জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের জন্মদিন আজ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৮ জুলাই ২০২৬, ১২:৫১ পিএম
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। ছবি : সংগৃহীত
বাংলাদেশের আবৃত্তি অঙ্গনের অন্যতম উজ্জ্বল নাম, একুশে পদকপ্রাপ্ত প্রখ্যাত আবৃত্তিকার ও গুণী অভিনেতা জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় ৮১ বছরে পা রাখলেন আজ (২৯ জুলাই)। দীর্ঘ পাঁচ দশকেরও বেশি সময় ধরে আবৃত্তি, অভিনয় ও বাংলা ভাষা-সংস্কৃতির চর্চায় অসামান্য অবদান রেখে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন দেশের অন্যতম সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে। জন্মদিন উপলক্ষে তার নিজের কোনো জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজন নেই। রাজধানীর নিজ বাসায় পরিবারের সদস্য ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে ঘরোয়া পরিবেশেই দিনটি উদযাপন করবেন তিনি।
জন্মদিন নিয়ে বরাবরের মতোই রসিকতা করে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় বলেন, ‘আমি তো সব সময় নিজেকে ৩৩ বছরের একজন মানুষ মনে করি। আজ ৩৪-এ পা রাখলাম। মানুষের ভালোবাসাই আমাকে এত দূর নিয়ে এসেছে। তবে একজন শিল্পী হিসেবে আমি এখনো অতৃপ্ত। আবৃত্তি ও অভিনয়- দুই ক্ষেত্রেই শেখার অনেক কিছু বাকি আছে। আমি আজীবন একজন শিক্ষার্থী। জন্মদিনে সবার কাছে শুধু দোয়া ও আশীর্বাদ চাই, যেন সুস্থ থেকে কাজ করে যেতে পারি।’
জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের সাংস্কৃতিক জীবন শুরু হয় ছাত্রাবস্থায়। ১৯৬৯ সালে লেনিনের জন্মশতবার্ষিকী উপলক্ষে কলকাতার রঞ্জি ইনডোর স্টেডিয়ামে কিংবদন্তি আবৃত্তিকার কাজী সব্যসাচীর সঙ্গে দ্বৈত ও একক আবৃত্তি করে তিনি ব্যাপক প্রশংসা অর্জন করেন। এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। দেশ-বিদেশে অসংখ্য একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে বাংলা ভাষা ও কবিতাকে নতুনভাবে তুলে ধরেছেন তিনি। ফ্রান্স, যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, স্কটল্যান্ডসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বাংলা কবিতা আবৃত্তির মাধ্যমে প্রবাসী বাঙালিদের কাছে বাংলা সংস্কৃতিকে পৌঁছে দিয়েছেন।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত অবস্থায় ১৯৭১ সালে শুরু হয় বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ। সে সময় পড়াশোনা স্থগিত রেখে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে নিজেকে সম্পৃক্ত করেন এবং সত্তরের দশক থেকেই ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলায় একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানের মাধ্যমে জনপ্রিয়তা অর্জন করেন।
আরো পড়ুন : পিয়া জান্নাতুলের অভিযোগ তদন্তের নির্দেশ আদালতের
বাংলাদেশে আবৃত্তিকে জনপ্রিয় করে তোলার পেছনে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়ের অবদান বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। ১৯৭৭ সালে তিনি প্রথমবারের মতো দর্শনীর বিনিময়ে একক আবৃত্তি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন, যা সে সময় একটি যুগান্তকারী উদ্যোগ ছিল। এছাড়া বাংলাদেশে বৃন্দ আবৃত্তি (কয়ার রিসাইটেশন) জনপ্রিয় করার ক্ষেত্রেও তার ভূমিকা পথিকৃতের। তার কণ্ঠে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জীবনানন্দ দাশ, শামসুর রাহমান, নির্মলেন্দু গুণসহ অসংখ্য কবির কবিতা নতুন মাত্রা পেয়েছে। আবৃত্তিকে কেবল পরিবেশনা নয়, শিল্পচর্চার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে প্রতিষ্ঠায় তার অবদান অনস্বীকার্য।
আবৃত্তির পাশাপাশি অভিনয়েও সমান দক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। সত্তরের দশক থেকেই টেলিভিশন নাটকে অভিনয় শুরু করেন। পরে চলচ্চিত্র নির্মাতা আলমগীর কবিরের হাত ধরে চলচ্চিত্রে অভিনয়ের সুযোগ পান।
তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রের মধ্যে রয়েছে মাটির ময়না, রানওয়ে, ঘেঁটুপুত্র কমলা, নয় নম্বর বিপদসংকেত, সূচনাসহ আরো বেশ কয়েকটি প্রশংসিত সিনেমা। পাশাপাশি তিনি অসংখ্য জনপ্রিয় টেলিভিশন নাটকেও অভিনয় করেছেন।
প্রয়াত কবি ও আবৃত্তিশিল্পী হাবীবুল্লাহ সিরাজী এক অনুষ্ঠানে জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে বলেছিলেন, ‘রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা ভাষা ও সাহিত্যচর্চার ধারাকে যাঁরা এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন, জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় তাঁদের অন্যতম।’ অন্যদিকে আবৃত্তিশিল্পী রূপা চক্রবর্তী তাকে আখ্যা দিয়েছিলেন ‘আবৃত্তিসম্রাট’ হিসেবে। তার মতে, ‘জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায় আমাদের ভেতর থেকে নাড়িয়ে দেন। তিনি দেখিয়েছেন, আবৃত্তি শুধু আবেগ নয়, এটি গভীর চর্চা ও সাধনার বিষয়।’
দীর্ঘ সাংস্কৃতিক জীবনে তিনি শিল্পকলা পদক, গোলাম মুস্তাফা পদক, নরেন বিশ্বাস পদকসহ অসংখ্য সম্মাননা অর্জন করেছেন। আবৃত্তিতে অসামান্য অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে তিনি পেয়েছেন দেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মাননা একুশে পদক।
তবে পুরস্কার নিয়ে তার দৃষ্টিভঙ্গি সবসময়ই ব্যতিক্রম। একুশে পদক প্রসঙ্গে তিনি একবার বলেছিলেন, ‘আমি এসব প্রাপ্তি নিয়ে খুব একটা ভাবি না। আমাকে যে পদক দেওয়া হয়েছে, সেটাও আগে জানতাম না। তবে জীবিত অবস্থায় রাষ্ট্র স্বীকৃতি দিয়েছে, এটাই আমার কাছে সবচেয়ে বড় বিষয়।’
প্রায় অর্ধশতাব্দীরও বেশি সময় ধরে বাংলা ভাষা, কবিতা, আবৃত্তি ও অভিনয়ের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করে চলেছেন জয়ন্ত চট্টোপাধ্যায়। বয়স তার কর্মস্পৃহাকে থামাতে পারেনি। আজও তিনি মঞ্চ, টেলিভিশন ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে সমানভাবে সক্রিয়। তার জন্মদিনে দেশের সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা ব্যক্তি ও সংগঠন শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাচ্ছেন এই বরেণ্য শিল্পীকে।
