১৭ বছর আগের সেই ছবি, আজ ফুটবল ইতিহাসের অবিশ্বাস্য গল্প
তাহসিনুল বাকী ফাহিম
প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৬, ০১:৩৮ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
২০০৭ সালের একটি সাধারণ ফটোশুট। তখনও কেউ কল্পনাও করতে পারেনি, সেই মুহূর্তটি একদিন ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম আলোচিত ছবিতে পরিণত হবে। একদিকে ছিলেন মাত্র ২০ বছর বয়সী লিওনেল মেসি, বার্সেলোনার উদীয়মান তারকা। অন্যদিকে মাত্র পাঁচ মাস বয়সী এক শিশু, যে মায়ের কোল ছাড়া পৃথিবী সম্পর্কে কিছুই জানত না। সেই শিশুটির নাম ছিল লামিন ইয়ামাল। প্রায় দুই দশক পর, এই দুজনের ছবিই যেন ফুটবল বিশ্বের দুই প্রজন্মকে এক সুতোয় গেঁথে দিয়েছে।
ঘটনাটি ২০০৭ সালের ডিসেম্বরের। বার্সেলোনা-ভিত্তিক দৈনিক স্পোর্ট এবং ইউনিসেফের যৌথ উদ্যোগে একটি দাতব্য ক্যালেন্ডারের জন্য ফটোশুটের আয়োজন করা হয়েছিল। উদ্দেশ্য ছিল বিভিন্ন পরিবারের শিশুদের নিয়ে সচেতনতামূলক ছবি তোলা এবং সেই ক্যালেন্ডার বিক্রির অর্থ সমাজসেবামূলক কাজে ব্যয় করা। লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত কয়েকটি পরিবারের মধ্যে ছিল লামিন ইয়ামালের পরিবারও।
সেই সময় মেসি ছিলেন মাত্র ২০ বছর বয়সী এক তরুণ ফুটবলার। যদিও তিনি ইতোমধ্যে নিজের প্রতিভার ঝলক দেখাতে শুরু করেছেন, তবুও বিশ্বসেরা হওয়ার পথ তখনও অনেক বাকি। ফটোশুটের একটি দৃশ্যে দেখা যায়, একটি ছোট্ট বাথটাবের পাশে দাঁড়িয়ে মেসি খুব যত্ন করে পাঁচ মাস বয়সী ইয়ামালকে ধরে আছেন। আরেকটি ছবিতে দেখা যায়, শিশুটিকে তোয়ালে দিয়ে মুছে দিচ্ছেন তিনি। পুরো দৃশ্যটিই ছিল হাস্যোজ্জ্বল, আন্তরিক এবং সম্পূর্ণ স্বাভাবিক— যেন একজন বড় ভাই ছোট্ট শিশুর যত্ন নিচ্ছেন।
আরো পড়ুন : সেমিফাইনালে আর্জেন্টিনা-ইংল্যান্ড, জমে উঠেছে মহারণ
সেদিন কেউ ভাবেনি, এই শিশুই একদিন বার্সেলোনার ইতিহাসে সবচেয়ে কম বয়সী তারকাদের একজন হয়ে উঠবে। আরো অবিশ্বাস্য বিষয় হলো, লামিন ইয়ামালের পরিবারও তখন কল্পনা করতে পারেনি যে তাদের সন্তান ভবিষ্যতে ফুটবল বিশ্বের অন্যতম আলোচিত নাম হবে।
বছর গড়িয়ে যায়। মেসি বার্সেলোনাকে অসংখ্য শিরোপা এনে দেন, সাতবার ব্যালন ডি’অর জেতেন, আর্জেন্টিনাকে কোপা আমেরিকা ও বিশ্বকাপ উপহার দেন এবং ফুটবল ইতিহাসের অন্যতম সেরা খেলোয়াড় হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন। অন্যদিকে ছোট্ট ইয়ামাল ধীরে ধীরে বার্সেলোনার লা মাসিয়া একাডেমিতে বেড়ে ওঠেন। অসাধারণ ড্রিবলিং, গতি, সৃজনশীলতা ও পরিণত ফুটবলবোধ দিয়ে খুব অল্প বয়সেই সবার নজর কাড়েন।
মাত্র ১৫ বছর বয়সে বার্সেলোনার মূল দলে অভিষেক ঘটে ইয়ামালের। এরপর একের পর এক বয়সভিত্তিক রেকর্ড ভাঙতে থাকেন তিনি। স্পেন জাতীয় দলের হয়েও অল্প বয়সেই জায়গা করে নেন এবং ইউরোপীয় ফুটবলে নিজের অসাধারণ প্রতিভার প্রমাণ দেন। কিশোর বয়সেই তিনি এমন পারফরম্যান্স দেখান, যা অনেক কিংবদন্তিও ক্যারিয়ারের শুরুতে করতে পারেননি।
২০২৪ সালে হঠাৎ করেই সেই পুরোনো ছবিগুলো আবার আলোচনায় আসে। ইয়ামালের বাবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিগুলো প্রকাশ করলে মুহূর্তের মধ্যেই সেগুলো ভাইরাল হয়ে যায়। ফুটবলপ্রেমীরা বিস্ময়ের সঙ্গে আবিষ্কার করেন, যিনি শিশুকালে মেসির কোলে ছিলেন, তিনিই আজ বার্সেলোনার সবচেয়ে বড় আশার প্রতীক।
এরপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শুরু হয় নানা মজার মন্তব্য। কেউ লেখেন, "মেসি আশীর্বাদ করেছিলেন বলেই ইয়ামাল এত বড় প্রতিভা হয়েছেন।" আবার কেউ বলেন, "GOAT-এর হাতের স্পর্শেই জন্ম নিয়েছে নতুন তারকা।" অবশ্য এগুলো নিছকই ভক্তদের রসিকতা। বাস্তবে ইয়ামালের সাফল্যের পেছনে রয়েছে তার কঠোর পরিশ্রম, প্রতিভা, পরিবার এবং বার্সেলোনার লা মাসিয়ার দীর্ঘদিনের প্রশিক্ষণ।
তবে ছবিটির আবেগী দিকটি অস্বীকার করার উপায় নেই। ফুটবল ইতিহাসে খুব কম ছবিই রয়েছে, যেখানে একই ফ্রেমে দুই ভিন্ন প্রজন্মের দুই অসাধারণ প্রতিভাকে দেখা যায়— একজন তখন ক্যারিয়ারের শুরুতে, আরেকজন তখন জীবনের একেবারে প্রথম অধ্যায়ে। সময়ের ব্যবধানে একজন হয়ে ওঠেন ফুটবলের সর্বকালের অন্যতম সেরা, আর অন্যজনকে ঘিরে তৈরি হয় ভবিষ্যতের অসীম সম্ভাবনা।
আজ যখন ইয়ামাল বার্সেলোনা ও স্পেনের জার্সিতে মাঠ মাতান, তখন সেই পুরোনো ছবিগুলো যেন নতুন অর্থ খুঁজে পায়। এটি শুধু একটি ফটোশুটের স্মৃতি নয়; এটি ফুটবলের এক অসাধারণ সময়ের সেতুবন্ধন। একদিকে অতীতের কিংবদন্তি লিওনেল মেসি, অন্যদিকে ভবিষ্যতের উজ্জ্বল নক্ষত্র লামিন ইয়ামাল।
ফুটবল মাঝে মাঝে এমন কিছু গল্প উপহার দেয়, যা কোনো চিত্রনাট্যকারও কল্পনা করতে পারেন না। একটি সাধারণ দাতব্য ফটোশুট, একটি নিষ্পাপ শিশু, আর এক তরুণ ফুটবলারের হাসিমাখা মুখ- প্রায় দুই দশক পর সেই মুহূর্তই হয়ে ওঠে ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে হৃদয়স্পর্শী ও প্রতীকী ছবিগুলোর একটি।
