প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তা
দ্রুত প্রবিধান বাস্তবায়ন চায় জনস্বাস্থ্যবিদরা, সময় ও ফাঁক-ফোকর খুঁজছে ব্যবসায়ীরা
সেবিকা দেবনাথ
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:১৭ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
বাহারি রঙের প্যাকেট, আকর্ষণীয় বিজ্ঞাপন আর নানা ধরনের স্বাস্থ্যগুণের দাবি। পাড়ার মুদি দোকান থেকে সুপারশপের তাক—সবখানেই থরে থরে সাজানো সহজলভ্য প্যাকেটজাত ও প্রক্রিয়াজাত খাবার। কোনোটিতে চিপস, কোনোটি বিস্কুট, কোনোটি নুডলস, আবার কোনোটি কোমল পানীয় বা মিষ্টিজাতীয় খাবার। শিশু-কিশোরদের কাছে এসব খাবারের জনপ্রিয়তাও দিন দিন বাড়ছে। কিন্তু বাহারি মোড়কের আড়ালে অতিরিক্ত লবণ, চিনি, চর্বি ও অন্যান্য উপাদান থাকলে তা কতটা ক্ষতিকর— সে তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই ভোক্তার চোখের সামনে স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয় না।
ঢাকার একটি বেসরকারি স্কুলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী লামিয়া। স্কুল থেকে ফেরার পথে মায়ের সঙ্গে প্রায় প্রতিদিনই তাকে থামতে হয় রাস্তার পাশের দোকানে। তার পছন্দের তালিকায় থাকে চিপস, চকলেট বা ক্রিম দেয়া মিষ্টি বিস্কুট ও বিভিন্ন ধরনের প্যাকেটজাত স্ন্যাকস। স্কুলের পাশে বসা ঝালমুড়ি ও ভেলপুড়ি খেতেও লামিয়ার বেশ লাগে। কিন্তু মা মমতাজ বেগম বাইরের খোলা অস্বাস্থ্যকর খাবার মেয়েকে দিতে চান না, তাই প্যাকেটজাত খাবারই কিনে দেন।
মমতাজ বেগম বলেন, মনিং সিফটের স্কুল। সকালে মেয়েটা কিছু খেতে চায় না। স্কুল থেকে বাসায় ফেরার পথে ওর ক্ষুধাও পেয়ে যায়। তখন ঝাল মুড়ি, ভেলপুড়িসহ খোলা খাবার না হলে প্যাকেটের খাবারও খেতে চায়। না কিনে উপায়ও থাকে না। তখন প্যাকেটের খাবারটাই কিনে দেই। তবে কয়েক মাস ধরে মেয়ের খাবারের অভ্যাস নিয়ে উদ্বিগ্ন মমতাজ। তিনি বলেন, বাসায় গিয়ে মেয়েটা আর খেতে চায় না। বকাবকি করেও খাওয়াতে পারি না।
প্যাকেটের খাবারে কী কী উপাদন থাকে সে সম্পর্কে তিনি জানেন কি না এমন প্রশ্নের উত্তরে মমতাজ বলেন, ওকে যদি বলি এসব ভালো না, কোনটায় বেশি মিষ্টি, কোনটায় বেশি লবণ। মেয়েতো এসব বোঝে না। লামিয়া শুধু বলে, বন্ধুরা এটা খায়, সেও খাবে। স্কুল ছুটির পর পাশে থাকা দোকানগুলোতে বাচ্চাদের ভিড়তো দেখেছেন। ওরাতো ছোট। ওরাতো আর খাবারের মান কেমন তা দেখে না, বুঝেও না। ওরা দেখে প্যাকেটের রং, কার্টুন, খেলনা বা উপহার পাওয়ার সুযোগ এবং টেলিভিশন বা অনলাইনে দেখা চটকদার বিজ্ঞাপন। প্যাকেটের পেছনে পুষ্টি উপাদানের তালিকা থাকলেও তা এত ছোট অক্ষরে লেখা যে, কোন খাবারে কতটা চিনি, লবণ বা চর্বি রয়েছে—তা বোঝা দুষ্কর। প্যাকেটের গায়ে যে সংখ্যাগুলো লেখা হয় সেগুলোও বোঝার কোন উপায় নাই। লেখাগুলো যদি বড় অক্ষরে থাকতো তাহলে আমরাও জানতে পারতাম।
একজন লামিয়ার ঘটনা হাজারো পরিবারের বাস্তবতা। আর ছোট এই ঘটনাটিই বড় একটি জনস্বাস্থ্য সমস্যার প্রতিচ্ছবি। তবে শুধু শিশুরা নয়। বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত বলছে, দেশে প্রায় ৯৭ শতাংশ মানুষ নিয়মিত প্যাকেটজাত খাবার খাচ্ছে। তারা খাবারের প্রকৃত পুষ্টিমান ও স্বাস্থ্যঝুঁকি সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা না নিয়েই খাদ্য নির্বাচন করছেন।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্যাকেটজাত খাবারগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয় (লবণ, চিনি ও টেস্টিং সল্টের মিশ্রণে), যা মস্তিষ্কে এক ধরনের সাময়িক আনন্দ দেয়। ফলে যারা এসব খাবার খায় বিশেষ করে শিশুরা একবার এ স্বাদ পেলে বাড়িতে তৈরি পুষ্টিকর খাবারের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে। এই বাস্তবতায় প্যাকেটের সামনের অংশে স্পষ্ট স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা দেয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে। জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ, ভোক্তা অধিকারকর্মী ও বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের বক্তব্য—এসব খাবারে অতিরিক্ত কতটা চিনি, কতটা লবণ, কতটা ক্ষতিকর চর্বি আছে—সে সম্পর্কে অধিকাংশ ক্রেতাই জানেন না। কিংবা প্যাকেটের ভেতরে থাকা খাবারে কতটা চিনি, লবণ, চর্বি আছে সে সম্পর্কে ক্রেতাকে সহজ ভাষায় সতর্ক করা হলে সুফল আসবে। কেননা, গবেষণা বলছে, অস্বাস্থ্যকর প্যাকেটজাত পণ্য কেনার বিষয়ে আগ্রহ কমানোর ক্ষেত্রে ওয়ার্নিং লেবেল বা সতর্কতামূলক লেবেল ক্রেতার মধ্যে সবচেয়ে শক্তিশালী প্রভাব ফেলে।
তারা জানান, ৭১টি দেশে ‘ফ্যাট-ফ্রি’-এর মতো পুষ্টি বিষয়ক দাবির ওপর নীতিমালা রয়েছে। ৪৪টি দেশে সম্পূরক তথ্য হিসেবে ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং (এফওপিএল) প্রবর্তন করা হয়েছে, যার মধ্যে ১৬টি দেশে তা বাধ্যতামূলক। এই ১৬টি দেশ হলো— আর্জেন্টিনা, বলিভিয়া, ব্রাজিল, কানাডা, চিলি, কলম্বিয়া, ইকুয়েডর, মেক্সিকো, পেরু, উরুগুয়ে, ভেনেজুয়েলা, ইসরায়েল, ইরান, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড ও সিঙ্গাপুর। বাংলাদেশ সরকারও সেই পথে এগোচ্ছে।
ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং কী?
২০১৯ সালের মে মাসে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ‘স্বাস্থ্যকর ডায়েট প্রচারের জন্য ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিংয়ের নির্দেশিকা এবং ফ্রেমওয়ার্ক ম্যানুয়াল’ প্রকাশ করে। এর উদ্দেশ্য ছিল দেশগুলোর মধ্যে উপযুক্ত ফ্রন্ট অব প্যাকেজ লেবেলিং ব্যবস্থা তৈরি, বাস্তবায়ন এবং মূল্যায়নে সহায়তা করা। এরই ধারাবাহিকতায় বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা, বাংলাদেশ এবং স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় যৌথভাবে খাদ্য মন্ত্রণালয়ের অধীনে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে বিএসটিআই-এর সঙ্গে অ্যাডভোকেসি কার্যক্রম শুরু করে।

ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং হলো খাদ্যপণ্যের প্যাকেটের সামনের অংশে সহজভাবে দৃশ্যমান সতর্কবার্তা বা তথ্য প্রদর্শনের একটি পদ্ধতি। এতে স্পষ্টভাবে জানানো হয় কোনো খাদ্যে অতিরিক্ত চিনি, লবণ বা চর্বি আছে কিনা, যাতে ভোক্তারা দ্রুত ও সচেতন সিদ্ধান্ত নিতে পারেন। যেমন- কোনো চিপসের প্যাকেটে সামনে লাল চিহ্ন দিয়ে লেখা থাকতে পারে ‘অতিরিক্ত লবণ’, অথবা কোনো জুসের প্যাকেটে ‘উচ্চ চিনি’ উল্লেখ থাকতে পারে।
গবেষণা তথ্য যা বলছে
বাংলাদেশে অতি-প্রক্রিয়াজাত খাবারের ব্যবহার বাড়ছে—এমন উদ্বেগ জনস্বাস্থ্য মহলে দীর্ঘদিনের। সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের বাজারে প্রচলিত বিভিন্ন প্রক্রিয়াজাত খাবার পরীক্ষা করে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও চর্বির উপস্থিতির বিষয়টি তুলে ধরা হয়েছে। কিছু পণ্যে চিনি বা ক্ষতিকর চর্বির মাত্রা উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি পাওয়ার কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এর অর্থ এই নয় যে সব প্যাকেটজাত খাবারই ক্ষতিকর। বরং সমস্যা হচ্ছে—কোন পণ্যটি কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ, সেটি যেন ভোক্তা সহজে বুঝতে পারেন। এখানেই সতর্কবার্তার গুরুত্ব।
২০২৫ সালের ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ পরিচালিত ‘অ্যাসেসমেন্ট অব সল্ট কন্টেন্ট অ্যান্ড লেবেল কমপ্লায়েন্স অব কমনলি কনজিউমড প্রসেসড প্যাকেজড ফুডস অব বাংলাদেশ’ শীর্ষক এক গবেষণায়, দেশের বাজারে বিপণন করা প্রক্রিয়াজাত প্যাকেট খাবারের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ বা ৬১ শতাংশে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। যেখানে প্রতি ১০০ গ্রাম খাবারে সর্বোচ্চ ৭৫০ মিলিগ্রাম পর্যন্ত লবণ স্বাস্থ্যের জন্য নিরাপদ, সেখানে এসব খাবারে নিরাপদ মাত্রার চেয়ে বেশি লবণ পাওয়া গেছে। এসব প্যাকেটজাত খাবারের মধ্যে রয়েছে—বিস্কুট, চিপস, চানাচুর, নুডুলস, ইনস্ট্যান্ট স্যুপ, ঝালমুড়ি, আচার, চাটনি ইত্যাদি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব খাবারে ব্যবহৃত কৃত্রিম প্রিজারভেটিভ ও কেমিক্যাল হৃদরোগের পাশাপাশি মরণব্যাধি ক্যানসারের ঝুঁকি বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। এটি আমাদের শিশুদের খাদ্যাভ্যাসে এক নীরব বিপর্যয় ডেকে আনছে। টিফিনে দেয়া চিপস বা কৃত্রিম জুস তাদের স্থূলতা ও টাইপ-২ ডায়াবেটিসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশের (এনএইচএফবি) একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, দেশের বাজারে থাকা প্যাকেটজাত খাবারের প্রায় ৯৭ শতাংশই উচ্চ স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ। উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক ক্ষেত্রে মোড়কের গায়ে ‘পুষ্টিগুণ’ বা ‘লবণের মাত্রা’ সংক্রান্ত যে তথ্য দেয়া থাকে, ল্যাবে পরীক্ষার পর তার সত্যতা পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ‘সুগার ফ্রি’ বা ‘লো ফ্যাট’ দাবি করা অনেক খাবারেও হৃদযন্ত্রের জন্য ক্ষতিকর কেমিক্যালের উপস্থিতি মিলেছে। গবেষণায় দেখা যায়, দেশের প্রায় শতকরা ৯৭ ভাগ মানুষ সপ্তাহে অন্তত একবার প্যাকেটজাত খাবার খাচ্ছেন এবং অনেক ক্ষেত্রে এসব পণ্যে উচ্চমাত্রার লবণ রয়েছে। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো—পণ্যের মোড়কে এ তথ্য সব সময় পরিষ্কারভাবে উল্লেখ থাকে না।
প্যাকেটজাত খাবার সুস্বাদু করতে এতে প্রচুর পরিমাণে সোডিয়াম বা লবণ ব্যবহার করা হয়। গবেষণায় দেখা গেছে, একটি প্যাকেটজাত চিপস বা নুডুলসে যে পরিমাণ লবণ থাকে, তা একজন মানুষের সারাদিনের প্রয়োজনের তুলনায় অনেক বেশি। অতিরিক্ত সোডিয়াম সরাসরি রক্তচাপ বাড়িয়ে দেয়। উচ্চ রক্তচাপের কারণে হৃৎপিণ্ডকে রক্ত পাম্প করতে দ্বিগুণ পরিশ্রম করতে হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে হার্ট ফেইলিউরের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। শিশুরা পছন্দ করে এমন এক হাজার প্যাকেটজাত শিশুখাদ্যের উপর করা এই গবেষণায় আরো দেখা গেছে, প্যাকেটজাত ১০ ধরনের শিশুখাদ্যে প্রয়োজনের তুলনায় বেশি লবণ ব্যবহার করা হয়েছে। প্রতিটি প্যাকেটে ২১০ মিলিগ্রাম লবণ ও সোডিয়াম থাকা দরকার। কিন্তু এসব প্যাকেটে রয়েছে ৩৬১ মিলিগ্রাম লবণ ও সোডিয়াম যা সাধারণ পরিমাণের তুলনায় ১ দশমিক ৫ ভাগ বেশি। গবেষণায় বলা হয়েছে, মূলত বাংলাদেশে সরকারিভাবে প্রক্রিয়াজাত খাবারে লবণের সর্বোচ্চ কোনো সীমা নির্ধারণ করা নেই। যার ফলে কোম্পানিগুলো তাদের পণ্যে ইচ্ছেমতো লবণ যোগ করে।
আইন ও খসড়া প্রবিধানে যা আছে
২০১৭ সালের প্যাকেটজাত খাদ্য লেবেলিং ব্যবস্থাকে আরো বিস্তৃত করার উদ্যোগ হিসেবে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ) ২০২৬ সালের ‘নিরাপদ খাদ্য (মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং) প্রবিধানমালা’-এর খসড়া তৈরি করেছে।
আইন অনুযায়ী, মোড়কজাত খাবারের প্যাকেটে সব তথ্য পরিষ্কার ও সহজভাবে লিখতে হবে। কোনো ধরনের ভুল বা বিভ্রান্তিকর তথ্য দেয়া যাবে না। দেশে তৈরি খাবারের লেবেল অবশ্যই বাংলায় হতে হবে। বিদেশি খাবারের মূল লেবেল অন্য ভাষায় হলে তাতে আলাদাভাবে বাংলা স্টিকার বা সাব-লেবেল যুক্ত করা বাধ্যতামূলক। নতুন খসড়া প্রবিধানমালায় এই শর্তগুলো দেয়া হয়েছে। খাবার প্রক্রিয়াকরণ, সংরক্ষণ ও পরিবহনের বিশেষ নিয়ম থাকলে তাও প্যাকেটে উল্লেখ করতে হবে। চিকিৎসক বা কোনো বিশেষজ্ঞের নাম ব্যবহার করে এমন কিছু লেখা যাবে না যাতে ক্রেতা বিভ্রান্ত হন। রোগ নিরাময় বা পুষ্টি নিয়ে কোনো মিথ্যা দাবি করা নিষিদ্ধ। তবে অনুমোদন নিয়ে গুণগত মানের সিল ব্যবহার করা যাবে। খাবারের নামকরণের ক্ষেত্রেও স্পষ্ট নিয়ম মানতে হবে। খাবারটি গুঁড়ো, ঘনীভূত, ধূমায়িত বা হিমায়িত কি না— তা নামের সঙ্গেই থাকতে হবে। কোন উপাদান কতটুকু ব্যবহার করা হয়েছে তার ওজন বা অনুপাত উল্লেখ করতে হবে। অ্যালার্জি সৃষ্টি করতে পারে এমন উপাদান যেমন—গম, রাই, যব, চিংড়ি বা কাঁকড়া থাকলে তার সুস্পষ্ট ঘোষণা থাকতে হবে। জিনগত পরিবর্তিত খাবারের ক্ষেত্রে লিখতে হবে ‘জিএম খাদ্য’। দুধ থেকে তৈরি পণ্যের ক্ষেত্রে ননীযুক্ত বা পাস্তুরিত কি না, তা স্পষ্ট করতে হবে। ঘনীভূত বা মিষ্টি দুধের পাত্রে ‘শিশুদের জন্য উপযুক্ত নয়’ কথাটি পরিষ্কারভাবে লিখতে হবে। এ ছাড়া প্রতি ১০০ গ্রাম বা ১০০ মিলি খাবারে পুষ্টির পরিমাণও উল্লেখ করতে হবে।
খসড়া প্রবিধান অনুযায়ী, প্যাকেটজাত খাবারে অতিরিক্ত মাত্রায় চিনি, সোডিয়াম ও স্যাচুরেটেড ফ্যাট থাকা খাবারের ক্ষেত্রে সম্মুখভাগে সতর্কতামূলক লেবেল দেয়ার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ, প্যাকেটের পেছনে শুধু পুষ্টি উপাদানের তালিকা দিয়ে দায় শেষ করার সুযোগ থাকবে না। খাদ্যপণ্যের মোড়কে কালো অষ্টভুজাকার ‘সতর্কতা’ চিহ্ন বাধ্যতামূলকভাবে দিতে হবে।
জনস্বাস্থ্যবিদরা স্বাগত জানালেও ব্যবসায়ীদের আপত্তি
সরকারের এই সিদ্ধান্ত জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ইতিবাচক হিসেবে দেখলেও দেশীয় ও বিদেশী বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠী আপত্তি জানিয়েছে। প্যাকেটজাত খাদ্যদ্রব্যের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কতা চিহ্ন দেয়ার ক্ষেত্রে আপত্তি জানিয়েছে ব্যবসায়ীরা। এমন কি ব্যবসায়ীদের শীর্ষস্থানীয় সংগঠনের পক্ষ থেকেও তোলা হয়েছে আপত্তি। খাদ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর কাছে চিঠি দেয়া হয়েছে। সেখানে ওয়ার্নিং লেবেলের বদলে জিডিএ মডেল চালু করা; অন্তত ৫ বছর এই নিয়ম ঐচ্ছিক (মানতেই হবে এমন নয়) রাখা; ছোট প্যাকেটকে পুরোপুরি ছাড় দেয়াসহ কয়েকটি দাবি জানানো হয়েছে।
এছাড়া চিঠিতে দাবি করা হয়েছে, চিনি-লবণ-চর্বির যে সীমা ঠিক করা হয়েছে তা বাংলাদেশের খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গে যায় না। এত কড়া সীমা রাখলে বাজারের বেশিরভাগ চেনা-পরিচিত খাবারও ‘ক্ষতিকর’ চিহ্নের আওতায় চলে আসতে পারে — যেটা ক্রেতাদের মধ্যে অহেতুক ভয় বা ভুল ধারণা তৈরি করতে পারে। তারা আরো দাবি করেছে, প্যাকেজিং বদলানো, রেসিপি বদলানো (রিফরমুলেশন), নতুন নিয়ম মানার খরচ — এসব ছোট-মাঝারি প্রতিষ্ঠানের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়াবে।

জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্রের স্ট্যান্ডার্ড সংস্থা এনআইএসটির পক্ষ থেকেও স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা চিহ্ন দেয়ার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট ৩টি বিষয়ে জানানো হয়েছে। সেগুলো হলো-নতুন খসড়াটা এখনো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) বাণিজ্যের প্রযুক্তিগত বাধা (টিবিটি) কমিটিতে জানানো হয়নি — যা তাদের মতে ডব্লিউটিও’র নিয়মের সঙ্গে যায় না। আগের একটা সংস্করণ ২০২৩ সালে অন্য এক কমিটিতে জানানো হয়েছিল, কিন্তু এখনকার খসড়ায় অনেক পরিবর্তন হয়েছে — বিশেষ করে নতুন ওয়ার্নিং লেবেল আর সময়সীমার নিয়ম— তাই আগের জানানোর বিষয়টি যথেষ্ট কি না। এবং আন্তর্জাতিক পানীয় শিল্প সংগঠন ইন্টারন্যাশনাল কাউন্সিল অব বেভারেজ অ্যাসোসিয়েশনস যে আলাদাভাবে তাদের আপত্তি জানিয়েছে সেটা মনে করিয়ে দিয়েছে।
জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় কাজ করছে এমন সংগঠনের নেতারা বলছেন, জনস্বাস্থ্যকে আমলে না নিয়ে প্যাকেটজাত খাদ্যের মোড়কে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা চিহ্ন দিতে ব্যবসায়ীদের আপত্তি, এ ধরনের প্রস্তাব ও দাবি অত্যন্ত ভয়াবহ। ব্যবসায়িক স্বার্থ বিবেচনায় নিয়ে তারা জনস্বাস্থ্যকে ধ্বংস করতে চায়। প্যাকেট ছোটো হোক বা বড়ো হোক, সেটাতে উপাদানসমূহের তালিকা ও মাত্রা এবং স্বাস্থ্য সতর্কতা চিহ্ন থাকবে এটা স্বাভাবিক। যেকোনো পর্যায়ে ভোক্তাদের সেটা দেখে খাওয়া ও না খাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়ার স্বাধীনতা রয়েছে। অন্যদিকে ছোটো ছোটো প্যাকেটের খাদ্য সাধারণত শিশুরা বেশি ক্রয় করে। ফলে কোন যুক্তিতে তারা এটাতে দ্বিমত করছে সেটা বোধগম্য নয়।
এদিকে এক্ষেত্রে যুক্তরাষ্ট্রের আপত্তির বিষয়টি নিয়েও ক্ষোভ প্রকাশ করছেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, কোনো পণ্যে স্বাস্থ্য সংক্রান্ত সতর্কবার্তা দেয়ার জন্য কোনো দেশের বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা থেকে পূর্ব অনুমতি নেয়ার প্রয়োজন নেই। প্রতিটি দেশ তার জনগণের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় স্বাধীনভাবে নীতি বা নিয়ম তৈরি করার পূর্ণ সার্বভৌম অধিকার রাখে। বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিমালাতেও একই বিষয় স্পষ্ট করা হয়েছে। ফলে সরকার প্যাকেটজাত খাদ্যের মোড়কে যে স্বাস্থ্য সতর্কতা চিহ্ন দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেটা সঠিক আছে বলেই তারা মনে করছেন।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ে আটকে আছে খসড়া প্রবিধান
জানা যায়, খসড়া প্রবিধানমালাটি বর্তমানে খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সব প্রক্রিয়া শেষে এটি দ্রুতই চূড়ান্ত হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হলেও ইতোমধ্যেই ব্যবসায়ী ও কোম্পানির প্রতিনিধিরা এটি বিলম্বিত করতে জোড় তবদির শুরু করেছে বলেও জানা গেছে।
খসড়া প্রবিধানটি কোন পর্যায়ে রয়েছে এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সেন্টার ফর ল’ অ্যান্ড পলিসি অ্যাফেয়ার্স (সিএলপিএ)-এর সিনিয়র নীতি বিশ্লেষক কামরুন্নিছা মুন্না বলেন, প্রবিধানটি খাদ্য মন্ত্রণালয়ে রয়েছে। সরকারের পক্ষ থেকে প্যাকেটের সামনে সতর্কবার্তা দেয়ার জন্য যে সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে ব্যবসায়ীরা এর চেয়েও আরো বেশি সময় চাইছেন। এছাড়া ছোট প্যাকেটকে পুরোপুরি ছাড় দেয়ারও দাবি তাদের। ব্যবসা প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের উৎপাদন ও বাজারজাতকরণের স্বাধীনতা চাইবে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু খাদ্য এমন একটি পণ্য, যার সঙ্গে সরাসরি মানুষের স্বাস্থ্য জড়িত। খাদ্যপণ্যের ক্ষেত্রে ব্যবসায়িক স্বার্থের চেয়েও জনস্বাস্থ্যকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেয়ার প্রয়োজন। ব্যবসায়ীরা যদি বলেন, প্যাকেট পরিবর্তনে খরচ বাড়বে, তাহলে প্রশ্ন হলো—একটি পণ্যের মোড়কের খরচ বেশি গুরুত্বপূর্ণ, নাকি সেই পণ্যের কারণে সম্ভাব্য স্বাস্থ্যঝুঁকি কমানো?
তিনি আরো বলেন, পহেলা বৈশাখ, ঈদ কিংবা বসন্ত উৎসব সহ বিভিন্ন উৎসবে কিন্তু কোমল পানীয়, চিপস বা অন্যসব খাবারের মোড়ক বদলে ফেলতে ব্যবসায়ী ও কোম্পানিগুলোর এক মাসও সময় লাগে না। গাজায় ইসরায়েলি হামলা ও সহিংসতার প্রতিবাদে ইসরায়েলি পণ্য বর্জনের ডাক দেয়া হয়েছিল। তখন কিন্তু আমরা দেখলাম, কোমল পানীয় মোজা তাদের মোড়ক বদলে ফেলেছিল। তাই যদি হয় তাহলে এখন কেন তারা পারবে না? ব্যবসায়ীরা ছোট প্যাকেটকে পুরোপুরি ছাড় দেয়ার দাবি করেছে। অথচ ছোট প্যাকেটগুলোরই চাহিদা ও বিক্রি বেশি। বড় একটি অংশই যদি বাদ পড়ে তাহলে সুফল মিলবে না। জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় ‘ছোট’ বলে কোন দিকই ছাড় দেয়ার সুযোগ নেই।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব জানান, দেশে যেকোনো বিষয় আইনগতভাবে প্রয়োগ করতে হলে, একটা নির্দিষ্ট নিয়মের মধ্যে চলতে হবে। এর জন্য প্রিলিমিনারি যে কাজ যেমন— বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, জনসাধারণ, সিভিল সোসাইটি, এমনকি সাংবাদিক, ব্যবসায়ী সবার সঙ্গে আমরা বিভিন্ন পর্যায়ে আলোচনা, মিটিং, ওয়ার্কশপ করে আসছি। আশা করছি দ্রুত সময়ের মধ্যেই এফওপিএল-এর পূর্ণাঙ্গ আইন পাবো।
বিশেষজ্ঞরা যা বলছেন
জনস্বাস্থ্যবিদরা বলছেন, ব্যস্ত জীবনযাত্রার কারণে মানুষ ক্রমেই বাইরে তৈরি ও প্যাকেটজাত খাবারের দিকে ঝুঁকছে। এসব খাবারে অতিরিক্ত লবণ, চিনি ও প্রাণিজ চর্বির উপস্থিতি স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে। অনেক সময় না জেনেই মানুষ ক্ষতিকর উপাদান বেশি গ্রহণ করছে।
দেশে অসংক্রামক রোগের যে মহামারি তৈরি হয়েছে, তা কমাতে ফ্রন্ট অব প্যাক লেবেলিং গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি এটি মানুষের স্বাস্থ্য ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে। তবে কার্যকর ফল পেতে হলে আইন প্রণয়ন ও বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন বলে মনে করেন তারা।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. লেলিন চৌধুরী বলেন, অতি প্রক্রিয়াজাত খাবারে অতিরিক্ত সোডিয়াম, চিনি, স্যাচুরেটেড ফ্যাট ও ট্রান্সফ্যাট থাকার কারণে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ, হৃদরোগসহ নানা অসংক্রামক রোগের ঝুঁকি বাড়ছে। পরিবারের সদস্যদের জন্য বিশিষ করে শিশুদের খাবার কেনার সময় মা-বাবাকে সতর্ক থাকতে হবে। ছোটবেলা থেকে শিশুর খাবারে সোডিয়াম ও চিনির মাত্রা সঠিক পরিমাণে থাকলে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে।
ন্যাশনাল হার্ট ফাউন্ডেশন হাসপাতাল ও রিসার্চ ইনস্টিটিউটের রোগতত্ত্ব ও গবেষণা বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. সোহেল রেজা চৌধুরী বলেন, বর্তমানে পুষ্টিসংক্রান্ত তথ্য প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষরে, জটিল সংখ্যায় লেখা থাকে, যা দ্রুত বোঝা প্রায় অসম্ভব। ফলে ভোক্তা অনেক সময় অজান্তেই স্বাস্থ্যঝুঁকিপূর্ণ পণ্য নিরাপদ ভেবে কিনে ফেলেন। এফওপিএল সে জটিলতাকে কমিয়ে সহজ, সরাসরি এবং দৃশ্যমান তথ্য দেয়। বাংলাদেশেও এফওপিএল চালু করা অত্যন্ত জরুরি বলে এই বিশেষজ্ঞের মত।
প্রবিধানটি সম্পর্কে সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের সদস্য (খাদ্য শিল্প ও উৎপাদন) অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ শোয়েব বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মান অনুযায়ী একজন মানুষের দৈনিক ৫ গ্রাম (প্রায় এক চা চামচ) লবণ গ্রহণ করা উচিত, কিন্তু বাস্তবে অনেকেই এর দ্বিগুণ গ্রহণ করছেন, যা উচ্চ রক্তচাপের অন্যতম কারণ। একইভাবে অতিরিক্ত চিনি গ্রহণ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়ায়। সাধারণত প্যাকেটজাত খাবারে পুষ্টি তথ্য প্যাকেটের পেছনে ছোট অক্ষর ও জটিল সংখ্যায় দেয়া থাকে, যা সবার পক্ষে পড়ে বোঝা এবং সিদ্ধান্ত নেয়া কঠিন। এফওপিএল এই সীমাবদ্ধতা সহজে দূর করতে পারে। আইনটি যদি হয় তবে যারা মোড়কাবদ্ধ খাদ্য লেবেলিং অর্থাৎ যে প্রক্রিয়াজাত খাবারগুলো মোড়কজাত করা হয়, সেগুলোতে নিয়ম অনুসারে বিভিন্ন ধরনের পুষ্টি উপাদান যেমন—কতটুকু কার্বোহাইড্রেট, সুগার, ফ্যাট, চিনি বা লবণ আছে, তা উল্লেখ করতে হবে। এর মধ্যে কিছু উপাদান যেগুলোকে বলা হয় ‘নিউট্রিয়েন্ট অব কনসার্ন’ বা মাত্রাতিরিক্ত উদ্বেগের, তা যদি খাদ্যে থাকে তবে স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। যেমন—লবণ ও চিনি। এগুলো কী পরিমাণ আছে তা মোড়কের লেবেলে উল্লেখ করতে হবে। অসংক্রামক রোগ প্রতিরোধে বিভিন্ন দেশকে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাও এটি করতে উৎসাহিত করছে।
কামরুন্নিছা মুন্না বলেন, জনস্বাস্থ্য সুরক্ষায় এ ধরনের ব্যবস্থা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কার্যকর প্রমাণিত হয়েছে। এই প্রবিধানটি বাস্তবায়িত হলে ভোক্তারা নিজেদের অধিকার সম্পর্কে আরো সচেতন হতে পারবেন। লেবেলে শুধু সতর্কবার্তাই থাকবে না, নিরক্ষর মানুষের বোঝার সুবিধার্থে ছবিও ব্যবহার করা হবে।
