ইরান-সমর্থিত হুথিরা ‘বিদ্যুৎ গতিতে’ এগোচ্ছে, বিস্মিত পর্যবেক্ষকরা
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৩৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
ইয়েমেনের উপকূলীয় সমতলভূমি তিহামাহর দক্ষিণাঞ্চলজুড়ে হুথিদের দ্রুত অগ্রযাত্রা অধিকাংশ পর্যবেক্ষককেই বিস্মিত করেছে। মাত্র কয়েক দিনের ব্যবধানে ইরান-সমর্থিত এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী এমন একটি বিস্তীর্ণ এলাকা দখলে নিয়েছে, যা এতদিন হুথিবিরোধী জোট ‘ন্যাশনাল রেজিস্ট্যান্স’-এর নিয়ন্ত্রণে ছিল।
কিছু হিসাব অনুযায়ী, হুথিরা ইয়েমেনের কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ লোহিত সাগর উপকূলের প্রায় ১৩০ কিলোমিটার বা ৮১ মাইল এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে। কয়েক বছরের মধ্যে এটি গোষ্ঠীটির সবচেয়ে বড় সামরিক সাফল্যগুলোর একটি হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
দীর্ঘ ১২ বছরের গৃহযুদ্ধ, সৌদি আরবের ব্যাপক বিমান হামলা এবং যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও যুক্তরাজ্যের সামরিক অভিযানের পরও হুথিরা যে ইয়েমেনের রাজনীতিতে ও সামরিক ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে টিকে আছে, সাম্প্রতিক এই অগ্রযাত্রা তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
প্রতিপক্ষের মধ্যে যখন বিস্ময় ও মনোবলহীনতা তৈরি হয়েছে, তখন অদূর ভবিষ্যতে হুথিদের এসব এলাকা থেকে সরিয়ে দেওয়া কঠিন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
ব্রাসেলসভিত্তিক ইউরোপিয়ান ইনস্টিটিউট অব পিসের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক হিশাম আল-ওমেইসি বিবিসিকে বলেন, ‘এখন তারা সেখানে অবস্থান নিয়েছে এবং নিজেদের অবস্থান সুসংহত করবে। আর তাদের সেখান থেকে সরিয়ে দিতে খরচও অনেক বেশি হবে।’
ইরানের সমর্থন আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে
হুথিরা অবশ্য একা নয়। ইয়েমেনের এই বিদ্রোহী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে ইরানের সমর্থন পেয়ে আসছে। মধ্যপ্রাচ্যে ইরানের সমর্থিত তথাকথিত ‘অ্যাক্সিস অব রেজিস্ট্যান্স’-এর অন্য অংশগুলোর—লেবাননের হিজবুল্লাহ, গাজার হামাস এবং সিরিয়ার আসাদ সরকারের—সাম্প্রতিক বিপর্যয় ও পরাজয়ের পর তেহরানের কাছে হুথিদের গুরুত্ব আরও বেড়েছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

আরও পড়ুন: মধ্যপ্রাচ্য সংকটের মধ্যেই ‘নয়াদিল্লি ঘোষণা’ গৃহীত
হিশাম আল-ওমেইসি বলেন, ‘তাই তারা হুথিদের জন্য তাদের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছে। এবং অবশ্যই তাদের সেই সমর্থন প্রয়োজন।’
বেশির ভাগ বিশ্লেষক মনে করেন, হুথিদের কেবল ইরানের ‘পুতুল’ হিসেবে দেখা ঠিক হবে না। গোষ্ঠীটির নিজস্ব রাজনৈতিক ও সামরিক স্বার্থ রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ ইরানের আঞ্চলিক প্রভাবের একটি নতুন ও অস্বস্তিকর বাস্তবতাও সামনে এনেছে।
দুই গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথের ওপর ইরানের প্রভাব
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের যৌথ হামলা চালানোর সাত মাস পর তেহরানের শাসকগোষ্ঠী এখন বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ দুটি সামুদ্রিক পথের ওপর প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ প্রভাব বিস্তারের অবস্থানে রয়েছে।
একটি হলো পারস্য উপসাগরের প্রবেশমুখের হরমুজ প্রণালি। অন্যটি লোহিত সাগর ও সুয়েজ খালের প্রবেশদ্বার বাব আল-মান্দাব।
লন্ডনভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান চ্যাথাম হাউসের গবেষণা ফেলো ফারেয়া আল-মুসলিমি বলেন, ‘এখন ইরান সরাসরি এবং তাদের মিত্র গোষ্ঠীগুলোর মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের সবচেয়ে কৌশলগত দুটি সংকীর্ণ সামুদ্রিক পথ নিয়ন্ত্রণ করছে।’
তার ভাষ্য অনুযায়ী, বিশ্বব্যাপী জ্বালানি ও তেল বাণিজ্যের ৩৫ শতাংশেরও বেশি এই দুটি পথের ওপর নির্ভরশীল। ফলে এসব সামুদ্রিক পথের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে এর প্রভাব বৈশ্বিক অর্থনীতি ও জ্বালানি বাজারে পড়তে পারে।
বাব আল-মান্দাবে হুথিদের বাড়তি সুবিধা
হুথিরা যদি লোহিত সাগরের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি দ্বীপের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে থাকে, যার মধ্যে বাব আল-মান্দাবের সবচেয়ে সংকীর্ণ অংশের মাঝামাঝি অবস্থিত পেরিম দ্বীপ রয়েছে, তাহলে আন্তর্জাতিক নৌপরিবহনে হস্তক্ষেপের সক্ষমতা তাদের অনেকটাই বেড়ে যেতে পারে।
গাজা যুদ্ধের পর ইসরায়েলকে ঘিরে হুথিদের সামরিক তৎপরতাই দেখিয়েছে, লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলো তাদের ক্ষেপণাস্ত্র, ড্রোন ও ছোট আক্রমণকারী নৌযানের জন্য কতটা ঝুঁকিপূর্ণ।
ইয়েমেন বিশেষজ্ঞ আইওনা ক্রেগ বিবিসি রেডিও ৪-এর ‘টুডে’ অনুষ্ঠানে বলেন, ‘এই ভৌগোলিক অগ্রগতি ছাড়াই তারা বাব আল-মান্দাব হয়ে সুয়েজের দিকে যাওয়া ও আসা জাহাজ নিয়ন্ত্রণ করতে পেরেছিল। কিন্তু এখন তারা বাব আল-মান্দাবের ওপর সরাসরি নজরদারির সুযোগ থাকা এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, যা তাদের আরও বেশি প্রভাব দিচ্ছে।’
শুক্রবার বিকেলে দেওয়া এক বিবৃতিতে হুথি সামরিক বাহিনী জানিয়েছে, ‘যেসব কোম্পানির জাহাজ সৌদি নয়, তাদের জন্য নৌ চলাচল নিরাপদ।’
তবে সৌদি জাহাজ এরই মধ্যে তাদের অবরোধের আওতায় রয়েছে। ফলে হুথিদের এই ঘোষণার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে শিপিং কোম্পানিগুলোর মধ্যে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন রয়েছে।
আরও পড়ুন: যেভাবে বাব আল-মান্দেব প্রণালির পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নিল হুথিরা
এর আগে হুথিরা দাবি করেছিল, তারা কেবল ইসরায়েল-সংশ্লিষ্ট জাহাজকে লক্ষ্যবস্তু করছে। কিন্তু বাস্তবে এমন জাহাজেও হামলা হয়েছে, যেগুলোর সঙ্গে ইসরায়েলের সরাসরি কোনো সম্পর্ক ছিল না। এর মধ্যে নরওয়েজীয় পতাকাবাহী একটি তেলবাহী জাহাজও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও সামরিকভাবে জড়াবে?
তবে আইওনা ক্রেগ মনে করেন, হুথিরা এবার নির্বিচারে হামলা চালানো থেকে বিরত থাকতে পারে। কারণ তারা ২০২৫ সালের বসন্তে ছয় সপ্তাহব্যাপী যুক্তরাষ্ট্রের বড় ধরনের বিমান ও নৌ অভিযান ‘অপারেশন রাফ রাইডার’-এর পুনরাবৃত্তি চাইবে না।
তিনি বলেন, ‘তারা ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রের শক্ত প্রতিক্রিয়া অনুভব করেছে।’
এখন প্রশ্ন হলো—যুক্তরাষ্ট্র কি আবারও ইয়েমেনের সংঘাতে সরাসরি জড়াতে চাইবে?
ইরানের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের যুদ্ধ ইতোমধ্যেই যুক্তরাষ্ট্রে অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। এর মধ্যে তেলের দাম আবার বাড়তে শুরু করায় নতুন কোনো সংঘাতমুখী পরিস্থিতি ট্রাম্পের জনসমর্থন কিংবা নভেম্বরে অনুষ্ঠেয় মধ্যবর্তী নির্বাচনে রিপাবলিকানদের সম্ভাবনাকে খুব একটা শক্তিশালী করবে না বলেই মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
অ্যাক্সিওসের তথ্য অনুযায়ী, সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমানের পক্ষ থেকে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ চেয়ে করা আবেদনগুলো এখন পর্যন্ত সাড়া পায়নি।
অ্যাক্সিওসের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্র ‘ইয়েমেনে ক্রমবর্ধমান সংঘাত নিয়ে উদ্বিগ্ন এবং একদিকে সৌদি আরবকে সমর্থন জোরদার করার চেষ্টা করছে, অন্যদিকে সরাসরি সামরিকভাবে জড়িয়ে পড়া এড়াতে চাইছে।’
সৌদি আরবের জন্যও বাড়ছে ঝুঁকি
সৌদি আরবের উদ্বেগের কারণ শুধু বাব আল-মান্দাবের সম্ভাব্য হুমকি নয়। দেশটির পূর্ব-পশ্চিম তেল পাইপলাইনে হুথিদের সম্ভাব্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে বলে স্যাটেলাইট চিত্রের বরাত দিয়ে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে গেলে সৌদি আরবের তেল রপ্তানির জন্য এই পাইপলাইন একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প রুট। ফলে সেটি লক্ষ্যবস্তু হলে বৈশ্বিক তেল সরবরাহের ওপর নতুন চাপ তৈরি হতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, ইরানের ইয়েমেনি মিত্ররা যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও তাদের মিত্রদের ওপর অর্থনৈতিক চাপ বাড়ানোর কৌশলের অংশ হিসেবেই এসব সক্ষমতা ব্যবহার করতে পারে। ইরান সরাসরি হামলার নির্দেশ না দিলেও, এর কৌশলগত সুফল তেহরান পেতে পারে।
লন্ডনভিত্তিক রয়্যাল ইউনাইটেড সার্ভিসেস ইনস্টিটিউটের গবেষক ও বিশ্লেষক বারাআ শাইবান বলেন, ২০২২ সালে জাতিসংঘের মধ্যস্থতায় যুদ্ধবিরতি প্রতিষ্ঠার পর জুলাইয়ে বর্তমান উত্তেজনা নতুন করে তীব্র হতে শুরু করে। সে সময় হুথিদের একটি প্রতিনিধিদল ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির রাষ্ট্রীয় অন্ত্যেষ্টিক্রিয়া থেকে দেশে ফেরে।
তিনি বলেন, ‘এর পরপরই উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। এবং খুব স্পষ্টভাবেই মনে হয়েছে যে [ইরান] এখন লোহিত সাগরে আরও বড় উপস্থিতি নিশ্চিত করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।’
সামনে আরও বড় সংঘাতের আশঙ্কা
ইয়েমেন যখন আবারও পূর্ণমাত্রার যুদ্ধের দ্বারপ্রান্তে, সৌদি আরব যখন লোহিত সাগর হয়ে যাওয়া তার অর্থনৈতিক জীবনরেখা রক্ষায় উদ্বিগ্ন এবং ডোনাল্ড ট্রাম্প যখন দৃশ্যত এই সংঘাতে সরাসরি জড়াতে অনাগ্রহী—তখন ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাত নতুন এবং সম্ভাব্য আরও বিপজ্জনক এক মাত্রা পেয়েছে।
হুথিদের সাম্প্রতিক অগ্রযাত্রা শুধু ইয়েমেনের অভ্যন্তরীণ শক্তির ভারসাম্যই বদলে দিতে পারে না; এর প্রভাব পড়তে পারে লোহিত সাগর, বাব আল-মান্দাব, সুয়েজ খাল এবং বৈশ্বিক জ্বালানি ও নৌবাণিজ্যের ওপরও।
সবচেয়ে বড় মূল্য দিতে হবে অবশ্য ইয়েমেনের সাধারণ মানুষকেই। ১২ বছরের গৃহযুদ্ধে যারা বাস্তুচ্যুত, ক্ষুধার্ত, দারিদ্র্যপীড়িত ও বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছেন, নতুন করে সংঘাত তীব্র হলে তাদের জীবন আরও অনিশ্চিত ও কঠিন হয়ে উঠবে।
সূত্র: বিবিসি।
