ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক
জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকট বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য বড় হুমকি
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০১ আগস্ট ২০২৬, ০১:১৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ইউরোপীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের (ইসিবি) জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারক ফ্রাঙ্ক এল্ডারসন সতর্ক করে বলেছেন, জলবায়ু পরিবর্তন ও প্রকৃতির অবক্ষয় বৈশ্বিক অর্থনীতির জন্য ক্রমবর্ধমান ঝুঁকি তৈরি করছে। তাঁর মতে, প্রকৃতিনির্ভর সেবাগুলোর (ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস) দ্রুত অবনতি আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। খবর দ্য গার্ডিয়ানের।
ইসিবির নির্বাহী বোর্ডের সদস্য এল্ডারসন জানান, প্রকৃতিনির্ভর সেবার ধ্বংসের ফলে ব্যাংকিং খাতে কী ধরনের আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা পর্যবেক্ষণ জোরদার করেছে ইউরোজোনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
তিনি বলেন, প্রকৃতিনির্ভর এসব সেবা আর স্থিতিশীল নেই, বরং দ্রুত হ্রাস পাচ্ছে। এ কারণেই আমরা জলবায়ু ও প্রকৃতির সংকট নিয়ে কথা বলছি। ব্যাংকগুলোর প্রকৃতির ওপর নির্ভরতা ও ঝুঁকির মাত্রা বিশ্লেষণ করে আমরা দেখছি, বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সম্প্রতি ফ্রান্স ও স্পেনে রেকর্ড তাপপ্রবাহের মধ্যে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়ে। এতে বিস্তীর্ণ এলাকা, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ি পুড়ে গেছে। প্রাণহানির পাশাপাশি এসব দুর্যোগের অর্থনৈতিক ক্ষতিও হবে ব্যাপক।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ানকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে এল্ডারসন বলেন, বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোগের সংখ্যা ও তীব্রতা বাড়ছে, যা আর্থিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি হয়ে উঠেছে। তাঁর মতে, প্রকৃতিনির্ভর সেবার অবক্ষয়ের ঝুঁকি নিরূপণ করা আরো জটিল। কারণ এটি একটি একক প্রাকৃতিক দুর্যোগের প্রভাব মূল্যায়নের চেয়ে অনেক বেশি বিস্তৃত।
ইকোসিস্টেম সার্ভিসেস বলতে প্রকৃতির এমন সব সুবিধাকে বোঝায়, যা মানুষের জীবন ও অর্থনীতিকে সহায়তা করে। যেমন- পানি কাঁচামাল, জলবিদ্যুৎ উৎপাদন ও পরিবহনের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হয়। একই সঙ্গে এটি সামুদ্রিক প্রাণীর আবাসস্থল, খাদ্য উৎপাদনের ভিত্তি এবং বিনোদনমূলক কর্মকাণ্ডেরও গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।
এল্ডারসন বলেন, প্রকৃতি-সম্পর্কিত ঝুঁকি ঋণঝুঁকি, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘমেয়াদে আর্থিক স্থিতিশীলতার ওপর উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলতে পারে।তিনি বলেন, আমি আগেও বলেছি, যদি আপনি প্রকৃতিকে ধ্বংস করেন, তবে সেই ভিত্তিকেই ধ্বংস করবেন, যার ওপর আমাদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে। এটি কোনো আবেগনির্ভর পরিবেশবাদ নয়, এটি অর্থনীতি, আর্থিক স্থিতিশীলতা এবং মূল্যস্থিতির মূল বিষয়।
আরো পড়ুন : ভয়ংকর হচ্ছে এল নিনো, বিশ্বজুড়ে তাপপ্রবাহ-খরা-বন্যার শঙ্কা
ইউরোপের বৃহৎ ব্যাংকগুলোর তদারকির দায়িত্বে থাকা ইসিবি ইতোমধ্যে একটি কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর মাধ্যমে প্রকৃতিনির্ভর সেবার ক্ষয়ক্ষতি কীভাবে ব্যাংকিং খাতকে ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে, তা মূল্যায়ন করা হবে।
চলতি বছরের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় ব্যাংক একটি বিশ্লেষণ প্রকাশ করবে, যেখানে ‘ইকোসিস্টেম অবক্ষয়ের ধারা’ কীভাবে ইউরোজোনের ব্যাংকগুলোর ঋণক্ষতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে, তা তুলে ধরা হবে।
ডাচ আইনজীবী ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকার ফ্রাঙ্ক এল্ডারসন ২০১৭ সালে সাবেক ব্যাংক অব ইংল্যান্ডের গভর্নর মার্ক কার্নি এবং ব্যাংক দ্য ফ্রান্সের গভর্নর ফ্রাঁসোয়া ভিলেরোয়া দ্য গালোর সঙ্গে মিলে নেটওয়ার্ক ফর গ্রিনিং দ্য ফাইন্যান্সিয়াল সিস্টেম (এনজিএফএস) প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। বর্তমানে বিশ্বের ১১৪টি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও আর্থিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা জলবায়ুজনিত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় এ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে কাজ করছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রেসিডেন্সির সময় জলবায়ুকেন্দ্রিক আর্থিক নীতির বিরুদ্ধে চাপ বৃদ্ধি পায়। জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর অর্থনীতিতে যুক্ত থাকতে চাওয়া বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের চাপের মুখে যুক্তরাষ্ট্র গত বছর এনজিএফএস থেকে সরে যায়। ফলে বিশ্বের বৃহত্তম অর্থনীতির অংশগ্রহণ ছাড়াই জলবায়ুজনিত আর্থিক ঝুঁকি মোকাবিলায় ইউরোপকে নেতৃত্ব দিতে হচ্ছে।
তবু এল্ডারসনের দাবি, ইউরোপের ব্যাংকগুলো এখনো জলবায়ু ও প্রকৃতিসংশ্লিষ্ট ঝুঁকিকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি বলেন, ইউরোপে এমন কোনো ব্যাংক খুঁজে পাওয়া কঠিন, যারা আন্তরিকভাবে বলবে যে এসব ঝুঁকি তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নয়। আমার মনে হয়, সেই সময় এখন আর নেই।
