তীব্র গরমে বদলে যেতে পারে ২০২৬ বিশ্বকাপের ফুটবল
স্পোর্টস ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৬, ১২:২১ পিএম
ফাইল ছবি
বিশ্বকাপে সাধারণত প্রতিপক্ষ হয় মাঠের অন্য দলটি। তবে কখনও কখনও পারিপার্শ্বিক চাপ, গগনচুম্বী প্রত্যাশা, অনাকাঙ্ক্ষিত ইনজুরি কিংবা ভাগ্যও বড় প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। তবে আগামী ১১ জুন থেকে ১৯ জুলাই পর্যন্ত উত্তর আমেরিকায় বসতে যাওয়া ২০২৬ বিশ্বকাপে ফুটবলারদের সামনে অপেক্ষা করছে সম্পূর্ণ ভিন্নধর্মী এক কঠিন চ্যালেঞ্জ—তীব্র গরম ও ভ্যাপসা আর্দ্রতা।
উত্তর আমেরিকার গ্রীষ্মকালীন এই চরম আবহাওয়ায় অনেক ভেন্যুর তাপমাত্রা ও আর্দ্রতা ফুটবলারদের পারফরম্যান্সে সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে সতর্ক করেছেন জলবায়ু বিশেষজ্ঞরা। তাদের আশঙ্কা, এই মেগা টুর্নামেন্টের ১০৪টি ম্যাচের প্রায় এক-চতুর্থাংশই এমন তীব্র গরমে অনুষ্ঠিত হতে পারে, যা খেলোয়াড় ও দর্শক দুই পক্ষের জন্যই চরম অস্বস্তিকর এবং কিছু ক্ষেত্রে মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে।
ইউরোপের কয়েকটি দলের অনুশীলনে ইতিমধ্যেই সেই রূঢ় বাস্তবতার ইঙ্গিত মিলেছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া বিভিন্ন দৃশ্যে দেখা গেছে, গরমে ক্লান্ত-বিধ্বস্ত ফুটবলাররা মাথায় পানি ঢেলে শরীর ঠান্ডা করার আপ্রাণ চেষ্টা করছেন। এমনকি মরক্কোর বিপক্ষে প্রস্তুতি ম্যাচে নরওয়ে দলের খেলোয়াড়দের ঘাড়ের ওপর বিশেষ 'আইস কলার' ব্যবহার করতে দেখা গেছে। ইউরোপের তুলনামূলক ঠান্ডা ও স্বস্তিদায়ক আবহাওয়ায় অভ্যস্ত ফুটবলারদের জন্য যুক্তরাষ্ট্র ও মেক্সিকোর এই তীব্র গরম যে এক অগ্নিপরীক্ষা হতে যাচ্ছে, তা এখন ফুটবলপাড়ার অন্যতম বড় আলোচনার বিষয়।
সাধারণ তাপমাত্রা বনাম ‘ডব্লিউবিজিটি’ সূচকবিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই গরমের প্রকৃত প্রভাব শুধু থার্মোমিটারের সাধারণ সংখ্যা দিয়ে পরিমাপ করা যাবে না। তারা মূলত জোর দিচ্ছেন ডব্লিউবিজিটি (WBGT - Wet Bulb Globe Temperature) বা ‘আর্দ্র বাল্ব গ্লোব তাপমাত্রা’ সূচকের ওপর।
WBGT কী? সাধারণ তাপমাত্রার সঙ্গে বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ, বাতাসের গতি, সরাসরি সূর্যের আলো এবং মানবশরীরের নিজস্ব তাপ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতার সমন্বয় করে এই বৈজ্ঞানিক সূচকটি তৈরি করা হয়।ফুটবলে এই সূচকটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ; কারণ মাঠে খেলোয়াড়দের টানা ৯০ মিনিট উচ্চগতিতে দৌড়াতে হয়, প্রতিপক্ষকে ‘প্রেস’ করতে হয় এবং ঘন ঘন স্প্রিন্ট নিতে হয়। ফলে শরীরের তাপমাত্রা চোখের পলকে বিপজ্জনক পর্যায়ে চলে যেতে পারে। সাধারণত গরমে শরীর ঘামের মাধ্যমে নিজেকে ঠান্ডা রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু বাতাসে আর্দ্রতা বেশি থাকলে ঘাম দ্রুত শুকায় না, ফলে শরীরের অভ্যন্তরীণ তাপমাত্রা কমানো প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব হিসেবে দেখা দিতে পারে তীব্র পানিশূন্যতা (Dehydration), পেশিতে টান (Muscle Cramp), দ্রুত ক্লান্তি এবং ম্যাচের শেষভাগে এসে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতায় ঘাটতি। এর সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো 'হিট স্ট্র্যাস' বা 'হিট স্ট্রোক', যা মানুষের স্বাভাবিক অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে বিকল করে দিতে পারে।
কৌশলে বদল ও ফিফার ‘হাইড্রেশন ব্রেক’ফুটবলের পরিভাষায় এই তীব্র গরমের অর্থ হতে পারে ম্যাচের চিরচেনা গতি কমে যাওয়া। আবহাওয়ার কারণে দলগুলো হয়তো আগের মতো টানা হাই-প্রেসিং ফুটবল খেলতে পারবে না। উইং ধরে ফুলব্যাকদের অনবরত ওঠানামা কমে যেতে পারে এবং মাঝমাঠে বলের পজিশন ধরে রেখে ধীরগতির পাসিং গেমের প্রবণতা বাড়তে পারে। স্বভাবতই কোচদের খেলোয়াড় বদল এবং ম্যাচ ম্যানেজমেন্টে অনেক বেশি কৌশলগত হতে হবে।
অবশ্য ইংল্যান্ড অধিনায়ক হ্যারি কেইন এই গরমকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করাতে নারাজ। তার মতে, বিশ্বকাপের আগের সঠিক প্রস্তুতি ও মানিয়ে নেওয়ার মাধ্যমেই দলগুলো এই পরিস্থিতি জয় করতে পারবে। আধুনিক ফুটবলের দলগুলোতে এখন হাই পারফরম্যান্স কোচ, ফিজিও, পুষ্টিবিদ ও বিশ্বমানের মেডিকেল টিম থাকে। তারা খেলোয়াড়দের পানি ও ইলেকট্রোলাইট গ্রহণ, বিশ্রাম, ঘুম এবং অনুশীলনের তীব্রতা বিজ্ঞানসম্মত উপায়ে নিয়ন্ত্রণ করবেন।
উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ ভেন্যুগুলো মাথায় রেখে বিশ্ব ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ফিফাও কিছু কার্যকরী পদক্ষেপ নিয়েছে। প্রতিটি ম্যাচের দুই অর্ধে ৩ মিনিট করে 'হাইড্রেশন ব্রেক' বা পানি পানের বিরতি থাকবে। এ ছাড়া কিছু স্টেডিয়ামে অত্যাধুনিক ইনডোর কুলিং সিস্টেম থাকলেও সব ভেন্যুতে এই সুবিধা নেই। স্টেডিয়ামের ভেতরে কৃত্রিম ব্যবস্থা থাকলেও দর্শকরা ফ্যান জোন কিংবা যাতায়াতের সময় দীর্ঘক্ষণ এই তীব্র গরমে ভুগতে পারেন।
সব মিলিয়ে, ২০২৬ বিশ্বকাপ শুধু ৪৮ দলের নতুন ফরম্যাটের জন্যই নয়, প্রকৃতির এই রুদ্ররূপের সঙ্গে লড়াইয়ের জন্যও ইতিহাসে আলাদাভাবে জায়গা করে নেবে। মাঠে প্রতিভা ও পরিকল্পনার পাশাপাশি এবার শরীরের সর্বোচ্চ সহনশীলতাই নির্ধারণ করে দেবে সোনালি ট্রফির আসল দাবিদার কে!
