মাথাপিছু আয়ে ভারতকে ছাড়িয়ে যাওয়ার পথে বাংলাদেশ
কাগজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৫৯ পিএম
ছবি : সংগৃহীত
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে মাথাপিছু মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) হিসাবে ভারতকে ছাড়িয়ে যেতে পারে বাংলাদেশ। তবে মাথাপিছু জিডিপিতে এগিয়ে থাকলেই কোনো দেশের মানুষের জীবনযাত্রার মান অন্য দেশের তুলনায় ভালো—এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। এ ক্ষেত্রে মূল্যস্ফীতি, মানুষের ক্রয়ক্ষমতা, আয়বৈষম্য ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির মতো বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ।
আইএমএফের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ২ হাজার ৮৮৬ মার্কিন ডলার। একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি দাঁড়াতে পারে ২ হাজার ৭৪৯ ডলারে।
প্রায় ১৭ কোটি ৫০ লাখ জনসংখ্যার বাংলাদেশ গত দুই দশকে অর্থনৈতিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। তৈরি পোশাকশিল্পের সম্প্রসারণ, প্রবাসী আয় এবং কর্মক্ষেত্রে নারীদের অংশগ্রহণ এ অগ্রগতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
তবে উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি কমে আসায় চাপের মুখে রয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতি। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে ভারতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৭ শতাংশ। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ হার হতে পারে ৩ দশমিক ৬ শতাংশ।
আইএমএফের প্রতিবেদনে কী বলা হয়েছে?
আইএমএফের ২০২৬ সালের অক্টোবরের ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ও ভারতের অর্থনীতির বিভিন্ন সূচক তুলে ধরা হয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি এবং যুদ্ধের কারণে জ্বালানি বাজারে সৃষ্ট অস্থিরতার প্রভাবও বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে বাংলাদেশের মোট জিডিপি হতে পারে ৫০৬ দশমিক ৪ বিলিয়ন ডলার। অন্যদিকে, ভারতের জিডিপি হতে পারে ৪ লাখ ১৫ হাজার কোটি ডলার। অর্থাৎ, ভারতের অর্থনীতির আকার বাংলাদেশের তুলনায় প্রায় আট গুণ বড়।
মাথাপিছু জিডিপি হিসাব করা হয় একটি দেশের মোট জিডিপিকে জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করে। এই সূচকে বাংলাদেশ এগিয়ে থাকার সম্ভাবনা থাকলেও ক্রয়ক্ষমতার সমতা বা পিপিপি অনুযায়ী হিসাব করলে চিত্রটি ভিন্ন।
পিপিপি পদ্ধতিতে বিভিন্ন দেশের পণ্য ও সেবার দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয়ের পার্থক্য বিবেচনা করা হয়। আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৬ সালে পিপিপির হিসাবে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ১২ হাজার ৯৯৮ ডলার। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে তা হতে পারে ১০ হাজার ৮৮৪ ডলার। অর্থাৎ, এ সূচকে ভারত এগিয়ে থাকবে।
মূল্যস্ফীতির ক্ষেত্রেও দুই দেশের মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। ২০২৬ সালে ভারতে গড় ভোক্তা মূল্যস্ফীতি ৫ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আইএমএফ। বাংলাদেশে এ হার হতে পারে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। ফলে বাংলাদেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্য ও সেবার দাম বাড়ার চাপ তুলনামূলক বেশি থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
ভারতের অর্থনীতিতে প্রযুক্তি, সেবাশিল্প, উৎপাদনশিল্প ও বিশাল অভ্যন্তরীণ বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। অন্যদিকে, বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি রপ্তানিমুখী শিল্প, বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাত। পাশাপাশি প্রবাসী আয়ও দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছে।
তুলনামূলক হিসাবে উন্নয়নশীল দেশগুলোর গড় মাথাপিছু জিডিপি প্রায় ৭ হাজার ৭৪৬ ডলার এবং বিশ্বব্যাপী গড় প্রায় ১৫ হাজার ৮৮৯ ডলার। সেই হিসাবে বাংলাদেশ ও ভারতের মাথাপিছু জিডিপি—উভয়ই এ দুই গড়ের নিচে রয়েছে।
আগামী বছরগুলোতে কী হতে পারে?
আইএমএফের পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৭ সালে বাংলাদেশের মাথাপিছু জিডিপি বেড়ে ৩ হাজার ২১৯ ডলারে পৌঁছাতে পারে। একই সময়ে ভারতের মাথাপিছু জিডিপি হতে পারে ৩ হাজার ৩৬ ডলার।
প্রতিবেদনের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৮ সালেও বাংলাদেশ সামান্য ব্যবধানে এগিয়ে থাকতে পারে। তবে পূর্বাভাস অনুযায়ী অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত থাকলে ২০২৯ সালে ভারত আবার বাংলাদেশকে ছাড়িয়ে যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাথাপিছু জিডিপি অর্থনৈতিক অবস্থার একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচক হলেও এটি দিয়ে মানুষের প্রকৃত আর্থিক পরিস্থিতি পুরোপুরি বোঝা যায় না। কারণ, এ হিসাব থেকে আয় ও সম্পদ কীভাবে জনগণের মধ্যে বণ্টিত হচ্ছে, তা জানা যায় না। একটি দেশের গড় আয় বাড়লেও সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সবার কাছে সমানভাবে পৌঁছাবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।
এ ছাড়া ডলারে হিসাব করা মাথাপিছু জিডিপি বিনিময় হারের ওপরও নির্ভরশীল। মুদ্রার মূল্য কমবেশি হলে উৎপাদনের পরিমাণে বড় পরিবর্তন না ঘটলেও ডলারের হিসাবে মাথাপিছু জিডিপি পরিবর্তিত হতে পারে।
গত দুই দশকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে তৈরি পোশাকশিল্প, রপ্তানি আয় ও প্রবাসী আয়ের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। অন্যদিকে, ভারতের অর্থনীতি তুলনামূলকভাবে বহুমুখী; সেবাশিল্প, প্রযুক্তি, উৎপাদনশিল্প, কৃষি ও অভ্যন্তরীণ ভোগের বড় বাজার দেশটির অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকে এগিয়ে নিচ্ছে।
তবে দুই দেশেই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সুফল সমানভাবে বণ্টিত হওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ। সম্পদ ও আয়ের বড় অংশ সীমিতসংখ্যক ধনী পরিবারের হাতে কেন্দ্রীভূত হলে সামগ্রিক অর্থনৈতিক অগ্রগতি সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রায় সমান প্রভাব ফেলতে পারে না।
