ্যমে এই টিকা দেওয়া হয়। এ বিষয়ে অভিভাবকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরও দিয়েছে সংস্থাটির বিশেষজ্ঞরা।
ডেঙ্গু কী এবং কীভাবে ছড়ায়
ডেঙ্গু হলো ভাইরাসজনিত ফ্লু-সদৃশ একটি রোগ, যা এডিস মশার কামড়ে ছড়ায়। অনেক আক্রান্ত ব্যক্তির কোনো উপসর্গ দেখা না দিলেও কারও কারও জ্বর ও শারীরিক অসুস্থতা দেখা দেয়। কিছু ক্ষেত্রে এটি গুরুতর আকার ধারণ করে এবং দ্রুত চিকিৎসা না পেলে প্রাণঘাতীও হতে পারে।
ডেঙ্গু ভাইরাস বহনকারী এডিস মশা কামড়ালে এই রোগ হয়। সাধারণত বর্ষাকাল এবং বর্ষার পর স্থির পানিতে মশার বংশবিস্তার বেড়ে যাওয়ায় সংক্রমণও বাড়ে।
কখন সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে
এডিস মশা মূলত দিনের বেলায়, বিশেষ করে সূর্যোদয়ের দুই ঘণ্টা পর এবং সূর্যাস্তের আগে বেশি কামড়ায়। তাই এ সময়গুলোতে বিশেষ সতর্ক থাকার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ। বাড়ি, স্কুল কিংবা আশপাশে কোথাও পানি জমে থাকলে সেখানে এডিস মশার বংশবিস্তার হতে পারে। বালতি, টায়ার, ফুলের টব, বোতলের ঢাকনা বা অল্প পানিযুক্ত যেকোনো পাত্রই মশার প্রজননস্থল হয়ে উঠতে পারে।
ডেঙ্গু কি একজন থেকে আরেকজনে ছড়ায়?
ডেঙ্গু সরাসরি একজনের কাছ থেকে আরেকজনে ছড়ায় না। স্পর্শ, খাবার ভাগাভাগি বা একই ঘরে থাকার মাধ্যমে সংক্রমণ হয় না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির রক্তে প্রথম সপ্তাহে ভাইরাস থাকে। এ সময় কোনো মশা তাকে কামড়ালে সেই মশার মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি সংক্রমিত হতে পারেন। গর্ভবতী মা ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হলে বিরল ক্ষেত্রে গর্ভের শিশুও সংক্রমিত হতে পারে।
আরো পড়ুন : ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে হাসপাতালে ভর্তি ১৩৯ জন
কেন শিশুদের ঝুঁকি বেশি
ইউনিসেফ বলছে, ছোট শিশু, বিশেষ করে নবজাতকদের রোগ প্রতিরোধক্ষমতা পুরোপুরি গড়ে না ওঠায় গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি থাকে। তাই তাদের মশার কামড় থেকে সুরক্ষিত রাখা এবং লক্ষণ দেখা দিলে দ্রুত চিকিৎসকের কাছে নেওয়া অত্যন্ত জরুরি।
গর্ভবতী নারীদের ক্ষেত্রেও ডেঙ্গু জটিলতা তৈরি করতে পারে। এতে অকাল প্রসব, কম ওজনের শিশু জন্ম এবং ভ্রূণের সমস্যার ঝুঁকি বাড়ে।
ডেঙ্গুর সাধারণ লক্ষণ
ডেঙ্গুর উপসর্গ সাধারণত সংক্রমিত মশার কামড়ের ৪ থেকে ১০ দিনের মধ্যে দেখা দেয় এবং ২ থেকে ৭ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হতে পারে।
প্রধান লক্ষণগুলো হলো—
- হঠাৎ ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত জ্বর
- তীব্র মাথাব্যথা
- চোখের পেছনে ব্যথা
- পেশি ও গাঁটে ব্যথা
- বমি বমি ভাব বা বমি
- গ্রন্থি ফুলে যাওয়া
- ত্বকে ফুসকুড়ি
শিশুদের ক্ষেত্রে খিটখিটে মেজাজ, কম খাওয়া, অতিরিক্ত ঘুম বা অস্বাভাবিক আচরণও ডেঙ্গুর লক্ষণ হতে পারে।
কখন দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে
ডেঙ্গু দ্রুত গুরুতর আকার নিতে পারে। তাই নিচের যেকোনো লক্ষণ দেখা দিলে জরুরি ভিত্তিতে হাসপাতালে নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ—
- তীব্র পেটব্যথা
- বারবার বমি
- দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস
- নাক বা মাড়ি দিয়ে রক্তপাত
- অতিরিক্ত দুর্বলতা
- বমি বা পায়খানার সঙ্গে রক্ত
- অতিরিক্ত তৃষ্ণা
- ফ্যাকাশে ও শুষ্ক ত্বক
- অস্বাভাবিক ঘুমঘুম ভাব বা খিটখিটে আচরণ
- পানিশূন্যতার লক্ষণ
ডেঙ্গুতে শিশুদের শরীরে দ্রুত পানিশূন্যতা দেখা দিতে পারে। এর লক্ষণগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- মুখ ও ঠোঁট শুকিয়ে যাওয়া
- চোখ কোটরে ঢুকে যাওয়া
- কম প্রস্রাব হওয়া
- গাঢ় হলুদ প্রস্রাব
- কান্নার সময় চোখে পানি না আসা
- হাত-পা ঠান্ডা হয়ে যাওয়া
- অতিরিক্ত ক্লান্তি বা অস্থিরতা
এসব লক্ষণ দেখা দিলেও দ্রুত চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে।
মৃদু ডেঙ্গুর যত্ন
- ডেঙ্গুর নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই। চিকিৎসার মূল লক্ষ্য হলো জ্বর ও ব্যথা নিয়ন্ত্রণ এবং শরীরে পর্যাপ্ত পানি বজায় রাখা।
- ইউনিসেফের পরামর্শ—
- পর্যাপ্ত বিশ্রাম নিন
- বেশি করে পানি পান করুন
- পুষ্টিকর খাবার খান
- চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী প্যারাসিটামল সেবন করুন
- জ্বর কমাতে ভেজা কাপড় দিয়ে শরীর মুছে দিন
আইবুপ্রোফেন, অ্যাসপিরিন বা অন্যান্য এনএসএইড ওষুধ এড়িয়ে চলুন, কারণ এগুলো রক্তক্ষরণের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
কারা বেশি ঝুঁকিতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, ডেঙ্গু আক্রান্তদের প্রায় ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে রোগটি গুরুতর হতে পারে। আগে ডেঙ্গু হয়ে থাকলে এবং পরে ভিন্ন ধরনের ডেঙ্গু ভাইরাসে আক্রান্ত হলে গুরুতর ডেঙ্গুর ঝুঁকি বেশি থাকে। এছাড়া যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, সেখানে বসবাস বা নিয়মিত যাতায়াতকারীদেরও ঝুঁকি বেশি।
কীভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়
ডেঙ্গুর লক্ষণ জিকা, চিকুনগুনিয়া বা ম্যালেরিয়ার মতো অন্যান্য রোগের সঙ্গে মিল থাকতে পারে। তাই শুধু উপসর্গ দেখে নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়। ডেঙ্গু শনাক্তের একমাত্র নির্ভরযোগ্য উপায় হলো পরীক্ষাগারে রক্ত পরীক্ষা।
ডেঙ্গুর টিকা
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি এমন এলাকায় বসবাসকারী ৬ থেকে ১৬ বছর বয়সী শিশুদের জন্য কিউ-ডেঙ্গা টিকার সুপারিশ করেছে। এই টিকা তিন মাসের ব্যবধানে দুটি ডোজে দেওয়া হয়। অনেক দেশে এটি এখনো সরকারি হাসপাতালে পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন হলে বেসরকারি ক্লিনিকে বা স্থানীয় স্বাস্থ্যকর্মীর পরামর্শ নিয়ে টিকা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছে ইউনিসেফ।
