পে স্কেল নিয়ে যত তথ্য
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩৬ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
সরকারি চাকরিজীবীদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে অনুমোদন পেয়েছে ‘জাতীয় বেতন স্কেল ২০২৬’। নবম জাতীয় পে-স্কেলে বিদ্যমান কাঠামোর তুলনায় বেতন ও বিভিন্ন ভাতায় বেশ কিছু পরিবর্তন আনা হয়েছে।
নতুন বেতন কাঠামোয় সামরিক-বেসামরিক কর্মকর্তা-কর্মচারী, রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার এক রাখা হচ্ছে না। উচ্চতর গ্রেডে ইনক্রিমেন্টের হার তুলনামূলক কম হবে। অর্থাৎ গ্রেড যত উঁচু এবং মূল বেতন যত বেশি, বার্ষিক ইনক্রিমেন্টের হার তত কম হবে।
প্রস্তাবিত কাঠামোয় মূল বেতন ১০০ থেকে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানো হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও সামগ্রিক আর্থসামাজিক পরিস্থিতি বিবেচনায় বাড়িভাড়া ভাতার হার কিছুটা কমানো হচ্ছে। তবে মূল বেতন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ায় ভাতার হার কমলেও প্রকৃত অর্থে বাড়িভাড়া ভাতার টাকার পরিমাণ আগের চেয়ে বাড়বে।
গত ৩১ আগস্ট প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত মন্ত্রিসভা বৈঠকে জাতীয় বেতন কাঠামো-২০২৬ এবং সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো অনুমোদন করা হয়। মন্ত্রিসভার ওই বৈঠকের কার্যবিবরণী থেকে এসব তথ্য জানা গেছে।
মূল বেতন বাড়ছে সর্বোচ্চ ১৪২ শতাংশ
জাতীয় বেতন কমিশন ২০২৫ সালের প্রস্তাবে প্রথম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ করেছিল। তবে সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেয়। শেষ পর্যন্ত নতুন বেতন কাঠামোয় প্রথম গ্রেডের মূল বেতন নির্ধারণ করা হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার টাকা।
এ ছাড়া অষ্টম ও নবম গ্রেডে কমিশনের প্রস্তাবের তুলনায় বেতন বৃদ্ধির হার কমানো হয়েছে। এই দুই গ্রেডে কমিশন প্রারম্ভিক মূল বেতন ১০৫ শতাংশ বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। সচিব কমিটি তা কমিয়ে ১০০ শতাংশ করার প্রস্তাব দেয়। অন্য গ্রেডগুলোতে কমিশনের প্রস্তাব অনুযায়ী প্রারম্ভিক মূল বেতন বৃদ্ধির হার বহাল রাখা হয়েছে।
নতুন কাঠামোয় আগের মতোই মোট ২০টি গ্রেড থাকছে। একই সঙ্গে ২০তম গ্রেডের প্রারম্ভিক মূল বেতন ২০ হাজার টাকা করার প্রস্তাবও বহাল রাখা হয়েছে।
তিন ধাপে কার্যকর হবে নতুন বেতন
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, নতুন বেতন কাঠামোর মূল বেতনের একটি অংশ প্রথম ধাপে কার্যকর হবে। পরবর্তী দুই ধাপে বাকি অংশ সমন্বয় করা হবে। বাড়িভাড়াসহ অন্যান্য আনুষঙ্গিক ভাতা ২০২৮ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
বাড়িভাড়া ভাতায় বড় পরিবর্তন
২০১৫ সালের বিদ্যমান পে-স্কেল অনুযায়ী, ঢাকা সিটি করপোরেশন এলাকায় কর্মরত সরকারি চাকরিজীবীরা গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৫০ থেকে ৬৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়িভাড়া ভাতা পান। নতুন কাঠামোয় এ হার কমিয়ে ৪০ থেকে ৬০ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
তবে মূল বেতনের তুলনায় বাড়িভাড়ার শতাংশ কমলেও গ্রেডভেদে মূল বেতন দ্বিগুণ বা তারও বেশি বাড়ায় প্রকৃত বাড়িভাড়া ভাতার পরিমাণ আগের তুলনায় বৃদ্ধি পাবে।
বর্তমানে ঢাকা সিটি করপোরেশনের বাইরে দেশের অন্যান্য সিটি করপোরেশন ও সাভার উপজেলা এলাকায় গ্রেডভেদে মূল বেতনের ৪০ থেকে ৫৫ শতাংশ বাড়িভাড়া ভাতা দেওয়া হয়। নতুন কাঠামোয় এসব এলাকায় কর্মরতরা মূল বেতনের ৩০ থেকে ৫০ শতাংশ হারে এ ভাতা পাবেন।
একইভাবে ঢাকা ও অন্যান্য সিটি করপোরেশন এবং সাভার উপজেলার বাইরে কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বাড়িভাড়া ভাতার হার বর্তমানে ৩৫ থেকে ৫০ শতাংশ। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে গ্রেডভেদে ২৫ থেকে ৪৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চিকিৎসা ভাতা বাড়ছে
বর্তমান বেতন কাঠামোয় সব কর্মচারী মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা চিকিৎসা ভাতা পান। ৬৫ বছরের বেশি বয়সী পেনশনারদের জন্য এ ভাতা মাসে ২ হাজার ৫০০ টাকা।
নতুন কাঠামোয় গ্রেড নির্বিশেষে ৫০ বছর পর্যন্ত বয়সী চাকরিজীবীদের মাসিক চিকিৎসা ভাতা ৩ হাজার টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে। ৫০ বছরের বেশি থেকে ৬০ বছর বয়স পর্যন্ত চাকরিজীবীরা পাবেন মাসে ৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, ৬০ থেকে ৭০ বছর বয়সী পেনশনভোগীরা মাসে ৫ হাজার টাকা এবং ৭০ বছরের বেশি বয়সীরা ৬ হাজার টাকা চিকিৎসা ভাতা পাবেন।
প্রথমবার সবার জন্য মোবাইল ভাতা
নতুন পে-স্কেলে প্রথমবারের মতো সব স্তরের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মোবাইল ফোন ভাতা চালুর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে প্রথম থেকে তৃতীয় গ্রেডের কর্মকর্তারা মাসে ১ হাজার ৫০০ টাকা এবং চতুর্থ ও পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তারা ১ হাজার টাকা মোবাইল ফোন বিল পান। অন্য গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এ সুবিধার আওতায় নেই।
নতুন কাঠামোয় প্রথম থেকে পঞ্চম গ্রেডের কর্মকর্তাদের মোবাইল ভাতা কমিয়ে মাসে ৫০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। ষষ্ঠ থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মাসে ১৫০ টাকা করে মোবাইল ভাতা পাবেন।
অন্যান্য ভাতাতেও পরিবর্তন
জীবনযাত্রার ব্যয় ও পরিবহন খরচ বেড়ে যাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে নতুন কাঠামোয় যাতায়াত, টিফিন ও ধোলাই ভাতা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।
বর্তমানে মাসিক যাতায়াত ভাতা ৩০০ টাকা। নতুন কাঠামোয় তা ৬০০ টাকা করার প্রস্তাব রয়েছে। টিফিন ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৫০০ টাকা এবং ধোলাই ভাতা ১০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সরকারি চাকরিজীবীরা বর্তমানে বাংলা নববর্ষ ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ২০ শতাংশ পান। নতুন কাঠামোয় তা কমিয়ে ১৫ শতাংশ করার প্রস্তাব করা হয়েছে।
দুর্গম পার্বত্য এলাকায় কর্মরতদের পাহাড়ি ভাতা হিসেবে মূল বেতনের ২০ শতাংশের হার অপরিবর্তিত থাকছে। তবে পার্বত্য জেলা ও উপজেলা সদরের ক্ষেত্রে এর সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা এবং সদরের বাইরের এলাকার জন্য ৫ হাজার ৫০০ টাকা নির্ধারণ করা হচ্ছে।
হাওর, দ্বীপ ও চরভাতার ক্ষেত্রেও মূল বেতনের ২০ শতাংশ হার বহাল থাকছে। তবে এ ভাতার সর্বোচ্চ সীমা ৫ হাজার টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।
এ ছাড়া শিক্ষা সহায়ক ভাতা, কার্যভার ভাতা, আপ্যায়ন ভাতা, কুক অ্যান্ড সিকিউরিটি এলাউন্স, উৎসব ভাতা এবং শ্রান্তি-বিনোদন ছুটি ও ভাতার ক্ষেত্রে বিদ্যমান হার ও পরিমাণই বহাল রাখার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
