বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক বাকিদের চেয়ে কত এগিয়ে?
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৫:১৬ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
মার্কিন মহাকাশ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান স্পেসএক্স ও গাড়ি নির্মাতা প্রতিষ্ঠান টেসলার প্রধান নির্বাহী ইলন মাস্ক বিশ্বের প্রথম ‘ট্রিলিয়নিয়ার’ (লাখ কোটিপতি) হিসেবে নিজের নাম লিখিয়েছেন। বিশ্বের সমকালীন ব্যবসায়িক পরিমণ্ডলে তার মতো এত গভীরভাবে আর কোনো ব্যবসায়ী নেতা প্রভাব বিস্তার করতে পারেননি।
এমন এক সময়ে মাস্ক এই অবিশ্বাস্য সম্পদের চূড়ায় পৌঁছালেন, যখন বিশ্বজুড়ে অর্থনৈতিক বৈষম্য নিয়ে উদ্বেগ চরমে এবং অতি-ধনী বা ধনকুবেরদের প্রতি সাধারণ মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি বেশ নেতিবাচক। তবে ওয়ারেন বাফেটের মতো জননন্দিত বা সাদামাটা ভাবমূর্তি না থাকা সত্ত্বেও, মাস্কের রয়েছে বিশাল ও একনিষ্ঠ অনুসারী দল।
প্রশংসাকারীরা যেখানে মাস্কের ‘কোনো ফিল্টার ছাড়া’ সরাসরি কথা বলার স্টাইল পছন্দ করেন, সমালোচকরা সেখানে তার বিরুদ্ধে ‘অলিগার্ক’ বা স্বৈরাচারী পুঁজিপতিদের মতো ক্ষমতা খাটানোর অভিযোগ তোলেন। তার প্রতিষ্ঠানগুলোর করপোরেট সুশাসন এবং দিন দিন তার উগ্র রাজনৈতিক পক্ষপাতিত্ব নিয়েও তীব্র বিতর্ক রয়েছে।
সব রেকর্ড ভাঙল স্পেসএক্স
সব বিতর্ককে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বৃহস্পতিবার ইলন মাস্কের রকেট, স্যাটেলাইট ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) বিষয়ক প্রতিষ্ঠান ‘স্পেসএক্স’ তাদের প্রাথমিক শেয়ার বিক্রি (আইপিও) থেকে রেকর্ড ৭৫ বিলিয়ন ডলার সংগ্রহ করেছে, যা মাস্কের ব্যবসার প্রতি বিনিয়োগকারীদের আকাশচুম্বী আস্থারই বহিঃপ্রকাশ।
এই শেয়ার বিক্রির আগে ফোর্বসের তালিকায় মাস্কের সম্পদ ছিল প্রায় ৭৮০ বিলিয়ন ডলার, যা তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী অ্যালফাবেটের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজের চেয়ে বহুগুণ বেশি।
ফোর্বস ওয়েলথের ডেপুটি এডিটর ম্যাট ডুরোট বলেন, বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ ধনী ল্যারি পেজের সম্পদ ৩০০ বিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি। অর্থাৎ, মাস্কের সম্ভাব্য সম্পদের মাত্র এক-তৃতীয়াংশ। মাস্ক ছাড়া ইতিহাসে কেবল ওরাকলের প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি এলিসনই ৪০০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক ছুঁতে পেরেছিলেন।
বিনিয়োগকারীদের হিসাব অনুযায়ী, স্পেসএক্সে মাস্কের শেয়ারের মূল্য এখন প্রায় ৮৬৬ বিলিয়ন ডলার। আজ শুক্রবার নাসডাকে অফিশিয়াল লেনদেন শুরু হওয়ার পর টেসলা ও অন্যান্য সব প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মাস্কের মোট নিট সম্পদ ১.১ ট্রিলিয়ন (১ লাখ ১০ হাজার কোটি) ডলার ছাড়িয়ে যাবে।
টেসলা থেকে এক্স (টুইটার)
টেসলা ও স্পেসএক্সের সাফল্যের পর ২০২২ সালে ৪৪ বিলিয়ন ডলারে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টুইটার (বর্তমানে এক্স) কিনে নেন মাস্ক। এই চুক্তি তাকে কোটি কোটি মানুষের কাছে সরাসরি নিজের মতামত পৌঁছানোর একচ্ছত্র সুযোগ করে দেয়। রাজনীতি, অভিবাসন, সরকারি ব্যয় থেকে শুরু করে মুক্তবাক স্বাধীনতা- সব বিষয়েই তিনি এখন বিশ্বমঞ্চের অন্যতম প্রভাবশালী কণ্ঠস্বর।
তবে রাজনীতিতে তার অতিরিক্ত জড়ানো, বিশেষ করে গত বছর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘ডিপার্টমেন্ট অব গভর্নমেন্ট এফিসিয়েন্সি’তে যোগ দেওয়াটা তার অন্যতম বিতর্কিত পদক্ষেপ ছিল। এর রাজনৈতিক প্রভাবে ২০২৫ সালে আন্তর্জাতিক বাজারে টেসলার গাড়ি বিক্রি অনেকটাই কমে যায় এবং বিভিন্ন দেশে টেসলা বয়কটের ডাক দেওয়া হয়।
এদিকে, বিশ্ব অর্থনীতিতে এক ধরনের অস্থিরতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। গত বুধবার ওয়াল স্ট্রিটের প্রধান সূচকগুলোর পতন হয়েছে; ডাও জোন্স কমেছে ১.৯ শতাংশ, এসঅ্যান্ডপি ৫০০ কমেছে ১.৬ শতাংশ ও নাসডাক সূচক কমেছে প্রায় ২ শতাংশ।
ইলন প্রিমিয়াম ও মাস্কোনমি
৫৪ বছর বয়সী মাস্কের জন্ম দক্ষিণ আফ্রিকার প্রিটোরিয়ায়। ১৯৯৭ সালে ইউনিভার্সিটি অব পেনসিলভানিয়া থেকে স্নাতক শেষ করা মাস্ক ২০০৮ সালে টেসলার দায়িত্ব নেন। তার হাত ধরেই বিশ্ব গাড়ি শিল্পে বৈদ্যুতিক গাড়ির বিপ্লব ঘটে।
জেনারেল মোটরসের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান বব লুৎজ বলেন, অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে মার্কিন উদ্ভাবনী ক্ষমতার প্রতি বিশ্ববাসীর সম্মান ফিরিয়ে এনেছেন মাস্ক।
ব্যবসায়িক মহলে মাস্কের চারপাশের এই বিশাল সাম্রাজ্যকে এখন বলা হচ্ছে ‘মাস্কোনমি’। আর পুঁজিবাজারে তার এই অভাবনীয় সাফল্যকে বিশ্লেষকরা দেখছেন ‘ইলন প্রিমিয়াম’ হিসেবে। প্রথাগত আর্থিক হিসাব-নিকাশ বা লাভ-ক্ষতির অঙ্ক দূরে ঠেলে কেবল মাস্কের দূরদর্শী ভাবনার ওপর ভরসা করেই বিনিয়োগকারীরা অর্থ ঢালছেন।
আইপিও গবেষণা প্রতিষ্ঠান রেনেসাঁ ক্যাপিটালের সিনিয়র স্ট্র্যাটেজিস্ট ম্যাট কেনেডি বলেন, টেসলার মতোই স্পেসএক্সও আসলে ইলন মাস্কের ওপর একটি বাজি। এর দেড় থেকে দুই ট্রিলিয়ন ডলারের বাজার মূল্যায়ন প্রথাগত সব অর্থনৈতিক সূত্রকে ভেঙে চুরমার করে দেয়।
এ যুগের এডিসন
একজনের হাতে এত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়া নিয়ে স্বার্থের সংঘাত ও করপোরেট ঝুঁকির প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। অতীতে নিয়ন্ত্রক সংস্থা, সাংবাদিক ও রয়টার্সের মতো গণমাধ্যমের সাথেও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রকাশ্য দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন মাস্ক।
ট্রাম্পের সাথে তার সম্পর্কও ছিল উত্থান-পতনের। প্রথমে ট্রাম্পের নির্বাচনি তহবিলের অন্যতম বড় যোগানদাতা ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের হোয়াইট হাউজে ফেরার পর ডোনাল্ড ট্রাম্পের অন্যতম প্রধান করপোরেট সহযোগী হলেও, পরবর্তীতে নীতি ও ব্যয় সংক্রান্ত দ্বিমতের কারণে ট্রাম্পের সঙ্গে তার প্রকাশ্য বিরোধ তৈরি হয়। অবশ্য পরে তাদের মাঝে সমঝোতার সুর দেখা গেছে।
সব বিতর্ক, আইনি জটিলতা কিংবা মাস্কের খামখেয়ালি আচরণ সত্ত্বেও বিনিয়োগকারীদের কাছে মাস্কের কদর কমেনি। কারণ অবাস্তব স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দেওয়ার এক জাদুকরী ট্র্যাক রেকর্ড রয়েছে তার।
বিশ্বখ্যাত ব্যাংক জেপি মরগান চেজের প্রধান নির্বাহী জেমি ডাইমন, যিনি একসময় মাস্কের সাথে দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ে জড়িয়েছিলেন, তিনিও এখন মাস্কের গুণমুগ্ধ অনুসারী। সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে ডাইমন ইলন মাস্কের প্রশংসা করে বলেন, ইলন হলেন আমাদের যুগের টমাস এডিসন, আমাদের আইনস্টাইন।
বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার ইলন মাস্ক বাকিদের চেয়ে কত এগিয়ে?
স্পেসএক্সের ঐতিহাসিক আইপিও সম্পন্ন হওয়ার পর বিশ্বের প্রথম ট্রিলিয়নিয়ার বা ‘লাখ কোটিপতি’ হিসেবে ইতিহাস গড়েছেন ইলন মাস্ক। বর্তমানে তার সম্পদের পরিমাণ এতটাই আকাশচুম্বী যে, বিশ্বের পরবর্তী শীর্ষ ধনকুবেররা তার ধারেকাছেও নেই।
ব্যবসায়িক সাময়িকী ফোর্বস এবং আন্তর্জাতিক সংবাদসংস্থা রয়টার্সের সর্বশেষ যৌথ হিসাব অনুযায়ী, ইলন মাস্কের মোট নিট সম্পদের পরিমাণ এখন এক হাজার বিলিয়ন বা এক ট্রিলিয়ন (১ লাখ কোটি) ডলারের বেশি।
এক নজরে বিশ্বের শীর্ষ ১০ ধনকুবেরের সম্পদের পরিমাণ
১. ইলন মাস্ক (স্পেসএক্স, টেসলা): ১,০০০ বিলিয়ন ডলার (১ ট্রিলিয়ন ডলার বা ১ লাখ কোটি ডলার)।
২. ল্যারি এলিসন (ওরাকল): ৩০০ বিলিয়ন ডলার (৩০ হাজার কোটি ডলার)।
৩. ল্যারি পেজ (গুগল/অ্যালফাবেট): ৩০০ বিলিয়ন ডলার (৩০ হাজার কোটি ডলার)।
৪. সের্গেই ব্রিন (গুগল/অ্যালফাবেট): ২৭০ বিলিয়ন ডলার (২৭ হাজার কোটি ডলার)।
৫. জেফ বেজোস (অ্যামাজন): ২৬০ বিলিয়ন ডলার (২৬ হাজার কোটি ডলার)।
৬. মাইকেল ডেল (ডেল টেকনোলজিস): ২৫০ বিলিয়ন ডলার (২৫ হাজার কোটি ডলার)।
৭. মার্ক জাকারবার্গ (মেটা): ২১০ বিলিয়ন ডলার (২১ হাজার কোটি ডলার)।
৮. জেনসেন হুয়াং (এনভিডিয়া): ১৯০ বিলিয়ন ডলার (১৯ হাজার কোটি ডলার)।
৯. বার্নার্ড আর্নল্ট ও পরিবার (এলভিএমএইচ): ১৫০ বিলিয়ন ডলার (১৫ হাজার কোটি ডলার)।
১০. আমানসিও ওর্তেগা (জারা): ১৪৫ বিলিয়ন ডলার (১৪ হাজার ৫০০ কোটি ডলার)।
শীর্ষ ৩ ধনীর সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও বেশি মাস্কের একার সম্পদ
রয়টার্সের প্রকাশিত চার্ট বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ধনকুবেরদের তালিকায় ইলন মাস্কের ঠিক পরেই ৩০০ বিলিয়ন ডলার সম্পদ নিয়ে যৌথভাবে দ্বিতীয় অবস্থানে আছেন ওরাকলের ল্যারি এলিসন ও গুগলের সহ-প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। আর ২৭০ বিলিয়ন ডলার নিয়ে তালিকায় এরপরের অবস্থানে আছেন গুগলের আরেক সহ-প্রতিষ্ঠাতা সের্গেই ব্রিন।
সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো, ইলন মাস্কের পরবর্তী এই শীর্ষ ৩ জন ধনকুবেরের মোট সম্পদ একসঙ্গে যোগ করলেও (৩০০+৩০০+২৭০) তা দাঁড়ায় ৮৭০ বিলিয়ন ডলারে। অর্থাৎ, বিশ্বের শীর্ষ তিন ধনীর সম্মিলিত সম্পদের চেয়েও ইলন মাস্কের একার সম্পদ ১৩০ বিলিয়ন ডলার বেশি!
সূত্র: ফোর্বস ও রয়টার্স
