×

ভারত

ভূমিধস-বন্যায় নেপাল কেন এতটা ঝুঁকিপূর্ণ

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২৭ আগস্ট ২০২৬, ১১:১০ এএম

ভূমিধস-বন্যায় নেপাল কেন এতটা ঝুঁকিপূর্ণ

ছবি : সংগৃহীত

হিমালয়ের পাদদেশে অবস্থান, দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া, ভূমিধস ও নদীর প্রবাহ আটকে আকস্মিক ঢল সব মিলিয়ে প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য নেপাল বিশ্বের অন্যতম ঝুঁকিপূর্ণ দেশ। সম্প্রতি দেশটির রাসুয়া জেলায় ভয়াবহ বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানির ঘটনায় আবারও সামনে এসেছে সেই বাস্তবতা।

রাসুয়া জেলার ভোতে কোশি নদীতে হঠাৎ নেমে আসে প্রবল পানির ঢল। এতে সীমান্ত এলাকার বসতি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে সেই পানি গিয়ে পড়ে ত্রিশূলী নদীতে। সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দুর্যোগে নেপালে ১৬২ জনের বেশি মানুষের মৃত্যু হয়েছে এবং প্রায় ৫৭৯ জন নিখোঁজ রয়েছেন। তিব্বতেও তিনজনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে।

দুর্যোগের কারণ নিয়ে এখন পর্যন্ত একাধিক ব্যাখ্যা সামনে এসেছে। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল সংসদে জানিয়েছেন, স্থানীয় সময় সকাল ৮টা ৩৭ মিনিটে একটি ভূমিকম্পের পর বড় ধরনের ভূমিধস হয়। এতে নদীর প্রবাহ আটকে গিয়ে পানি জমতে থাকে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে মুহূর্তের মধ্যে ভয়াবহ পানির ঢল নেমে আসে।

তবে যুক্তরাষ্ট্রের ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা ইউএসজিএস ওই সময় ৪ দশমিক ৪ মাত্রার কম্পন শনাক্ত করলেও পরে জানায়, সেটি ভূমিকম্পের কারণে নয়; ভূমিধসের কারণেই ওই কম্পন সৃষ্টি হয়ে থাকতে পারে।

আন্তর্জাতিক পর্বত উন্নয়ন সমন্বয় কেন্দ্রের (আইসিআইএমওডি) বিজ্ঞানী শশ্বত সান্যালের মতে, ভোতে কোশির উপনদী লেন্দে খোলায় একটি হিমবাহ থেকে বরফ ও পাথরের ধস নেমে নদীর প্রবাহ আটকে দিতে পারে। পরে জমে থাকা পানি বাধা ভেঙে প্রবল স্রোতে নেমে আসে।

কাঠমান্ডু বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের প্রধান ও হিমবিজ্ঞানী রিজান ভক্ত কায়স্থও একই ধরনের আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। তার মতে, আগের বছরও একই এলাকায় এমন ঘটনা ঘটেছিল।

নেপালের দুর্যোগঝুঁকির পেছনে সবচেয়ে বড় কারণগুলোর একটি হলো দেশটির ভৌগোলিক অবস্থান। হিমালয় এখনো ভূতাত্ত্বিকভাবে সক্রিয়। ভারতীয় ও ইউরেশীয় টেকটোনিক প্লেটের সংঘর্ষের ফলে পর্বতমালাটি এখনো ধীরে ধীরে উঁচু হচ্ছে।

এই সংঘর্ষের কারণে নেপালে ভূমিকম্পের ঝুঁকি রয়েছে। আবার ভূমিকম্প বা ছোটখাটো কম্পনের প্রভাবে পাহাড়ের দুর্বল ঢাল ধসে নদীর প্রবাহ আটকে যেতে পারে। পরে সেই বাধা ভেঙে গেলে তৈরি হতে পারে আকস্মিক বন্যা।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমালয়ের হিমবাহ দ্রুত গলছে। হিমবাহ গলে পাহাড়ের ওপর তৈরি হচ্ছে অসংখ্য হ্রদ। এসব হ্রদের কোনোটি হঠাৎ ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসে। এ ধরনের ঘটনাকে হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণজনিত বন্যা বা গ্লেশিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বলা হয়।

আইসিআইএমওডির গবেষণা অনুযায়ী, ২০০০ সালের পর হিন্দুকুশ হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ গলে যাওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। এতে পাহাড়ি নদীর নিচের দিকে বসবাসকারী প্রায় ২০ লাখ মানুষ ঝুঁকির মধ্যে পড়েছেন।

জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচির ২০২০ সালের তথ্য অনুযায়ী, কোশি, গান্ডাকি ও কার্নালি অববাহিকায় ৩ হাজার ৬২৪টি হিমবাহ হ্রদ রয়েছে। এর মধ্যে ৪৭টিকে বিপজ্জনক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল।

নেপালের দুর্যোগঝুঁকি বাড়ার আরেকটি কারণ সীমান্তপারের আগাম তথ্য পাওয়ার সীমাবদ্ধতা। তিব্বত থেকে হিমবাহ ও নদীর পরিস্থিতি সম্পর্কে পর্যাপ্ত তথ্য পাওয়ার ব্যবস্থা না থাকায় আকস্মিক বন্যার আগাম সতর্কতা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

২০২৫ সালের একটি বন্যার পর নেপালের কর্মকর্তারা জানিয়েছিলেন, সীমান্ত থেকে বন্যার পানি দেশে প্রবেশের মাত্র এক ঘণ্টা আগে তারা খবর পেয়েছিলেন। কিন্তু কার্যকর কোনো আগাম সতর্কতা ব্যবস্থা থেকে সেই তথ্য আসেনি।

পরে চীনের সঙ্গে আগাম সতর্কতা ও দুর্যোগ মোকাবিলায় সহযোগিতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সীমান্তের দুই পাশে এখনো পূর্ণাঙ্গ রিয়েল-টাইম সতর্কতা ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।

নেপালে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঘটনা নতুন নয়। গত বছরও একই এলাকায় বন্যার সঙ্গে তিব্বতের একটি হিমবাহ হ্রদ থেকে পানি বেরিয়ে যাওয়ার সম্পর্ক পাওয়া যায়।

এর আগে ১৯৮১ সালের জুলাইয়ে তিব্বতের ঝাংঝাংবো উপত্যকার একটি হ্রদ থেকে হঠাৎ পানি বেরিয়ে গেলে ২০০ জনের বেশি মানুষ মারা যান। ধ্বংস হয় ফ্রেন্ডশিপ ব্রিজ এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয় সান কোশি জলবিদ্যুৎকেন্দ্র।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, নেপালের ইতিহাসে বড় ধরনের বন্যার ঘটনা অন্তত ২৪টি। এর মধ্যে ১৪টির উৎপত্তি নেপালে এবং ১০টির উৎপত্তি তিব্বতে।

ভূপ্রকৃতি ও জলবায়ু পরিবর্তনের যৌথ প্রভাব

নেপালের ক্ষেত্রে সমস্যা শুধু অতিবৃষ্টি বা বন্যা নয়। ভূমিকম্পপ্রবণ পাহাড়ি ভূপ্রকৃতি, হিমবাহ গলে হ্রদ তৈরি হওয়া, ভূমিধস এবং নদীর সংকীর্ণ গতিপথ—সবকিছু একসঙ্গে দুর্যোগের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পাহাড়ের কোনো অংশ ধসে নদীর পানি আটকে যাওয়ার পর সেই বাধা ভেঙে গেলে কয়েক মিনিটের মধ্যেই নিচের দিকে ভয়াবহ পানির ঢল নেমে আসতে পারে। ফলে এই ধরনের ঘটনাকে অনেক সময় ‘অভ্যন্তরীণ সুনামি’র সঙ্গেও তুলনা করা হয়।

গবেষণায় দেখা গেছে, এ ধরনের বন্যায় নেপাল ও চীনের প্রায় ১০৩ কিলোমিটার মহাসড়ক, ১০৩টি সেতু, দুটি বড় বন্দর এবং ৩ হাজার ৩০১টি ভবন ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সব মিলিয়ে, নেপালের দুর্যোগঝুঁকি তৈরি হয়েছে ভূপ্রকৃতি, সক্রিয় টেকটোনিক প্লেট, দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং আগাম সতর্কতা ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার সম্মিলিত প্রভাবে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব যত বাড়বে, হিমালয় অঞ্চলে এ ধরনের আকস্মিক বন্যা ও ভূমিধসের ঝুঁকিও তত বাড়তে পারে।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

গলা পানিতে নেমে খাল পরিষ্কার করলেন ১১-দলীয় জোটের এমপি

গলা পানিতে নেমে খাল পরিষ্কার করলেন ১১-দলীয় জোটের এমপি

নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ১৬২, নিখোঁজ প্রায় ৪০০

নেপালে আকস্মিক বন্যায় নিহত বেড়ে ১৬২, নিখোঁজ প্রায় ৪০০

জানা গেল পে-স্কেলের গেজেট জারির সম্ভাব্য সময়

জানা গেল পে-স্কেলের গেজেট জারির সম্ভাব্য সময়

ভূমিধস-বন্যায় নেপাল কেন এতটা ঝুঁকিপূর্ণ

ভূমিধস-বন্যায় নেপাল কেন এতটা ঝুঁকিপূর্ণ

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App