বিদেশে থাকা ৪২ ঋণখেলাপির সম্পদ উদ্ধারে ৮ সংস্থা
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ আগস্ট ২০২৬, ১০:৩৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
ব্যাংক খাত থেকে আত্মসাৎ ও বিদেশে পাচার করা বিপুল অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বড় উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত ১১টি শিল্পগোষ্ঠীর পর এবার আরও ৪২টি বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বিদেশে থাকা সম্পদ শনাক্ত, জব্দ ও দেশে ফেরাতে আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও তদন্তকারী সংস্থাকে কাজে লাগানো হচ্ছে।
যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও সংযুক্ত আরব আমিরাতসহ ১২টি দেশে এসব প্রতিষ্ঠানের গোপনে গড়ে তোলা সম্পদের অবস্থান শনাক্ত করে সংশ্লিষ্ট দেশের আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তা উদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ২০০ কোটি টাকার বেশি খেলাপি ঋণ থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোর সম্পদ উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর সঙ্গে ইতোমধ্যে চুক্তি ও কার্যক্রম শুরু হয়েছে।
রোববার (৯ আগস্ট) বিকেলে এসব প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দেওয়া ৩৮টি ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকে আয়োজিত বৈঠকে এসব বিষয়ে আলোচনা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।
আরও পড়ুন: সপ্তাহের ব্যবধানে ডিমের ডজন ১৮০ টাকা
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মোস্তাকুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত বৈঠকে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকগুলোর ব্যবস্থাপনা পরিচালকরা উপস্থিত ছিলেন। যেসব ব্যাংক এখনো বিদেশে সম্পদ উদ্ধারে নিয়োজিত আটটি আন্তর্জাতিক আইনি ও পেশাদার পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি করেনি, তাদের দ্রুত চুক্তি সম্পন্ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের ঋণ তথ্য ব্যুরোর (সিআইবি) ডাটাবেজ বিশ্লেষণ করে এসব প্রতিষ্ঠানের নামে-বেনামে বিদেশে অর্থ পাচারের প্রাথমিক তথ্য পাওয়া গেছে। তালিকায় এসবি এক্সিম গ্রুপ, হাবিব গ্রুপ, ইয়াসীর গ্রুপ, এডব্লিউআর গ্রুপ, লিবার্টি গ্রুপ, প্রিমিয়ার গ্রুপ, লস্কর গ্রুপ ও সাদ মুসা গ্রুপের মতো বড় শিল্পগোষ্ঠী রয়েছে।
প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, এসব প্রতিষ্ঠানের পাচার করা সম্পদ যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কানাডা, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, বেলজিয়াম, নিউজিল্যান্ড, হংকং, চীন, থাইল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ায় ছড়িয়ে রয়েছে।
অর্থ ও সম্পদ উদ্ধারের এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছে গ্র্যান্ট থর্নটন, আরআই কনসোর্টিয়াম, বেকার ম্যাকেঞ্জি অ্যান্ড পিডব্লিউসি, ডিএলএ পাইপার অ্যান্ড ক্রোল, ইওয়াই অ্যান্ড ডেন্টনস, রহমান রাভেলি অ্যান্ড ইন্টারপাথ, বিসিজি অ্যান্ড এইচএইচআর এবং অ্যানিমাস অ্যাসোসিয়েটস।
সম্পদ উদ্ধারের প্রক্রিয়ায় কোনো ব্যাংককে আগাম অর্থ পরিশোধ করতে হবে না। ‘নো উইন, নো পে’ নীতিতে পুরো কার্যক্রম পরিচালিত হবে। অর্থাৎ আন্তর্জাতিক পরামর্শক প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের অর্থে বিদেশে থাকা সম্পদের সন্ধান ও আইনি লড়াই পরিচালনা করবে। পরে উদ্ধার হওয়া সম্পদের একটি নির্দিষ্ট অংশ তাদের পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া হবে।
সম্পদ উদ্ধারের আইনি প্রক্রিয়া সম্পর্কে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান জানান, প্রথম ধাপে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে বিদেশে থাকা সম্পদের অবস্থান ও আর্থিক পরিমাণ শনাক্ত করা হবে। এরপর সংশ্লিষ্ট দেশের আইন অনুযায়ী সম্পদ ফ্রিজ বা জব্দের উদ্যোগ নেওয়া হবে। সর্বশেষ ধাপে আদালতের নির্দেশে এসব সম্পদ বিক্রি বা নিষ্পত্তি করে পাওয়া অর্থ বাংলাদেশে ফিরিয়ে এনে ব্যাংকগুলোর খেলাপি ঋণের সঙ্গে সমন্বয় করা হবে।
বৈঠক শেষে মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ মাহবুবুর রহমান বলেন, দেশ থেকে বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে চলে গেছে। এসব অর্থ দেশে ফিরিয়ে আনতে ব্যাংকগুলো সমন্বিতভাবে কাজ শুরু করেছে। অর্থ উদ্ধারের পাশাপাশি পাচারের সঙ্গে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের লুটপাট বন্ধের বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রথম ধাপে সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পরিবার এবং শীর্ষ ১০টি বিতর্কিত শিল্পগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে যৌথ তদন্ত শুরু হয়। এনবিআরের সিআইসি, সিআইডি ও দুদকের যৌথ কার্যক্রমে ইতোমধ্যে দেশে-বিদেশে তাদের প্রায় ৭৬ হাজার কোটি টাকার সম্পদ জব্দ করা হয়েছে।
এবার দ্বিতীয় ধাপে ৪২টি বড় ঋণখেলাপি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে একই ধরনের কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
