×

উদ্ভাবন

ব্রোঞ্জ থেকে রৌপ্য

রোবটের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে আফিয়া হুমায়রা

Icon

কাগজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:২৮ পিএম

রোবটের হাত ধরে বিশ্বমঞ্চে আফিয়া হুমায়রা

ছবি: সংগৃহীত

রোবটের ছোট্ট যন্ত্রাংশ, কোডের কয়েকটি লাইন আর জটিল সমস্যার সমাধানের চেষ্টা—এই তিনের সমন্বয়েই যেন নিজের ভবিষ্যৎ দেখতে পান আফিয়া হুমায়রা। বয়সে এখনও তরুণ। কিন্তু আন্তর্জাতিক রোবোটিক্সের মঞ্চে বাংলাদেশের পতাকা তুলে ধরার অভিজ্ঞতা ইতোমধ্যেই তাঁর ঝুলিতে। এক বছরের ব্যবধানে ব্রোঞ্জ থেকে রৌপ্য পদক জয় করে বাংলাদেশের তরুণ রোবোটিক্স অঙ্গনে নতুন সম্ভাবনার বার্তা দিয়েছেন তিনি।

বীরশ্রেষ্ঠ মুন্সী আব্দুর রউফ পাবলিক কলেজের শিক্ষার্থী আফিয়া হুমায়রা এখন দেশের তরুণ রোবোটিক্স প্রতিভাদের অন্যতম পরিচিত মুখ। ‘সাইবার স্কোয়াড’ দলের নেতৃত্ব দিয়ে পরপর দুই বছর বিশ্ব রোবট অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক আসরে সাফল্য পেয়েছেন তিনি। ২০২৪ সালে তুরস্কের ইজমিরে অনুষ্ঠিত World Robot Olympiad (WRO)-এ তাঁর নেতৃত্বাধীন দল ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে।

পরের বছর ২০২৫ সালে সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক ফাইনালে সেই সাফল্যকে আরও এক ধাপ এগিয়ে নিয়ে দলটি রৌপ্য পদক অর্জনের পাশাপাশি নবম স্থান লাভ করে।

তুরস্কে প্রথম বড় সাফল্য

২০২৪ সালের WRO ছিল আফিয়া হুমায়রার জন্য আন্তর্জাতিক মঞ্চে বড় পরীক্ষা। তুরস্কের ইজমিরে অনুষ্ঠিত ওই আসরে ৮৭টি দেশের ৫৬০টি দল অংশ নেয়। বাংলাদেশের হয়ে অংশ নেওয়া দলগুলোর মধ্যে ‘সাইবার স্কোয়াড’ ফিউচার ইনোভেটরস বিভাগে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে। আফিয়ার নেতৃত্বে দলটি অর্জন করে ব্রোঞ্জ পদক।

ছবি: সংগৃহীত

এই সাফল্য শুধু একটি পদক অর্জন ছিল না; বরং আন্তর্জাতিক রোবোটিক্স প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের তরুণদের সক্ষমতারও প্রমাণ হয়ে ওঠে। ওই আসরে বাংলাদেশের দুটি দল ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে—আফিয়া হুমায়রার নেতৃত্বাধীন ‘সাইবার স্কোয়াড’ এবং সাদিয়া আনজুম পুষ্পর নেতৃত্বাধীন ‘চেইঞ্জ মেকার্স ২০২৪’।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য বিষয় ছিল, বাংলাদেশের পদকজয়ী দুই দলের নেতৃত্বেই ছিলেন নারী শিক্ষার্থী। ফলে আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিযোগিতার মঞ্চে বাংলাদেশের তরুণীদের নেতৃত্বের সক্ষমতাও নতুন করে আলোচনায় আসে।

ব্রোঞ্জ থেকে রৌপ্য

প্রথম সাফল্যের পর থেমে থাকেননি আফিয়া। ২০২৫ সালের জাতীয় রাউন্ডে ‘সাইবার স্কোয়াড’ আবারও নিজেদের যোগ্যতার প্রমাণ দেয়। ফিউচার ইনোভেটরসের জুনিয়র গ্রুপে দলটি স্বর্ণপদক অর্জন করে এবং আন্তর্জাতিক ফাইনালে বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের সুযোগ পায়। জাতীয় পর্বে প্রায় ২০০ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।

জাতীয় পর্যায়ে স্বর্ণ জয়ের পর আফিয়া বলেছিলেন, “This gold medal is a huge inspiration for us. We want to take on more challenges in robotics and bring international success for Bangladesh.” তাঁর এই বক্তব্যেই স্পষ্ট ছিল—জাতীয় সাফল্যকে তিনি শেষ গন্তব্য হিসেবে দেখেননি; বরং আরও বড় আন্তর্জাতিক চ্যালেঞ্জ নেওয়ার অনুপ্রেরণা হিসেবে নিয়েছিলেন।

এরপর আসে সিঙ্গাপুরের মঞ্চ। ২৬ থেকে ২৮ নভেম্বর ২০২৫ সিঙ্গাপুরের Marina Bay Sands Expo-তে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব রোবট অলিম্পিয়াডের আন্তর্জাতিক ফাইনাল। সেখানে বাংলাদেশের নয়টি দল অংশ নেয়। আফিয়া হুমায়রার নেতৃত্বাধীন ‘সাইবার স্কোয়াড’ ফিউচার ইনোভেটরসের জুনিয়র গ্রুপে নবম স্থান অর্জন করে রৌপ্য পদক জয় করে।

এক বছরের ব্যবধানে ব্রোঞ্জ থেকে রৌপ্য—এই অগ্রগতি আফিয়ার জন্য যেমন ব্যক্তিগত অর্জন, তেমনি বাংলাদেশের তরুণ রোবোটিক্স প্রতিভাদের জন্যও বড় অনুপ্রেরণা। বিশ্বমঞ্চে রৌপ্য জয়ের পর নিজের অনুভূতি প্রকাশ করতে গিয়ে আফিয়া হুমায়রা মহান আল্লাহর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে পরিবারের সহযোগিতা এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আর্থিক সহায়তার কথাও বিশেষভাবে উল্লেখ করেন তিনি।

আফিয়ার ভাষায়, বিশ্বের ১০০টিরও বেশি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত এই আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশকে তুলে ধরতে পেরে তিনি অত্যন্ত আনন্দিত ও গর্বিত। তবে তাঁর মতে, মহান আল্লাহর অসীম দয়া, পরিবারের সমর্থন এবং মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের আর্থিক সহায়তা ছাড়া এই অর্জন সম্ভব হতো না।

তরুণ এই রোবোটিক্স প্রতিভা মনে করেন, দেশের আরও বেশি আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি তরুণ উদ্ভাবকদের পাশে দাঁড়ায়, তাহলে বাংলাদেশ প্রযুক্তি ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে আরও দ্রুত এগিয়ে যেতে পারবে। তাঁর প্রত্যাশা, “মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকের মতো বাংলাদেশের অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানও যদি দেশের তরুণ উদ্ভাবকদের উদ্ভাবনী কাজে সহায়তায় এগিয়ে আসে, তাহলে বাংলাদেশ খুব শিগগিরই বিশ্বে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে সক্ষম হবে।”

শুধু প্রতিযোগী নন, এখন প্রশিক্ষকও

আফিয়ার গল্পের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো—আন্তর্জাতিক পর্যায়ে সাফল্য পাওয়ার পরও তিনি নিজের অর্জনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেননি। বরং নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের রোবোটিক্সের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিতে প্রশিক্ষক হিসেবেও কাজ শুরু করেছেন।

সম্প্রতি ক্র্যাব ও উইংস ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত ‘ROBOGENESIS: Igniting the Future of Robotics’ শীর্ষক দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ কর্মশালায় প্রশিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন আফিয়া। সেখানে তিনি অংশগ্রহণকারীদের রোবোটিক্সের বিভিন্ন মৌলিক বিষয়, প্রকল্পভিত্তিক কাজ এবং প্রযুক্তির ব্যবহার সম্পর্কে হাতে-কলমে ধারণা দেন।

একসময় যিনি আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় শেখার ও নিজের দক্ষতা প্রমাণের জন্য মঞ্চে দাঁড়িয়েছেন, এখন তিনিই অন্যদের শেখানোর জায়গায় দাঁড়াচ্ছেন। তাঁর এই পরিবর্তন একজন তরুণ প্রতিযোগীর পরিণত নেতৃত্বের পরিচয় বহন করে।

প্রযুক্তির মঞ্চে তরুণীদের নেতৃত্ব

রোবোটিক্সকে অনেক সময় জটিল প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি ও কোডিংয়ের জগৎ হিসেবে দেখা হয়। সেই জায়গায় আফিয়া হুমায়রার নেতৃত্ব একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়—প্রযুক্তির জগতে মেয়েদের অংশগ্রহণ শুধু সম্ভবই নয়, তারা নেতৃত্বও দিতে পারে।

২০২৪ সালে তুরস্কে আফিয়ার নেতৃত্বে ‘সাইবার স্কোয়াড’ ব্রোঞ্জ পদক অর্জন করে। ২০২৫ সালে একই দলের নেতৃত্ব দিয়ে সিঙ্গাপুরে তিনি রৌপ্য পদক জয় করেন। এই ধারাবাহিক সাফল্য শুধু পদকের রঙ বদলের গল্প নয়; এটি নেতৃত্ব, দলগত কাজ, অধ্যবসায়, অনুশীলন এবং আত্মবিশ্বাসেরও গল্প।

বাংলাদেশের জন্য বড় স্বপ্ন

বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, মেশিন ভিশন ও স্মার্ট প্রযুক্তির সঙ্গে রোবোটিক্সের সম্পর্ক ক্রমেই গভীর হচ্ছে। ফলে তরুণ প্রজন্মকে প্রযুক্তিনির্ভর ভবিষ্যতের জন্য প্রস্তুত করতে রোবোটিক্স শিক্ষা ও প্রতিযোগিতার গুরুত্বও বাড়ছে।

আফিয়া হুমায়রার পথচলা তাই শুধু একজন শিক্ষার্থীর পদকজয়ের গল্প নয়। এটি বাংলাদেশের একদল তরুণের স্বপ্ন দেখার গল্প—যেখানে রোবট কেবল একটি যন্ত্র নয়; বরং উদ্ভাবন, সমস্যা সমাধান, নেতৃত্ব এবং ভবিষ্যৎ নির্মাণের হাতিয়ার।

ব্রোঞ্জের পর এসেছে রৌপ্য। সামনে লক্ষ্য আরও বড়। আর সেই লক্ষ্যের পথে আফিয়ার হাতে রোবট, চোখে বিশ্বমঞ্চ এবং হৃদয়ে বাংলাদেশের পতাকা। তাঁর সাফল্য যেমন দেশের তরুণদের অনুপ্রাণিত করছে, তেমনি পৃষ্ঠপোষকতা ও সুযোগ পেলে বাংলাদেশের তরুণ উদ্ভাবকেরা বিশ্বমঞ্চে আরও বড় সাফল্য এনে দিতে পারেন—আফিয়া হুমায়রার গল্প যেন তারই উজ্জ্বল প্রমাণ।

সাবস্ক্রাইব ও অনুসরণ করুন

উদ্বোধনী দিনে কৃষক কার্ডের প্রণোদনা পাবেন ১ লাখ ১০ হাজার কৃষক

কৃষিমন্ত্রী উদ্বোধনী দিনে কৃষক কার্ডের প্রণোদনা পাবেন ১ লাখ ১০ হাজার কৃষক

জ্বালানি সংকট সমাধানে বিরোধী দলের প্রস্তাব নেয়নি সরকার: জামায়াত আমির

জ্বালানি সংকট সমাধানে বিরোধী দলের প্রস্তাব নেয়নি সরকার: জামায়াত আমির

‘ফ্যাসিষ্ট সরকারের ১৭ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল’

‘ফ্যাসিষ্ট সরকারের ১৭ বছরে শিক্ষা ব্যবস্থা ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল’

বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা ইসরাত পায়েল, পাত্র কে?

বিয়ে করলেন উপস্থাপিকা ইসরাত পায়েল, পাত্র কে?

সব খবর

সম্পাদক : শ্যামল দত্ত

প্রকাশক : সাবের হোসেন চৌধুরী

অনুসরণ করুন

BK Family App