নির্বাচন কেন প্রশ্নের মুখে
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:২৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ভারতের নির্বাচন ব্যবস্থা নিয়ে সাম্প্রতিক সময়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে মতবিরোধ এবং ভোটার তালিকা সংশোধন নিয়ে প্রকাশিত বিভিন্ন তথ্যের পর দেশটির নির্বাচনী প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক আরও জোরালো হয়েছে।
ভারতের নির্বাচন কমিশন সংবিধানস্বীকৃত একটি প্রতিষ্ঠান। দেশটির বিপুল জনসংখ্যার নির্বাচন পরিচালনার দায়িত্ব এই কমিশনের। তবে সাম্প্রতিক সময়ে ভোটার তালিকা সংশোধন ও কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া নিয়ে বিরোধী দলসহ বিভিন্ন মহল প্রশ্ন তুলেছে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের এক অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের নেতৃত্বে ভোটার তালিকা সংশোধনসংক্রান্ত কয়েকটি সিদ্ধান্ত নিয়ে অপর দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিং সান্ধু ও বিবেক যোশী অন্তত ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের অভিযোগ, কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের অবগতির বাইরে নেওয়া হয়েছে।
কমিশনের ভেতরে কী ঘটেছে
ভারতের নির্বাচন কমিশনে প্রধান নির্বাচন কমিশনারসহ মোট তিনজন কমিশনার রয়েছেন। সাম্প্রতিক বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে ‘স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন’ বা এসআইআর নামে ভোটার তালিকা সংশোধন কার্যক্রম।
ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নতুন ভোটার নিবন্ধন, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও পুনর্বহাল, আপিলের প্রক্রিয়া এবং ভোটার তথ্যভান্ডারের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন বিষয়ে সান্ধু ও যোশী আপত্তি জানিয়েছেন। তাঁদের কয়েকটি নোটে সংশ্লিষ্ট পদক্ষেপকে ‘অনুমোদনহীন’ ও ‘বেআইনি’ বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।
দুই কমিশনার ভোটার তথ্যভান্ডারের ব্যবস্থাপনা আরও কেন্দ্রীয়করণের বিষয়েও উদ্বেগ জানিয়েছেন। তাঁদের দাবি, কিছু ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের নির্বাচন কর্মকর্তাদের ভূমিকা সীমিত হয়ে পড়ছে।
ভারতের আইন অনুযায়ী, নির্বাচন কমিশন তিন সদস্যের একটি সংস্থা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠতার বিধান রয়েছে। কমিশনের কার্যক্রম যতটা সম্ভব সর্বসম্মতভাবে পরিচালনার কথাও আইনে বলা হয়েছে।
ভোটার তালিকা নিয়ে বিতর্ক কেন
এসআইআর কার্যক্রমের উদ্দেশ্য ভোটার তালিকা যাচাই ও সংশোধন করা। নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে এ ধরনের প্রক্রিয়ার মাধ্যমে মৃত ব্যক্তি, একাধিকবার নিবন্ধিত ভোটার কিংবা যোগ্য নন—এমন ব্যক্তিদের তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
তবে বিরোধী দলগুলোর অভিযোগ, প্রক্রিয়াটিতে প্রকৃত ভোটারদের নামও বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে পুরোনো নথিপত্রের ভিত্তিতে ভোটারদের তথ্য যাচাইয়ের ক্ষেত্রে দরিদ্র, অভিবাসী শ্রমিক ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মানুষ সমস্যায় পড়তে পারেন বলে তারা আশঙ্কা করছে।
নতুন ভোটারদের নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত ফর্ম-৬-এ এসআইআর-সংক্রান্ত অতিরিক্ত তথ্য চাওয়ার বিষয়েও কমিশনের ভেতরে আপত্তি উঠেছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই পরিবর্তন নিয়ে দুই কমিশনার আপত্তি জানিয়েছিলেন।
বিরোধীদের অভিযোগ কী
কংগ্রেসসহ ভারতের বিভিন্ন বিরোধী দল দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ভোটার তালিকা থেকে বিপুলসংখ্যক নাম বাদ দেওয়া এবং নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তিতে অনিয়মের অভিযোগ করে আসছে। তাদের দাবি, এসব পরিবর্তন নির্বাচনে রাজনৈতিক প্রভাব ফেলতে পারে এবং ক্ষমতাসীন বিজেপিকে সুবিধা দিতে পারে।
তবে এসব অভিযোগের পক্ষে নির্বাচনী ফলাফল প্রভাবিত করার কোনো চূড়ান্ত প্রমাণ প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন উভয়েই বিরোধীদের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
নির্বাচন কমিশনের বক্তব্য, একটি বহু সদস্যের প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন বিষয়ে মতামত ও পর্যবেক্ষণের পার্থক্য থাকা স্বাভাবিক। কমিশন আরও বলেছে, তাদের নেওয়া পদক্ষেপগুলো আইনসম্মত।
কেন বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ
ভোটার তালিকা শুধু নির্বাচনের একটি প্রশাসনিক নথি নয়। একজন নাগরিক ভোট দিতে পারবেন কি না, তা অনেকাংশে নির্ভর করে তালিকায় তাঁর নাম থাকার ওপর। ফলে যাচাইয়ের প্রক্রিয়ায় প্রকৃত ভোটারের নাম বাদ পড়লে তার সরাসরি প্রভাব ভোটাধিকার প্রয়োগে পড়তে পারে।
এই কারণেই নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরে দুই কমিশনারের ধারাবাহিক আপত্তির বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কের বাইরে গিয়ে প্রতিষ্ঠানটির সিদ্ধান্ত গ্রহণের পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করেছে।

ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের অনুসন্ধানে আরও বলা হয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবস্থাপনা ও ভোটার তথ্যভান্ডারে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রবেশাধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। গোয়ায় ৯৭ জন ভোটারের ক্ষেত্রে সফটওয়্যার-সংক্রান্ত সমস্যার কারণে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জটিলতা তৈরি হয়েছিল বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
আস্থার প্রশ্ন কেন সামনে এসেছে
ভারতে নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক নতুন নয়। তবে নির্বাচন কমিশনের মতো সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে তা নির্বাচনী ব্যবস্থার ওপর জনআস্থার বিষয়টিকে সামনে নিয়ে আসে।
সাম্প্রতিক বিতর্কের পর বিরোধী দলগুলো প্রধান নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ ও ভোটার তালিকা সংশোধন প্রক্রিয়ার স্বাধীন পর্যালোচনার দাবি তুলেছে। অন্যদিকে, বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে প্রত্যাখ্যান করেছে।
এদিকে, ককরোচ জনতা পার্টি নামে একটি যুব সংগঠনও জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ দাবি করেছে। সংগঠনটি জানিয়েছে, তিনি পদত্যাগ না করলে ২ অক্টোবর মুম্বাই থেকে দেশব্যাপী বিক্ষোভ শুরু করা হবে।
সব মিলিয়ে ভারতের নির্বাচন নিয়ে বর্তমান বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছে তিনটি বিষয়—ভোটার তালিকা সংশোধনের পদ্ধতি, নির্বাচন কমিশনের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা এবং প্রতিষ্ঠানটির ওপর জনআস্থা।
তবে অভিযোগ, রাজনৈতিক বক্তব্য এবং প্রমাণিত অনিয়ম—এই তিনটি বিষয়কে আলাদা করে দেখা জরুরি। নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলোর চূড়ান্ত মূল্যায়ন নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট নথি, আইনি প্রক্রিয়া এবং স্বাধীন তদন্তের ফলাফলের ওপর।
সূত্র : আলজাজিরা
