চরফ্যাশনে ছাতিম ফুলের সুবাসে মুগ্ধ পথচারী-পর্যটক
এআর সোয়েব চৌধুরী, চরফ্যাশন (ভোলা) প্রতিনিধি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০৯ পিএম
ছবি: ভোরের কাগজ
হেমন্তের আবহে চরফ্যাশনে ছাতিম ফুলের মিষ্টি সুবাস ছড়িয়ে পড়েছে প্রকৃতিপ্রেমীদের মনে। ঘিয়ে-সাদা ফুলের গুচ্ছ আর মাদকতাময় ঘ্রাণে মুগ্ধ হচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দা, পথচারী, শিক্ষার্থী ও দূরদূরান্ত থেকে আসা পর্যটকেরা। ব্যস্ত জনজীবনের মাঝে ছাতিম ফুলের এই নীরব সৌন্দর্য যেন এনে দিয়েছে প্রশান্তির পরশ।
চরফ্যাশন পৌরসভার ফ্যাশন স্কয়ার-সংলগ্ন শিশু ও বিনোদন পার্কের বাম পাশের দেয়ালঘেঁষে রয়েছে একটি ছাতিমগাছ। গাছটির ডালে ডালে ফুটেছে দৃষ্টিনন্দন ফুল। অন্যদিকে, চরফ্যাশন উপজেলা পরিষদ ভবনের দেয়ালঘেঁষে থাকা আরেকটি ছাতিমগাছও ফুলে ফুলে সুশোভিত হয়েছে। গাছ দুটির ফুল ও সুবাস পথচারী এবং পার্কে ঘুরতে আসা মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণ করছে।
পার্কে বেড়াতে আসা অনেকেই ফুলের সৌন্দর্য উপভোগ করছেন। প্রকৃতির এই অনাড়ম্বর আয়োজন মনে করিয়ে দেয়, সৌন্দর্য সব সময় জাঁকজমকের মধ্যে থাকে না,কখনো একটি গাছ, কয়েকটি ফুল আর বাতাসে ভেসে আসা সুবাসই মানুষের ক্লান্ত মনে প্রশান্তি জাগাতে পারে।
আরও পড়ুন: লালমনিরহাটে লোকালয়ে বাঘের হানা, আহত ৩
ছাতিম ফুল শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্যের অংশ নয়, বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও এর রয়েছে বিশেষ আবেদন। গান, কবিতা ও কথাসাহিত্যে ছাতিমের সুবাস কখনো স্মৃতি, কখনো নিঃসঙ্গতা, আবার কখনো ভালোবাসা ও প্রশান্তির প্রতীক হয়ে ধরা দিয়েছে। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শান্তিনিকেতনের ছাতিমতলা এই গাছকে দিয়েছে বিশেষ সাংস্কৃতিক তাৎপর্য।
ছাতিমগাছের বৈজ্ঞানিক নাম Alstonia scholaris। এটি Apocynaceae পরিবারের একটি চিরসবুজ বৃক্ষ। গাছটির ফুল সাধারণত ছোট ও গুচ্ছবদ্ধ হয় এবং তীব্র সুগন্ধ ছড়ায়। উপমহাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ছাতিমগাছ পরিচিত একটি দেশীয় বৃক্ষ হিসেবে।
চরফ্যাশনের ছাতিমগাছ দুটিও যেন প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে তৈরি করেছে এক নীরব সংযোগ। ফুলের সুবাসে মুগ্ধ মানুষ নতুন করে অনুভব করছেন সবুজ পরিবেশের প্রয়োজনীয়তা।
পথচারী স্থানীয় সাংবাদিক জামাল মোল্লা বলেন, “চরফ্যাশনের ব্যস্ত পরিবেশের মধ্যে ছাতিমগাছগুলো প্রকৃতির সৌন্দর্যকে আলাদাভাবে তুলে ধরছে। ফুল ফুটলে চারপাশে চমৎকার সুবাস ছড়িয়ে পড়ে। গাছগুলো আমাদের পরিবেশকে সুন্দর করার পাশাপাশি মানুষের মনেও প্রশান্তি আনে। এগুলোর নিয়মিত পরিচর্যা করা প্রয়োজন।

ঢাকা থেকে আসা পর্যটক আহসান কবির বলেন, চরফ্যাশনে এসে এমন সুন্দর ফুলের সুবাস পাব, তা ভাবিনি। শিশু ও বিনোদন পার্কের পাশের গাছটিতে ফুল ফুটে পুরো পরিবেশকে অন্য রকম করে তুলেছে। পর্যটন এলাকার সৌন্দর্য বাড়াতে স্থানীয় গাছপালা সংরক্ষণে আরও গুরুত্ব দেওয়া উচিত।
চরফ্যাশন ফাতেমা মতিন মহিলা কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী উম্মে ফাতিমা বলেন, ছাতিম ফুল দেখতে যেমন সুন্দর, এর সুবাসও তেমনি মন ভালো করে দেয়। পড়াশোনার ব্যস্ততার মধ্যে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে ভালো লাগে। আমাদের চারপাশে আরও গাছ লাগানো এবং বিদ্যমান গাছগুলোর যত্ন নেওয়া প্রয়োজন।
পার্কে ঘুরতে আসা পর্যটক জুই ইসলাম বলেন, পার্কে বেড়াতে এসে ছাতিম ফুলের সুবাসে মুগ্ধ হয়েছি। দেয়ালঘেঁষে থাকা গাছটিতে ফুল ফুটে পরিবেশকে আরও আকর্ষণীয় করে তুলেছে। পরিবার নিয়ে ঘুরতে এসে এমন প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করা আনন্দের। গাছটি যেন যথাযথ পরিচর্যায় টিকে থাকে, সেটি নিশ্চিত করা দরকার।
চরফ্যাশন উপজেলা পরিষদ ভবন ও শিশু ও বিনোদন পার্কের দেয়ালসংলগ্ন ছাতিমগাছ দুটি স্থানীয় পরিবেশের সৌন্দর্য বাড়ানোর পাশাপাশি সবুজায়নের গুরুত্বও তুলে ধরছে। এসব গাছের গোড়ার চারপাশ পরিষ্কার রাখা, প্রয়োজনীয় পরিচর্যা করা এবং নির্মাণকাজের সময় শিকড় ও কাণ্ডের ক্ষতি এড়িয়ে চলা জরুরি।
পরিবেশ কর্মী সানজিদুল ইসলাম বলেন, চরফ্যাশনের সড়ক, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সরকারি কার্যালয় ও বিনোদনকেন্দ্রে উপযোগী গাছ লাগানো এবং বিদ্যমান বৃক্ষ সংরক্ষণে স্থানীয় প্রশাসন, পৌর কর্তৃপক্ষ, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।
চরফ্যাশন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও পৌর প্রশাসক রুমানা আফরোজ বলেন, উন্নয়ন মানে শুধু সড়ক ও ভবন নির্মাণ নয়, মানুষের জন্য নির্মল পরিবেশ এবং স্বস্তির পরিসর নিশ্চিত করাও উন্নয়নের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। চরফ্যাশনের ছাতিমগাছ দুটি সেই কথাই নীরবে মনে করিয়ে দিচ্ছে। তাদের যত্নের মধ্য দিয়ে ছাতিমের সুবাস ছড়িয়ে পড়ুক আরও দূর প্রকৃতির প্রতি মানুষের ভালোবাসা ও সংরক্ষণের দায়িত্ববোধ জাগিয়ে তুলুক নতুন করে।
